বিল্লাল বিন কাশেম:
পহেলা মে — শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় দিন। শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকদের রক্তে লেখা এই দিনটি যুগে যুগে বিশ্বের মেহনতি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে আছে। আট ঘণ্টা শ্রম, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো মৌলিক দাবি আদায়ে শতাব্দীজুড়ে যেসব আন্দোলন হয়েছে, তার শিকড় এই মে দিবসেই। তবে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব শ্রমবাজারের চেহারা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তি বিপ্লব, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণ এবং বিশেষত 'গিগ ইকোনমি' বা স্বল্পমেয়াদী চুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির উত্থান মে দিবসের তাৎপর্য ও বাস্তবতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রশ্ন উঠছে — আজকের দিনটিতে আমরা কাদের শ্রমের কথা বলবো? কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবো শ্রমের অধিকারকে?
গিগ ইকোনমি: একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
'গিগ ইকোনমি' বলতে বোঝায় এমন একটি শ্রমবাজার, যেখানে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি, নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক বা অনিয়মিত কাজ করে আয় করে। এরা হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মচারী নয়, বরং ফ্রিল্যান্সার, পার্টটাইমার, কিংবা রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের ড্রাইভার বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ডেলিভারি পার্সন। বিশ্বব্যাপী গিগ শ্রমিকদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে গিগ ইকোনমির আওতায় পড়বে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্র ভিন্ন নয়। পাঠাও, উবার, ফুডপান্ডা, Fiverr, Upwork-এর মতো প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়ে পড়েছেন।
গিগ ইকোনমির বড় বৈশিষ্ট্য হলো কাজের নমনীয়তা। এখানে কর্মীরা নিজের ইচ্ছামতো কাজের সময় নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু এই নমনীয়তার আড়ালে রয়েছে অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, স্থায়ী আয় না থাকা এবং শ্রম আইনের বাইরের অবস্থান।
মে দিবসের মূল দর্শন ও গিগ ইকোনমির ব্যবধান
মে দিবসের মূল দর্শন ছিল — শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিশ্রাম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংঘবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে।
গিগ ইকোনমিতে সেই ঐক্যবদ্ধতার চেহারা মলিন। এখানে অধিকাংশ শ্রমিক ব্যক্তি উদ্যোগে কাজ করে, যার ফলে তাদের মধ্যে ঐক্য ও সম্মিলিত দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল। একদিকে যেমন গিগ কর্মী স্বাধীনতা উপভোগ করেন, অন্যদিকে কাজ হারানোর ভীতি এবং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি তাদের অনিরাপত্তার মধ্যে রাখে। ফলে মে দিবসের 'শ্রমিক সংহতির' ধারণা গিগ ইকোনমির বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
গিগ শ্রমিকদের চ্যালেঞ্জ
১. স্থায়ী আয়ের অনিশ্চয়তা
গিগ শ্রমিকদের আয় নির্ভর করে কাজের সুযোগের ওপর। মাসভিত্তিক বেতন নেই। ফলে তাদের জীবনযাপনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
২. সামাজিক সুরক্ষার অভাব
স্থায়ী কর্মীদের জন্য থাকা স্বাস্থ্যবিমা, দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন সুবিধা গিগ শ্রমিকদের জন্য নেই। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় তারা নিরুপায় হয়ে পড়ে।
৩. আইনি স্বীকৃতির সংকট
অনেক দেশে গিগ শ্রমিকদের এখনো আনুষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে শ্রম আইনে তাদের অধিকারের কোনো সুরক্ষা নেই।
৪. আত্মসম্মানের সংকট
অনেক সময় গিগ শ্রমিকদের অবমূল্যায়ন করা হয়। সমাজে তাদের কাজকে অস্থায়ী বা 'কম মর্যাদার' মনে করা হয়, যা মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
৫. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এলগরিদমের মাধ্যমে কাজ বরাদ্দ করে। এতে শ্রমিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়, অথচ কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা থাকে না।
সম্ভাবনা: গিগ ইকোনমি কি মুক্তির পথ?
