মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা ও মহান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স

প্রকাশ : 09 Mar 2026
মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা ও মহান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স

সৈয়দ আমিরুজ্জামান


“ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনি মার্ক্স আবিষ্কার করেছেন মানব ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম। মানুষের আগে খাদ্য, পানীয়, আশ্রয় ও বস্ত্রের প্রয়োজন—এই সহজ সত্যের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে সমাজের রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও ধর্মীয় ভাবনা।”

— ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস


১৪ মার্চ মহান দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৮৩ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এর আগে ১৮৮১ সালের ডিসেম্বরে স্ত্রী জেনির মৃত্যুর পর তিনি ক্যাটার নামের এক রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তা ব্রঙ্কাইটিস ও পরে প্লিউরিসিতে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত এই রোগেই ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়।


মৃত্যুর সময় তাঁর কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় পরিচয় ছিল না। ১৭ মার্চ লন্ডনের হাইগেট কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিফলকে খোদাই করা রয়েছে দুটি বিখ্যাত বাক্য। প্রথমটি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ আহ্বান—

“দুনিয়ার মজদুর এক হও।”


আর দ্বিতীয়টি তাঁর বিখ্যাত দার্শনিক উক্তি—

“দার্শনিকেরা এতদিন পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু মূল কাজ হলো এটিকে পরিবর্তন করা।”


জন্ম ও বৌদ্ধিক বিকাশ


১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রিয়ের শহরে জন্মগ্রহণ করেন কার্ল মার্ক্স। বিশ্বজুড়ে এ বছর পালিত হয়েছে তাঁর জন্মের দুই শত তিনতম বার্ষিকী।


জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে মার্ক্স তাঁর সহযোদ্ধা ও বন্ধু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে মিলে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী মতাদর্শ গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে এই মতবাদই “মার্ক্সবাদ” নামে পরিচিত হয়।


মার্ক্সবাদ এমন এক তাত্ত্বিক কাঠামো, যা প্রকৃতি, সমাজ, চিন্তা ও মানবমুক্তির গতিবিধি বিশ্লেষণ করে। একই সঙ্গে এটি শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজ পরিবর্তন ও সমাজতন্ত্র নির্মাণের পথ নির্দেশ করে।


মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণপদ্ধতি এবং সমাজ-ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যাগুলোর সম্মিলিত রূপই হলো মার্ক্সবাদ।


তত্ত্ব ও সংগ্রামের সমন্বয়


মার্ক্স তাঁর জীবনে “বিদ্যমান সকল কিছুর কঠোর সমালোচনা”র নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁকে বিভিন্ন দেশ থেকে নির্বাসিতও হতে হয়। তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেছে।


তবে এই কঠিন জীবনসংগ্রাম তাঁর চিন্তা ও গবেষণাকে থামাতে পারেনি। তিনি একদিকে যেমন গভীর গবেষণা করেছেন, অন্যদিকে তেমনি সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।


দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্ত্বিক ও বিপ্লবী—এই সব পরিচয়ের সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে। পাশাপাশি তিনি সাংবাদিক ও লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন।


কমিউনিস্ট ইশতেহার


১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট লীগের জন্য মার্ক্স ও এঙ্গেলস যৌথভাবে রচনা করেন বিখ্যাত কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। এ বছর এই গ্রন্থের প্রকাশনার ১৭৫তম বছর পূর্তি পালিত হয়েছে।


ইশতেহারে তাঁরা স্পষ্ট ঘোষণা করেন—

কমিউনিস্টরা তাদের লক্ষ্য গোপন করে না। বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই তাদের লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।


তাঁদের ঐতিহাসিক আহ্বান ছিল—

“শৃঙ্খল ছাড়া সর্বহারার হারাবার কিছু নেই; জয় করার জন্য আছে সমগ্র বিশ্ব।”


আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন


১৮৬৪ সালে লন্ডনে মার্ক্সের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন বা প্রথম আন্তর্জাতিক।


১৮৭১ সালে প্যারিস কমিউন ছিল শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রথম ঐতিহাসিক প্রয়াস। এই সময়েই ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয় মার্ক্সের অমর গ্রন্থ ‘পুঁজি’ (ডাস ক্যাপিটাল)-এর প্রথম খণ্ড।


মার্ক্সবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি


লেনিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী মার্ক্সবাদের তিনটি প্রধান উৎস রয়েছে—


১. জার্মান দর্শন

২. ইংরেজ রাজনৈতিক অর্থনীতি

৩. ফরাসি সমাজবাদ


এই তিন উৎস থেকেই মার্ক্সবাদের তিনটি প্রধান উপাদান গড়ে ওঠে—

দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ।


মার্ক্স হেগেলের দর্শন থেকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি গ্রহণ করেন, কিন্তু তার ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে লুডভিগ ফয়েরবাখের বস্তুবাদ থেকে উপাদান গ্রহণ করলেও তিনি যান্ত্রিক বস্তুবাদকে সমালোচনা করেন।


এই দুই ধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ।


ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা


মার্ক্স দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করে মানব ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই হলো মূল ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র, আইন, রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।


