মো. মামুন অর রশিদ:
মানুষ যেমন কথা বলে, তেমনি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরও কথা বলে। অনেকের মনেই প্রশ্ন আসবে— কীভাবে দপ্তর কথা বলে? সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসমূহ লিখিত ভাষায় কথা বলে। এই লিখিত ভাষায় কথা বলার বহুলপ্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম হলো ‘পত্র’। পত্রের মাধ্যমেই কোনো দপ্তরের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, চাহিদা, ক্ষোভ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। দাপ্তরিক পত্রে সাহিত্যরস নেই বললেই চলে। দাপ্তরিক পত্রে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে— এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে।
‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বাধ্যবাধকতাকে আমলে নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে অক্টোবর ‘সরকারি কাজে বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণ’-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়— বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহারে সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব। এ পরিপত্র দ্বারা সরকারি কাজে সর্বত্র বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ পরিপত্রের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ ‘সরকারি কাজে ব্যবহারিক বাংলা’ পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ পুস্তিকা প্রকাশের পর বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ লিখনরীতির নির্দেশিকা হিসেবে ‘সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম’ পুস্তিকা প্রকাশ করে (প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০১৭)। এ পুস্তিকায় বানানরীতি ও লিখনরীতি-সংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি সরকারি কাজে বহুলব্যবহৃত শব্দের শুদ্ধ রূপ উপস্থাপন করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, দাপ্তরিক যোগাযোগ তথা সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি এ ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকারি কাজে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। দাপ্তরিক পত্রে বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ ও ভুল বানানের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে দাপ্তরিক পত্র মুহূর্তেই একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছে যাচ্ছে। একইসঙ্গে পত্রের ব্যাকরণগত ভুল ও অশুদ্ধ বানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিকট উপস্থাপিত হচ্ছে। দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী দাপ্তরিক পত্রের ব্যাকরণগত ভুল ও অশুদ্ধ বানানকে শুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করছেন। ভুলে ভরা দাপ্তরিক পত্রের কারণে বাংলা ভুল বানান ও অপপ্রয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। যার ফলে দাপ্তরিক পত্রের মাধ্যমে একদিকে মাতৃভাষা বাংলাকে অমর্যাদা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অশুদ্ধ বাংলা বানান ও অপপ্রয়োগকে প্রচার করা হচ্ছে।
দাপ্তরিক যোগাযোগে বহুলপ্রচলিত ভাষাগত কয়েকটি ভুল দেখে নেওয়া যাক। দাপ্তরিক পত্রে বহুলব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘অনুষ্ঠিতব্য’। বহুলব্যবহৃত হলেও শব্দটি অশুদ্ধ। ‘ভবিষ্যতে কোনো কিছু করা হবে’ অর্থ প্রকাশে ‘অনুষ্ঠিতব্য’ না লিখে ‘অনুষ্ঠেয়’ বা ‘অনুষ্ঠাতব্য’ লিখতে হবে। অনেকেই ‘এই’ বা ‘এ’ অর্থ প্রকাশে ‘অত্র’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ‘অত্র’ অর্থ এখানে বা এই স্থানে। ‘অত্র’ শব্দটি কখনো ‘এই’ বা ‘এ’ অর্থ প্রকাশ করে না। আবার একই ব্যক্তির নামের পূর্বে ‘জনাব’ ও পরে ‘মহোদয়’ লেখাও সমীচীন নয়। ‘জনাব’ ও ‘মহোদয়’ সমার্থক শব্দ। তাই ‘জনাব’ বা ‘মহোদয়’ যে-কোনো একটি ব্যবহার করতে হবে। ‘আওতাধীন’, ‘আয়ত্তাধীন’, ‘অধীনস্থ’, ‘সবিনয়পূর্বক’, ‘শুধুমাত্র’, ‘সময়কাল’ প্রভৃতি শব্দ দাপ্তরিক যোগাযোগে বহুলপ্রচলিত হলেও অশুদ্ধ। ‘আওতাধীন’-এর পরিবর্তে ‘আওতায়’ বা ‘অধীন’ ব্যবহার করা যেতে পারে। ‘আয়ত্তাধীন’ ও ‘অধীনস্থ’-এর পরবির্তে লিখতে হবে ‘অধীন’। ‘সবিনয়পূর্বক’ না লিখে ‘সবিনয়’ বা ‘বিনয়পূর্বক’— যেকোনো একটি শব্দ ব্যবহার করা যাবে। ‘শুধুমাত্র’-এর পরিবর্তে লিখতে হবে ‘শুধু’ বা ‘মাত্র’। অনুরূপভাবে ‘সময়কাল’-এর পরিবর্তে লিখতে হবে ‘সময়’ বা ‘কাল’।
