শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে কোরবানির হাট, বৃষ্টি-কাদায় ভোগান্তি তবুও বেচাকেনা তুঙ্গে

প্রকাশ : 27 May 2026
শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে কোরবানির হাট, বৃষ্টি-কাদায় ভোগান্তি তবুও বেচাকেনা তুঙ্গে

স্টাফ রিপোর্টার: পবিত্র ঈদুল আজহার আগের দিন বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীসহ সারাদেশের কোরবানির পশুর হাটে শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা চলছে পুরোদমে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর শাহজাহানপুর, কমলাপুর, গাবতলী, আফতাবনগর ও মেরাদিয়া হাটে হাঁটুসমান কাদা ও পানি জমে যায়। আজও দুপুর পর্যন্ত ঢাকায় বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি হয়েছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি ও কাদায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গাবতলী হাটের ব্যাপারী শামীম মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে বিক্রি ভালো ছিল। দুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে অনেকে হাট ছেড়ে চলে যান। গরু সামলানোই কষ্ট হয়ে গেছে।’ পাবনার সাইদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘হাটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। খড় ভিজে গেছে, গরুকে বসাতেও পারছি না। বেশি ভিজলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।’


তবে বৃষ্টি থামার পর বিকেল থেকে আবার ক্রেতা বেড়েছে। তেজগাঁও, কমলাপুর ও শাহজাহানপুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকার ছোট গরুর সামনে ভিড় বেশি। ব্যাপারীরা বলছেন, গো-খাদ্য ও পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় কম দামে ছাড়া সম্ভব না। বগুড়ার শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘৪০-৪৫ হাজারে যে গরু বিক্রি করতাম, এখন সেটা ৬৫-৭০ হাজারেও ছাড়া যাচ্ছে না।’ ক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত বছর ৫০-৫৫ হাজারে যে গরু পেতাম, এবার ৭০ হাজার চাচ্ছে। ব্যাপারীরা ছাড়তে চায় না। মনে হচ্ছে শেষ দিন দাম আরও বাড়বে।’ মাঝারি গরুর দাম ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অনেক ক্রেতা বড় গরু বাদ দিয়ে মাঝারি গরুতে ঝুঁকছেন।


ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা বেড়েছে। রাজশাহীর দামকুড়া হাটের ব্যাপারী আইনাল হোসেন বলেন, ‘গত কয়েকদিন বিক্রি কম হলেও এখন বেড়েছে। ছোট গরুর চাহিদা বেশি। তবে বড় গরুর দাম কিছুটা কমে গেছে।’ আশুলিয়ার হাটের ইজারাদার দিদার আহমেদ বলেন, ‘এবার আড়াই কোটি টাকায় হাট ইজারা নিয়েছি। নিরাপত্তায় পুলিশ, ভলেন্টিয়ার ও জাল টাকা শনাক্তের মেশিন রেখেছি। দালালদের সরিয়ে দিয়েছি।’ তবে বরিশালে গরুর দাম বেশি, বিক্রি তুলনামূলক কম হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্যাপারীরা।


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু। লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৩ লাখ ৭৯ হাজার। ফলে প্রায় ২০ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। গত বছর ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, যা তার আগের বছরের চেয়ে ১৩ লাখ কম। ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু অবিক্রীত ছিল। এবারও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কোরবানি কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


ঢাকার দিয়াবাড়ি মেট্রোস্টেশনের নিচে বসা পশুর হাট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। যাত্রী চলাচলে বিঘ্ন ও মেট্রোরেলের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে অনেকেই ক্ষোভ জানান। পরে পুলিশ গিয়ে হাটটি সরিয়ে দেয়। ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, স্টেশনের নিচে হাট বসানোর কোনো অনুমতি ছিল না।


ভারতীয় গরু নিয়ে এবার সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারিভাবে কোনো পশু আমদানি করা হবে না। সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সমন্বয় করে কাজ করছে। কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, ‘ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।’ পঞ্চগড়ে তিন দিক ভারতীয় সীমান্ত থাকলেও এবার হাটে ভারতীয় গরু নেই বললেই চলে। তবে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ‘সেফ রুট’ বানিয়ে ভারতীয় গরু ঢুকছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চোরাকারবারিরা গরুর মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে, পায়ে কাপড় পেঁচিয়ে শব্দ না করে সীমান্ত পার করছে। ময়মনসিংহের খামারি কামরুল হাসান বলেন, ‘ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশি গরুর দাম অর্ধেকে নেমে আসবে।’


আবহাওয়া ও ভোগান্তি প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা ও আশপাশে অস্থায়ীভাবে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। বাতাসে আর্দ্রতা ৯৬ শতাংশ থাকায় বৃষ্টি থামার পর ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। কালশী হাটে অবশ্য ছামিয়ানা দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় বৃষ্টি বাধা হয়নি বলে জানিয়েছেন হাট কমিটি।


ডিএমপি জানিয়েছে, প্রতিটি হাটে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প, সিসিটিভি, জাল টাকা শনাক্তের মেশিন ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা টহল রয়েছে। চাঁদাবাজি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খুলনা বিভাগে ১৭০টি হাটে ১৪২টি পশুচিকিৎসা দল কাজ করছে। দুই সিটি করপোরেশন আলো, পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য অপসারণে টাস্কফোর্স গঠন করেছে।


সার্বিকভাবে শেষ মুহূর্তে হাট জমে উঠলেও বৃষ্টি, দাম আর ভারতীয় গরুর শঙ্কা নিয়ে মিশ্র অবস্থায় আছেন ক্রেতা-বিক্রেতা। খামারিরা বলছেন, ‘বৃষ্টি না হলে আর ভারতীয় গরু না ঢুকলে লোকসান হবে না।’ আর ক্রেতারা বলছেন, ‘দাম আরেকটু কমলে ভালো হতো।’ মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে বেচাকেনা।

সম্পর্কিত খবর

;