ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ কী? ইরানের ওপর কতটা আঘাত হানবে?

প্রকাশ : 21 Aug 2026
ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ কী? ইরানের ওপর কতটা আঘাত হানবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যাকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন-এর খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, এটি হবে “এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান” এবং ইরানকে যে কোনো ধরনের লাইফলাইন দেবে এমন দেশের বিরুদ্ধে “ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি” নেমে আসবে।


গত বুধবার রাতে দেওয়া ওই পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “যে কোনো দেশ তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যে কোনো ধরনের লাইফলাইন দিতে দেবে, সে নিজেই ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হবে। এটি হবে একটি অর্থনৈতিক ডি-ডে।” গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর এই ঘোষণা এলো।


বিবিসি ও রয়টার্স জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC) জানিয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ১০০০-এর বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ছায়া তেল বহর, শিপিং ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তাকারী সংস্থা এবং ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ, যেখানে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।


ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় লক্ষ্য চীন। ২০২৫ সালের কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। এর বেশিরভাগই কেনে চীনের স্বাধীন ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলো, যারা চীনের মোট পরিশোধন ক্ষমতার এক চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। রয়টার্স বলছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহ থেকে এমন পদক্ষেপ আসবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এর মধ্যে থাকতে পারে চীনের ছোট ব্যাংকগুলোর ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা, যারা ইরানের তেলের কোটি কোটি ডলার লেনদেন করছে। ইতোমধ্যে দুটি বড় চীনা ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে।


দ্বিতীয় বিকল্প হলো স্থল অবরোধ। কিছু মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তা ইরানের প্রতিবেশী ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও আফগানিস্তানের মাধ্যমে স্থলপথে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার কথা ভাবছেন। তৃতীয় বিকল্প হলো সেকেন্ডারি শুল্ক। ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যদিও সুপ্রিম কোর্ট সেই আইনি ভিত্তি বাতিল করেছে। তবে সিনেটে পাস হওয়া নতুন রাশিয়া-ইরান নিষেধাজ্ঞা বিলে তাকে নতুন শুল্ক ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।


এই চাপে ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বলছে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে, যা গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। মুদ্রাস্ফীতি ৮০ শতাংশের কাছাকাছি এবং রিয়াল ডলারের বিপরীতে রেকর্ড সর্বনিম্নে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল এখনো সমুদ্রে ভাসছে, যা চীনের কাছে বিক্রি করে মাসে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। প্রতিদিন ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল হারে খালাস করলে এই তেল দিয়ে আর মাত্র চার মাস চলবে। সিএনএন-এর বিশ্লেষণে একে ‘ধীরে ধীরে মৃত্যু’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


তবে ইরান এই হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা, রেকর্ড ঋণ ও সুদের হার বৃদ্ধি থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, “আমেরিকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বিশ্ব অর্থনীতি এবং দেশগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।”


এদিকে এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম টানা পাঁচ দিন বেড়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১৩০টি জাহাজ চলাচল করলেও এখন তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক যন্ত্রণা ইরানের জন্য নতুন নয়। ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ইরানের নেতৃত্ব আরও অনেক অর্থনৈতিক যন্ত্রণা সহ্য করতে প্রস্তুত। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা এবং এখন দীর্ঘ যুদ্ধ সহ্য করেও তারা পিছু হটেনি। তাই ট্রাম্পের এই ডি-ডে ইরানকে কতটা নত করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।


সম্পর্কিত খবর

;