‘প্রেরণ করতে হবে’— এমন অর্থ বুঝাতে অনেকে ‘প্রেরিতব্য’ লিখে থাকেন। এটি ভুল। ‘প্রেরণ করতে হবে’ কিংবা ‘পাঠানোর যোগ্য’ অর্থ প্রকাশে ‘প্রেরণীয়’ লিখতে হবে। আবার অনেক পত্রে একই বাক্যে ‘জনিত’ ও ‘কারণ’ শব্দ দুটি পরপর লেখা হয়। ‘জনিত’ ও ‘কারণ’ সমার্থক শব্দ। তাই, ‘জনিত’ লিখলে ‘কারণ’ লেখার প্রয়োজন নেই। যেমন : ‘সংক্রমণজনিত কারণে’ না লিখে ‘সংক্রমণের কারণে’ লিখতে হবে। অনেকে আবার পদবির মাঝখানে ‘মহোদয়’ লিখে থাকেন। যেমন : ‘উপদেষ্টা মহোদয়ের একান্ত সচিব’, ‘সচিব মহোদয়ের একান্ত সচিব’ প্রভৃতি। শুদ্ধ হলো : ‘উপদেষ্টার একান্ত সচিব’, ‘সচিবের একান্ত সচিব’।
দাপ্তরিক যোগাযোগে অনেকে তারিখের শেষে ‘ইং’ লিখে থাকেন। ‘ইং’ না লিখে ‘খ্রিষ্টাব্দ’ বা ‘খ্রি.’ লিখতে হবে। আবার কেউ কেউ সময় লিখতে একবিন্দু (.) ব্যবহার করেন। যেমন : সকাল ৯.০০ টা, বিকাল ৫.২০ টা। মান্য রীতি হলো : সকাল ৯:০০ টা, বিকাল ৫:২০ মি.।
শুভেচ্ছা বা সম্ভাষণ জানাতে ‘স্বাগতম’ শব্দটি বহুলপ্রচলিত ও জনপ্রিয়। বাস্তবতা হলো ‘স্বাগতম’ শব্দটি অশুদ্ধ। ‘স্বাগতম’-এর শুদ্ধরূপ হলো ‘স্বাগত’। চাওয়া হয়েছে এমন— বুঝাতে অনেকে ‘চাহিত’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ‘চাহিত’ শব্দটি অশুদ্ধ। চাওয়া হয়েছে এমন— বুঝাতে ‘যাচিত’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
শব্দ সংক্ষিপ্তকরণে অনেকে বিসর্গ ব্যবহার করেন। শব্দ সংক্ষিপ্তকরণে বিসর্গের পরিবর্তে একবিন্দু (.) ব্যবহার করতে হবে। যেমন : ‘ডাক্তার’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ডা.। বিসর্গ একটি বর্ণ। শব্দের শেষের বিসর্গের উচ্চারণ ‘হ্’। যেমন : কেউ যদি ‘ডাক্তার’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ‘ডাঃ’ লেখেন, তাহলে উচ্চারণ হবে ‘ডাহ্’। আবার শব্দ সংক্ষিপ্তকরণে অনেকে কোলন (:) ব্যবহার করেন। এটিও অশুদ্ধ।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগ ত ও দাপ্তরিক পত্রে বিষয়-এর শেষে ‘প্রসঙ্গে’ বা ‘সংক্রান্ত’ লেখা হয়। যেমন— ‘বিষয় : নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন প্রসঙ্গে’; ‘বিষয় : নৈতিকতা কমিটি গঠন-সংক্রান্ত’ প্রভৃতি। ‘বিষয়’, ‘প্রসঙ্গ’ ও ‘সংক্রান্ত’— শব্দ তিনটি সমার্থক। ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক পত্রে বিষয়-এর শেষে নতুন করে ‘প্রসঙ্গে’ বা ‘সংক্রান্ত’ লেখা সমীচীন নয়। দাপ্তরিক পত্রে বহুলপ্রচলিত এ রকম হাজারো ভুল রয়েছে।
দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো— প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শুদ্ধ বাংলা চর্চা হচ্ছে না। আরেকটি কারণ হলো— বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের অভাব। দাপ্তরিক পত্র শুদ্ধভাবে লেখার চেষ্টা করেন— এ রকম ব্যক্তির সংখ্যাও অনেক কম। দাপ্তরিক পত্র লেখার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁদের পূর্বসূরিকে অনুসরণ করেন; কিন্তু অভিধান দেখেন না। এর ফলে দাপ্তরিক পত্রে পূর্বসূরিদের ভুল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গৃহীত হচ্ছে এবং নতুন করে কিছু ভুল যুক্ত হচ্ছে। এ কারণে দাপ্তরিক পত্রে ভুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দাপ্তরিক যোগাযোগে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাতৃভাষার প্রতি আন্তরিকতা। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি আন্তরিকতা নিয়ে শুদ্ধভাবে বাংলা লেখার চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে পারবেন। এর জন্য তাঁকে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত, হাতের কাছে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান রাখতে হবে। কোনও শব্দের বানানে সংশয় থাকলে অভিধান দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলা বানান শুদ্ধভাবে লেখার জন্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, যতিচিহ্ন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাক্যে যতিচিহ্নের হেরফের অর্থপার্থক্য সৃষ্টি করে। চতুর্থ, সরকারি দপ্তরের পত্র লেখার সময় সরকার-নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া শুদ্ধভাবে পত্র লেখার ক্ষেত্রে সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এ বর্ণিত পত্র-সংক্রান্ত নির্দেশনাও অনুসরণ করতে হবে।
বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চার অন্যতম ক্ষেত্র হলো দাপ্তরিক যোগাযোগ। এই দাপ্তরিক যোগাযোগে রাতারাতি বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য দপ্তরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় দাপ্তরিক যোগাযোগে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত হবে— এমনটাই প্রত্যাশা।
#
-লেখক : বিসিএস তথ্য ক্যাডার কর্মকর্তা এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা পদে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।
পিআইডি ফিচার
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments