নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী,ফরিদপুরে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

প্রকাশ : 22 Jul 2026
নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী,ফরিদপুরে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: একসময় যে ৫০০ টাকায় সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজারের বড় একটি অংশ সেরে ফেলা যেত, এখন সেই অর্থে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সংসারের ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।


স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের আয় তো বাড়েনি, কিন্তু বাজারের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে ৫০০ টাকায় সপ্তাহের বেশির ভাগ প্রয়োজন মিটে যেত। এখন একদিনের বাজার করতেই সেই টাকা যথেষ্ট হয় না।”


একই বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন আলফাডাঙ্গা পৌরসভার বাকাইল গ্রামের ভাঙারি ব্যবসায়ী আক্কাস বিশ্বাস। তিনি জানান, বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো কাগজ, কার্টন, লোহা ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হলেও বর্তমানে তা কমে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে। ভাঙারি পণ্যের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। আগে যে কার্টন প্রতি কেজি ১৬ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ টাকায়। ফলে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।


আলফাডাঙ্গা সদর বাজার, গোপালপুর, জাটিগ্রাম ও হেলেঞ্চা হাট ঘুরে দেখা গেছে, গত ছয় মাসের তুলনায় অধিকাংশ শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজির সরবরাহ কম থাকায় বাজার এখন অনেকটাই বাইরের জেলার ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ সবজি অন্য জেলা থেকে আসে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং মৌসুমি প্রভাব মিলিয়েই দাম বেড়েছে।


বর্তমানে আলফাডাঙ্গা বাজারে আলু প্রতি কেজি ৩০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকা, আদা ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়স ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আকারভেদে লাউ ও চালকুমড়ার দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। স্থানীয় পুঁইশাক, কলমিশাক ও লালশাক বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।


সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন মিয়া বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই অধিক দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারেও কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই। তবে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


শুধু সবজির বাজার নয়, মাছের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। মাছ ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র জানান, বর্ষা মৌসুম হলেও নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে দেশীয় মাছের দাম বর্তমানে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে চাষের রুই, কাতলা, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্পের মতো মাছও ৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।


আরেক মাছ ব্যবসায়ী পবন দাশ বলেন, স্থানীয় উৎপাদন কম থাকায় খুলনা, বাগেরহাট, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অতিরিক্ত খরচের প্রভাব সরাসরি বাজারমূল্যে পড়ছে।


আলফাডাঙ্গা সদর বাজার সবজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জুদ্দু মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছরই সবজির দাম কিছুটা বাড়ে। তবে এবার স্থানীয় উৎপাদন কম থাকায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং স্থানীয়ভাবে সবজির উৎপাদন বাড়লে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।


এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার তদারকি জোরদার এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য আরও নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সংসারের ব্যয় সামাল দেওয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে কিংবা তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দিয়েই বাজার থেকে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে।


সম্পর্কিত খবর

;