হঠাৎ আলোচনায় বিগ-বি! বাংলাদেশে বিনিয়োগে ভারতকেই কেন রাখতে চায় জাপান?

প্রকাশ : 28 Oct 2026
হঠাৎ আলোচনায় বিগ-বি! বাংলাদেশে বিনিয়োগে ভারতকেই কেন রাখতে চায় জাপান?

ডেস্ক রিপোর্ট: জাপান সফরে থাকা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় হঠাৎ করেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে ‘বিগ-বি’ প্রসঙ্গ। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একযোগে প্রকাশ করা যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই প্রধানমন্ত্রী ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ কে নতুনভাবে উন্নীত করতে একমত হয়েছেন।


‘বিগ-বি’-এর ভিত্তিতে দুই প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের এই প্রকল্পে জাপান ভারতকে কেন যুক্ত রাখতে চাইছে।


বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে জাপান। গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহের জন্য সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানের এই ‘বিগ-বি’র মূল ধারণাই হলো বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগস্থলে পরিণত করা।


বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনাই হলো ‘বিগ-বি’ বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, জাপানের বিগ-বি পরিকল্পনার কেন্দ্রে হলো বাংলাদেশ এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ঘিরে বড় বিজনেস হাব করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে তারা।


কিন্তু এই পরিকল্পনায় শুরু থেকেই ভারত প্রসঙ্গটি জড়িয়ে আছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণাকে সামনে নিয়ে এই পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছিল জাপান। ২০২৩ সালে জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব উঠে আসে। যদিও ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ‘বিগ-বি’ ধারণাটি প্রথমে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।


এবারের যৌথ ঘোষণায় ভারতকে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা আবারও সামনে আসায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এটা কি শুধুই বাজার, নাকি এর পেছনে ভূ-রাজনীতি আছে। জাপানের বিগ-বি ধারণায় দেশটি গত কয়েক বছর ধরেই ভারতকেও সম্পৃক্ত করার কথা বলে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছিল যে, এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার জন্যই দেশটি ভারতকে এতে যুক্ত করতে চাইছে কি-না। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জাপানের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ঘিরে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে অনেকে মনে করেন।


তবে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, ভারতকে এতে সম্পৃক্ত করার জাপানি আগ্রহের মূলে আছে দেশটির বিশাল বাজার। “জাপান বৈশ্বিক রাজনীতিতে খুব একটা জড়িত হতে চায় না। তবে তারা তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাণিজ্যের সুরক্ষা চায়। আমার ধারণা ভারতের বাংলাদেশ ও ভারতের বিশাল বাজারকে লক্ষ্য করে ভারত প্রসঙ্গটি সামনে এনেছে তারা। এতে বাংলাদেশই লাভবান হবে। সিঙ্গাপুর বন্দর দেখুন যেভাবে বৈশ্বিক ব্যবহার হয় অনেকটা তেমন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।


অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম অবশ্য ভূ-রাজনৈতিক দিকটিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তিনি বলছেন, ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর কেন্দ্রিক পরিকল্পনার অংশ হলো এই ‘বিগ-বি’। জাপান বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলকে বড় দেশগুলোর প্রভাবমুক্ত রাখতে চাইছে। “এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় আছে। কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।


তার মতে, মাতারবাড়ীতে ইতোমধ্যেই একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হয়েছে, যার ধারণা ও বিনিয়োগ জাপানের। ফলে এ অঞ্চল ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব বা শিল্প ও জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ হলে সেটি সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে কয়লা ও গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বিষয়গুলোতে সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং দেখতে হবে কোন ধরনের শিল্প বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন।


দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’-এর লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়নকে সমন্বিত করা, শিল্পের মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিকশিত হওয়া এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি অর্জন করা। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।


যৌথ ঘোষণার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা এবং আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য নেওয়া। এর ফলে ২ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে জাপান আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে - একদিকে ভারতের বিশাল বাজারকে মাতারবাড়ীর সঙ্গে যুক্ত করে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করা। আর এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ যদি সিঙ্গাপুরের মতো একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও বাণিজ্য হাব হয়ে উঠতে পারে, তাহলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ঢাকাই।


সম্পর্কিত খবর

;