তিনি দেখান, উৎপাদন ব্যবস্থার নির্দিষ্ট পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণী। আর এই শ্রেণীগুলোর দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় শ্রেণীসংগ্রাম।


মার্ক্স-এঙ্গেলস মানব সমাজের বিকাশকে কয়েকটি ধাপে ব্যাখ্যা করেছেন—


আদিম সাম্যবাদ


দাস সমাজ


সামন্ততন্ত্র


পুঁজিবাদ


সমাজতন্ত্র


সাম্যবাদ


তাঁদের মতে, “এযাবৎ বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাসই শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।”


পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ


ইংরেজ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো শ্রমমূল্য তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। মার্ক্স সেই তত্ত্বকে আরও বিকশিত করেন।


তিনি দেখান, কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় সেই পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমসময়ের দ্বারা।


মার্ক্স পুঁজিবাদের অন্যতম মৌলিক দ্বন্দ্ব চিহ্নিত করেন—

উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র বনাম ব্যক্তিগত মালিকানা।


তিনি উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বের মাধ্যমে দেখান, শ্রমিকের উৎপাদিত সম্পদের একটি অংশ পুঁজিপতিরা নিজেদের মুনাফা হিসেবে আত্মসাৎ করে। এই উদ্বৃত্ত মূল্যই পুঁজিবাদী মুনাফার মূল উৎস।


বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ


ফরাসি চিন্তাবিদ সাঁ সিমোঁ, চার্লস ফুরিয়ে ও রবার্ট ওয়েন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাদের ধারণা ছিল মূলত কল্পনাভিত্তিক।


মার্ক্স সেই ধারণাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেন। তাঁর মতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে শ্রেণীসংগ্রামের মাধ্যমে এবং শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে।


মার্ক্সবাদের বিকাশ


মার্ক্সের মৃত্যুর পর এঙ্গেলস তাঁর চিন্তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে লেনিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে মার্ক্সবাদকে নতুন মাত্রা দেন।


১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে লেনিনের নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণী প্রথমবার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।


এরপর মাও সে তুং চীনে দীর্ঘ গণসংগ্রামের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ দেখান। এই ধারাবাহিকতায় মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ গড়ে ওঠে।


সমসাময়িক বিশ্বে মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা


আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আর বিপুল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য ও বেকারত্বে ভুগছে।


বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মোট সম্পদের বড় অংশই অল্পসংখ্যক ধনী মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত।


এদিকে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রমশক্তির ওপর চাপ বাড়ছে। পরিবেশ ধ্বংস, যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত এবং সামাজিক বৈষম্য বিশ্বকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যায় মার্ক্সবাদ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে আলোচিত।


উপসংহার


মার্ক্সবাদ কেবল একটি তাত্ত্বিক মতবাদ নয়; এটি সমাজকে বোঝার এবং পরিবর্তনের একটি পদ্ধতি।


যতদিন পৃথিবীতে শোষণ, বৈষম্য ও অবিচার থাকবে, ততদিন কার্ল মার্ক্সের চিন্তা ও তত্ত্ব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।


মানবমুক্তি, ন্যায়বিচার এবং সমতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ আজও তাঁর চিন্তা থেকে প্রেরণা খুঁজে পান।


কবিতা: “কার্ল মার্ক্স”


(সৈয়দ আমিরুজ্জামান)


পাঁচই মে’র এক প্রভাতে ট্রিয়ের নগর ঘুমে,

জন্ম নিল এক চিন্তার সূর্য মানব ভূমে।

প্রুশিয়ার সে শিশুটিই পরবর্তীকালে

মানব ইতিহাস লিখল নতুন রক্তজ্বালে।


কার্ল মার্ক্স—নামটি যেন বিদ্রোহেরই শপথ,

শ্রমিকের অধিকার চাওয়া সংগ্রামেরই রথ।

চিন্তার মশাল হাতে নিয়ে যুগের পথে চলে,

দেখাল মানুষ মুক্তির পথ জগতেরই তলে।


ডারউইন যেমন প্রকৃতির গোপন বিধি খোঁজে,

জীবনরহস্য খুলে দেয় বিবর্তনের খোঁজে,

তেমনি মার্ক্স দেখালেন ইতিহাসের গতি—

মানব সমাজ চলে কেমন শ্রেণীসংঘাতে জ্বতি।


খাদ্য আগে, বস্ত্র আগে, আশ্রয় আগে চাই,

মানুষ আগে বাঁচবে তবে সভ্যতারই ঠাঁই।

রাজনীতি আর ধর্ম পরে, শিল্প কিংবা গান—

অর্থনৈতিক ভিত্তিতেই দাঁড়ায় সভ্য প্রাণ।


যতদিন শোষণ থাকবে পৃথিবীরই বুকে,

ততদিন মার্ক্স বেঁচে থাকবেন মানুষের সুখে।

ইতিহাসের পথ বেয়ে তাঁর চিন্তারই শিখা,

মানবতার মুক্ত আকাশে জ্বালবে নতুন দিশা।


-লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত খবর

;