গুজবের গজব : প্রতিরোধে হোন সরব

প্রকাশ : 30 Dec 2025
গুজবের গজব : প্রতিরোধে হোন সরব

মাহবুবুর রহমান তুহিন:


শৈশবে আমরা কবি শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতা পড়েছি। কবিতার প্রথম ও শেষ পংক্তি ছিলো এরকম - এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,/ চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।/ কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,/ আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।/ … নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;/ কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।/ ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম ?/ বৃথাই মাথার ঘাম ফেলছি, পণ্ড হল শ্রম।

এ কবিতায় তিনি ব্যাঙ্গাত্মকভাবে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।  কবিতার মূল কথা হলো-ঠিকমতো যাচাই না করে কোনো কাজ করা উচিত নয়। তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো  সিদ্ধান্ত নিলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হয়। পরিশেষে সকল প্রয়াস, পরিশ্রম বৃথা যায়, যা মোটেই কাম্য নয়। ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গুজব ও ভুয়া সংবাদের বিস্তার। এক সময় গুজব ছড়াত মুখে-মুখে; আজ তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর পরিণতিতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে গণতন্ত্রের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ইতিহাস জুড়ে গুজবকে রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রচার, ব্যক্তি স্বার্থ, ব্যাবসায়িক স্বার্থ হাসিলে কারসাজি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সাম্প্রদায়িক উসকানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘কর্পস ফ্যাক্টরি’ গুজব ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছিল যে জার্মানরা তাদের নিজস্ব সৈন্যদের মৃতদেহ ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করছে, এটি যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডা হিসেবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। 

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা MIT Media Lab–এর এক গবেষণায় দেখা যায়, সত্য সংবাদের তুলনায় মিথ্যা খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রায় ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আবার UNESCO–এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশ অন্তত একবার হলেও ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশেও এই চিত্র ব্যতিক্রম নয়। একটি বেসরকারি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী যাচাই না করেই তথ্য শেয়ার করেন—যা গুজব বিস্তারের প্রধান কারণ। সমাজে অস্থিরতার উৎস গুজব কেবল ভুল তথ্য নয়; এটি ভয়, ঘৃণা ও বিভেদের বীজ বপন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক গুজবকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সম্পদ ধ্বংস ও প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে। একটি মিথ্যা পোস্ট বা বিকৃত ছবি মুহূর্তেই জনমনে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। 

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সচেতন নাগরিক ও তথ্যভিত্তিক মতামত। কিন্তু গুজব যখন সত্যকে আড়াল করে, তখন নাগরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ভ্রান্ত হয়। নির্বাচনকালে ভুয়া খবর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ও চরিত্রহননের গুজব ভোটারদের বিভ্রান্ত করে। International IDEA–এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুয়া তথ্য ও গুজবের কারণে অনেক দেশে ভোটার উপস্থিতি কমেছে এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার) কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম গুজব ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অ্যালগরিদমভিত্তিক কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা অনেক সময় উত্তেজক ও চাঞ্চল্যকর ভুয়া তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কারণ এসব কনটেন্টে সম্পৃক্ততা (engagement) বেশি হয়। এতে গুজব আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গুজব আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে—যার প্রভাব শুধু ভোটের ফলাফলে নয়, পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পড়ে। ভিত্তিহীন বা বিকৃত তথ্য ভোটারদের ভুল ধারণা তৈরি করে। এতে তারা প্রার্থীর কর্মসূচি, যোগ্যতা বা অবস্থান সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যম নিয়ে গুজব ছড়ালে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, যা ভোটার উপস্থিতি কমাতে পারে। গুজব অনেক সময় উসকানিমূলক হয়ে ওঠে—জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। গুজব রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চরিত্র হনন, মিথ্যা অভিযোগ বা ভুয়া ভিডিও–অডিও দিয়ে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে গুজব মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় ক্ষতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন ভেজাল বা আগেই ফল নির্ধারিত—এ ধরনের গুজব ভোটারদের নিরুৎসাহিত করে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