সব সংকটের মাঝেও গিগ ইকোনমি কিছু নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের জন্য।
অনেকে নিজস্ব দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে।
চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে আত্মকর্মসংস্থানের পথে এগোচ্ছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ছে, বৈশ্বিক বাজারের সাথে সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
নারীরা বাড়িতে বসেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছে, যা কর্মজীবী নারীর হার বাড়াতে সহায়তা করছে।
বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির সময় গিগ ইকোনমির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, অনলাইন শিক্ষাসহ নানা খাতে গিগ কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নতুন শ্রম আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা
আজকের বাস্তবতায় মে দিবসের মূল চেতনা — শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্যতা — আরও বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। গিগ ইকোনমির শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন ধরনের সংগঠন, নীতিমালা ও আন্দোলন দরকার।
বিশ্বের কিছু দেশে গিগ শ্রমিকরা ইতোমধ্যে সংগঠিত হতে শুরু করেছে।
যুক্তরাজ্যে ডেলিভারি চালকদের 'কিউরিয়ারস অ্যান্ড রাইডারস ইউনিয়ন' গড়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় 'Gig Workers Rising' নামে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিক আন্দোলন চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গিগ শ্রমিকদের সুরক্ষায় নীতিমালা প্রণয়ন করছে।
বাংলাদেশেও প্রয়োজন:
গিগ শ্রমিকদের স্বীকৃতি দেওয়া।
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ।
স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমার আওতায় আনা।
কাজের সময় ও নিরাপত্তা বিধান করা।
এ জন্য শ্রমিক সংগঠন, সরকার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে নীতিমালা তৈরির প্রয়োজন।
নীতিমালা ও আইনি কাঠামো
বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) মূলত কারখানা, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য প্রণীত। গিগ শ্রমিকরা সেখানে অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং নতুন আইনি কাঠামো তৈরি জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গিগ কর্মীদের জন্য বিশেষ শ্রম কোড তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে থাকবে:
শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি।
কাজের শর্তাবলী নির্ধারণ।
ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা।
বীমা ও সামাজিক নিরাপত্তা।
অবহেলা বা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা।
তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে, তখন এই নতুন বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করা মে দিবসের চেতনাকে অপমান করার শামিল হবে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
গিগ ইকোনমি ক্রমাগত বাড়বে — এটা নিশ্চিত। তবে এর সঙ্গে বেড়ে যাবে বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যদি না এখন থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তরুণদের জন্য গিগ অর্থনীতির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।
উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহায়তা দিতে হবে।
প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্বব্যাপী শ্রম দিবসের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে গিগ কর্মীদেরকেও 'শ্রমিক' হিসেবে সম্মান জানাতে হবে। শ্রমের মর্যাদা কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা পরিবেশের মধ্যে আবদ্ধ নয় — সেটি হতে পারে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের এককোণে বসেও।
মে দিবস আমাদের শিক্ষা দেয় — শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার ও মানুষের সম্মান রক্ষার জন্য সংগ্রাম চিরন্তন। গিগ ইকোনমির যুগে সেই সংগ্রাম নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে শ্রমিকরা আরও বিচ্ছিন্ন, আরও অনিশ্চিত; কিন্তু তাদের দাবি, আশা ও মর্যাদা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আজকের মে দিবসে আমাদের সংকল্প হোক — পুরনো ধাঁচের শ্রমিকদের মতোই গিগ শ্রমিকদের জন্যও ন্যায্যতার দাবিতে সোচ্চার হওয়া। তারা যেন হয় একটি সম্মানজনক, নিরাপদ এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যতের পথিক।শ্রমিকের মর্যাদা চিরকাল — সময়ের পরিবর্তনে শুধু তার রূপ বদলায়, সুর নয়।
-লেখক: কবি, কলামিস্ট ও গণসংযোগবিদ।
bbqif1983@gmail.com
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments