নাগরিক সচেতনতাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলার মূল শক্তি

প্রকাশ : 25 Sep 2025
নাগরিক সচেতনতাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলার মূল শক্তি

আমরান হোসাইন শাকিল:

জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি পুরো বিশ্বের জন্য এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত-সবই প্রমাণ করে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর প্রভাব। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।


নাগরিক সচেতনতা মূলত শুরু হয় প্রতিদিনের জীবনধারার ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অযথা অপচয় রোধ করলে শুধু খরচই কমে না, বরং শক্তি উৎপাদনে যে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার হয় তা থেকেও পৃথিবী বাঁচে। পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন বা সাইকেল ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তি ব্যবহারের প্রতি ঝোঁক নাগরিক পর্যায়ে বাড়ানো গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।


বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহার হচ্ছে, যার বড় অংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়। এসব প্লাস্টিক নদী-খাল দখল করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে, আবার পুড়িয়ে ফেললে বায়ুতে ক্ষতিকর গ্যাস ছড়াচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নাগরিকরা যদি সচেতনভাবে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যাগ, কাগজ বা জৈব প্যাকেট ব্যবহার শুরু করে তবে দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্লাস্টিক বর্জ্যের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


গাছ শুধু পরিবেশকে সুন্দর করে না, এটি আমাদের অস্তিত্বের সাথে সরাসরি জড়িত। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে প্রায় ২২ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। নাগরিকরা যদি নিজেদের বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার পাশে বা খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করেন এবং সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করেন, তাহলে শহর ও গ্রামের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মাটির ক্ষয় রোধ ও বায়ুর মান উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম অপরিহার্য।


প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ এলাকায় পরিবেশ রক্ষায় সংগঠিত উদ্যোগ নিতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা, পানি সংরক্ষণ বা বৃষ্টির পানি সংগ্রহ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা কিংবা স্থানীয় বিদ্যালয় ও মহল্লায় পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা প্রচার চালানো। এসব কার্যক্রম শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমায় না, বরং একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলে।


সচেতন নাগরিকদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নীতি পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার। ভোটের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রার্থীকে নির্বাচিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো, পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা—এসব কার্যক্রম সরকার ও কর্পোরেট খাতকে বাধ্য করতে পারে পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নাগরিকরা যদি একযোগে কণ্ঠস্বর তোলে, তবে যে কোনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রয়েছে।


জলবায়ু পরিবর্তন নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক একটি সংকট, তবে এর সমাধান শুরু হয় স্থানীয় পর্যায় থেকে। বাংলাদেশে যদি প্রতিটি নাগরিক সচেতনভাবে শক্তি ব্যবহার, প্লাস্টিক কমানো, গাছ লাগানো এবং সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে, তাহলে সম্মিলিতভাবে এর ফল বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই প্রতিটি নাগরিকই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একেকজন যোদ্ধা।


জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা কমাতে শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সরকারি নীতি যথেষ্ট নয়। প্রকৃত পরিবর্তন আসবে যখন সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে সচেতন হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করবে। নাগরিক সচেতনতাই হতে পারে পৃথিবী রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

সম্পর্কিত খবর

;