বিশ্বায়নের এই যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গুজব বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গুজবের ক্ষতিকারক প্রভাব মোকাবিলার জন্য নিজেকে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকেও সচেতন করতে হবে। জনসাধারণকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও গুজবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে সাহায্য করতে মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষাদানে স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এমন প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা ও ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কৌশল শেখাবে। এছাড়া গঠনমূলক ও উন্মুক্ত আলোচনাকে উত্সাহিতকরণ গুজবের বিস্তার কমাতে সাহায্য করতে পারে। গুজব প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে কোনো সংবাদ প্রচার বা প্রকাশের আগে তার সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা উচিত।

ফ্যাক্ট চেকিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা হয়। এটি সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য বা ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কিছু মিডিয়া মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রকাশ করে। সাধারণ জনগণ অনেক সময় অজান্তেই মিথ্যা তথ্য শেয়ার করে যা পরবর্তীতে গুজব হিসেবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড়ো অংশ এখনো প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা তথ্য যাচাই করার পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত নয়। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাক্ট চেকিংকে একটি সাধারণ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, এবং নাগরিকদেরও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। গুজব প্রতিরোধে নাগরিক ফ্যাক্ট চেকিং বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ মানুষ গুজব ছড়ানোর সাথে সাথে তা যাচাই করতে পারলে, সেই গুজবটি আর বড়ো আকারে ছড়াবে না। 

নাগরিক ফ্যাক্ট চেকিং মূলত তিনটি ধাপের মাধ্যমে কার্যকর হতে পারে। প্রথম ধাপ হলো তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেটি সঠিক কি না যাচাই করা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি খবর বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কোনো বার্তার ক্ষেত্রে সেটির উৎস কোথায়, কোনো প্রসঙ্গে তা বলা হয়েছে এবং সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করা। নাগরিকরা যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সময় তা বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বা জাতীয় গণমাধ্যম, ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইট বা সরকারি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সেই খবরের বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তথ্য যাচাইয়ের পর নাগরিকরা সেটি তাদের সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে পারে। এটি গুজবের বিরুদ্ধে একটি তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে।

যদিও নাগরিক ফ্যাক্ট চেকিং গুজব প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর তবে এর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক নাগরিকই ফ্যাক্ট চেকিং সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হবে বা মিথ্যা তথ্যকে কীভাবে চিহ্নিত করতে হবে, তা জানে না। কখনো কখনো গুজবের পরিমাণ এত বেশি হয় যে সব গুজব যাচাই করা নাগরিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।অনেক সময় রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণে কিছু গুজবকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা নাগরিক ফ্যাক্ট চেকিংয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। ফ্যাক্ট চেকিংকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং টুল এবং অ্যাপ্লিকেশন যেমন গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ, টিনআই এবং অন্যান্য অনলাইন ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম নাগরিকদের তথ্য যাচাই করতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক এবং টুইটার তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য গুজব চিহ্নিত করার টুল তৈরি করেছে যা বাংলাদেশেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

নাগরিকদের জন্য ফ্যাক্ট চেকিং সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা সহজে মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করতে পারে। পাশাপাশি ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে, যেন সবাই তথ্য যাচাই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। সেইসাথে গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহে মনোযোগী হতে হবে নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ে সহযোগিতা করতে হবে। সাধারণ মানুষকে গুজব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং তারা যেন যাচাই না করা তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকে এ ব্যাপারে সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুজব প্রতিরোধে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা যেতে পারে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় গুজব ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি আরোপ করতে হবে।


গুজব মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সমাজকে অস্থির করে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়—এটি আজ প্রমাণিত বাস্তবতা। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাষ্ট্র বা গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, যাচাই ছাড়া কিছু না ছড়ানো এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণই পারে একটি স্থিতিশীল সমাজ ও শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে।

#

-লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর 

পিআইডি ফিচার



সম্পর্কিত খবর

;