মোঃ আবুবকর সিদ্দীক:
প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদের এই উদ্ধৃতাংশটুকু এদেশের জনগণকে বিশেষ মর্যাদায় আসীন করেছে। রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের সম্পর্ক, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ, নাগরিকদের অধিকার, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়গুলো উপলব্ধির জন্য এই অনুচ্ছেদটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যবোধ সৃষ্টিতে এটি মোক্ষম উদ্দীপক।
গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। ভোটদানের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রতিফলন ঘটে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত হয়। এ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণকে পরোক্ষ হিসেবে অভিহিত করা হলেও সার্বিক বিবেচনায় এ পদ্ধতির অপরিহার্যতা উল্লেখযোগ্য। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠনে জনগণের সম্পৃক্ততাকে যথার্থভাবে মূল্যায়িত করেই সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার উত্তরাধিকার হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার কানুনগুলো বহুবছর ধরে প্রজাতন্ত্রের মালিককে প্রজা বানিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে জনগণ যাদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেছে তারা রাজা সেজে সুদীর্ঘকাল মালিকপক্ষকে অগ্রাহ্য করে গেছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে - ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য৷’ সংবিধানে এ অনুচ্ছেদটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে গেছে। স্বার্থান্বেষীমহল একাট্টা হয়ে গোপনীয়তার সংস্কৃতিকে সুকৌশলে প্রলম্বিত করে গেছেন। জনগণ ও শাসনব্যবস্থার মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র তথা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে। একারণে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তৈরি হয়নি। প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়নি। যদিওবা কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হয়েছে, সেটিও দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ তছরুপ হয়েছে। এর ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণে রাষ্ট্র এখনও সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। দুর্নীতির দুষ্টচক্রে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
গোপনীয়তার সংস্কৃতি দুর্নীতির বিস্তারের অন্যতম কারণ। দুর্নীতি রুখতে হলে গোপনীয়তার সংস্কৃতিকে উৎখাত করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে তথ্যের অবাধ প্রবাহ। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকগণের চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার অধিকারকে অবাধ করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটেই তথ্য অধিকার আইন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়নের যৌক্তিকতা হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে জনগণের ক্ষমতায়ন, নাগরিকগণের চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতা সুসংহত করা এবং দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিধৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন একটি যুগান্তকারী ঘটনা। জাতি হিসেবে সততা ও নৈতিকতা চর্চার প্রত্যয় থেকেই এ আইনের সূচনা। নিঃসন্দেহে এটি অত্যুত্তম একটি আইন। এ আইনের মাধ্যমে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এ আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে - ‘এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের নিকট হতে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকিবে এবং কোন নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাহাকে তথ্য সরবরাহ করিতে বাধ্য থাকিবে।’ এ বিধান জনগণের তথ্য প্রাপ্তির আইনগত ভিত্তি। এ আইনের আওতায় যেকোনো নাগরিক কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট তথ্য চাইতে পারে। এ আইনে কোনো কর্তৃপক্ষের গঠন, কাঠামো ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত যে কোন স্মারক, বই, নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, লগ বহি, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি, দলিল, নমুনা, পত্র, প্রতিবেদন, হিসাব বিবরণী, প্রকল্প প্রস্তাব, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও, অঙ্কিত চিত্র, ফিল্ম, ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত যে কোনো উপকরণ, যান্ত্রিকভাবে পাঠযোগ্য দলিলাদি এবং ভৌতিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্বিশেষে অন্য যে কোনো তথ্যসম্বলিত বস্তু বা তার প্রতিলিপিও তথ্য হিসেবে অভিহিত। এককথায়, কেবল দাপ্তরিক নোটশিট বা নোটশিটের প্রতিলিপি ব্যতীত অন্যান্য সকল বিষয়েই বিধি মোতাবেক জনগণের তথ্য পাওয়ার আইনগত অধিকার তৈরি হয়েছে। এ আইনে যেসকল প্রতিষ্ঠান, দপ্তর বা সংস্থার নিকট থেকে তথ্য চাওয়া যাবে সেটার পরিধিও ব্যাপক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সৃষ্ট কোন সংস্থা, এ সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত কার্যবিধিমালার অধীন গঠিত সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়, কোনো আইন দ্বারা বা এর অধীন গঠিত কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে তথ্য চাওয়া যাবে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বা সরকারি তহবিল হতে সাহায্যপুষ্ট কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি সাহায্যপুষ্ট কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানও তথ্য দিতে বাধ্য। এছাড়া, সরকারের পক্ষে অথবা সরকার বা সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকেও নাগরিকদের চাহিদা সাপেক্ষে তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
তথ্য অধিকার আইনের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ আইনে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটির ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে- ‘প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ উহার গৃহীত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের সকল তথ্য নাগরিকগণের নিকট সহজলভ্য হয়, এইরূপে সূচিবদ্ধ করিয়া প্রকাশ ও প্রচার করিবে'। এরূপে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কোন কর্তৃপক্ষ কোন তথ্য গোপন করতে বা এর সহজলভ্যতাকে সংকুচিত করতে পারবে না। স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের এই বিধান আইনটিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এই ধারার অধীনে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ ও প্রচার নির্দেশিকা প্রণীত হয়েছে। এই ধারাটিকে কার্যকর করা সম্ভব হলেই তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হবে এবং জনগণের তথ্য প্রাপ্তির পথ সহজ ও সুগম হবে।
এ আইনে অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে কিছুক্ষেত্রে তথ্য অধিকার বারিত করা হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বিবেচনা ও সদিচ্ছার বিষয়টি অবারিত রাখা হয়েছে। তথ্য প্রাপ্তির অধিকার লঙ্ঘিত হলে রয়েছে প্রতিকার ব্যবস্থা। আইনে প্রথমত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অতঃপর আপিল কর্মকর্তা ও সবশেষে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়েরের ব্যবস্থা রয়েছে। তথ্য প্রদান না করা, ভুল তথ্য প্রদান করা তথা আইনের বিধান ব্যত্যয়ে দায়ী ব্যক্তিকে জরিমানা, ক্ষতিপূরণের আদেশ দিয়ে বিভাগীয় মামলা রুজুর সুপারিশ করার বিধান রাখা হয়েছে। সুতরাং তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এটি একটি অসাধারণ পদক্ষেপ, যা আইনটিকে শক্তিশালী করেছে।
বর্তমান যুগ তথ্যের যুগ। যে ব্যক্তি যত তথ্যসমৃদ্ধ সে ব্যক্তি ততটাই শক্তিশালী। প্রকৃতপক্ষে তথ্যই শক্তি। একারণে তথ্যে অভিগম্যতা নিশ্চিত করা জনগণের ক্ষমতায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বিশ্বজুড়েই শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। নাগরিকের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সদাচরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দ্রুততম সময়ে ঝামেলামুক্ত সেবা প্রভৃতি বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। আমাদের দেশেও বেশ কিছু উত্তম চর্চা অনুসৃত হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নাগরিক সেবা সনদ, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা, ওয়ানস্টপ সেবা, নাগরিক সেবায় উদ্ভাবন, ওয়েব পোর্টাল প্রভৃতির সন্নিবেশ ঘটেছে। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও তথ্যে অভিগম্যতার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিভাত হচ্ছে।
আঁধারের মাঝেই শুরু হয় আলোর অন্বেষণ। অন্ধকার যতটা ঘনীভূত হতে থাকে আলো ততটাই নিকটবর্তী হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং বর্ণিল আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ত্রিভুবন। তথ্য অধিকার আইনের প্রবর্তন প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশ এ বিষয়টিকেই প্রমাণ করে। সময়ের পরিক্রমায় আইনের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘তথ্য অধিকার আইন-২০০৯’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে সংশোধিত আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এ আইনের ৫, ৬, ৭ ও ২৭ নম্বর ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ সংশোধনের মাধ্যমে আইনটি যুগোপযোগী হয়ে উঠবে।
তথ্য অধিকার আইন একটি জনবান্ধব ও সর্বজনীন আইন। এ আইন প্রকৃত অর্থেই জনগণের আইন। আইনটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো- একমাত্র তথ্য অধিকার আইন ব্যতীত দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইনে কর্তৃপক্ষ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনটি জনগণ কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। তথ্য অধিকার আইন জনগণের ক্ষমতায়নে একটি মাইলফলক।
#
-লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
পিআইডি ফিচার
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments