মানসম্মত শিক্ষার জন্য যথোপযুক্ত বাজেট

প্রকাশ : 28 May 2025
মানসম্মত শিক্ষার জন্য যথোপযুক্ত বাজেট

সিরাজ উদ-দৌলা খান:

শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়—এটি একটি জাতির বিবেক, উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের নির্ধারক শক্তি। একটি দক্ষ, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে চাই যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, যার মূলভিত্তি সুসংহত পরিকল্পনা ও যথাযথ বাজেট বরাদ্দ। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কেবল সংখ্যার হিসেব নয়; এটি জাতির চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও আত্মনির্ভরতার বিনিয়োগ। তাই একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাজেট পরিকল্পনায় ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।


 শিক্ষা শুধু যে মানব জাতির পরিবর্তন ঘটায় তা নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে বড়ো ধরনের ভূমিকা রাখে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে দেশ শিক্ষায় যত এগিয়ে সে দেশ তত উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছে। শিক্ষার মাধ্যমেই দেশ জাতি পরিবর্তিত ও একই সঙ্গে উন্নত হয়। এটাই সর্বজনস্বীকৃত। রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক, মেধা মননের বিকাশের ক্ষেত্রে যে কয়েকটি খাত রয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। এ খাতটি একটি রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকের মেধা, চিন্তা, শক্তি স্বাভাবিক জীবনবোধের জাগরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত। এখাতে রয়েছে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনার অভাব।

শিক্ষা কারিকুলামের উন্নয়ন না করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারিকুলাম প্রণয়ন করে শিক্ষার্থীদের বিচলিত করা হয়েছে। পাশের হার বাড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্নাতক শিক্ষিতদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব বিরাজ করছে, এর একটি বড়ো কারণ হচ্ছে যে, তারা যে ধরনের শিক্ষা অর্জন করেছে আর যে ধরনের যোগ্যতার জন্য চাকরি বাজারে চাহিদা আছে তার মধ্যে বড়ো ধরনের পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, শিক্ষায় দেশ এগিয়ে গেলেও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মকর্মসংস্থান ও বেকারত্বের অবসানের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এছাড়াও গ্রাম ও শহরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যে বৈষম্য তা সবচেয়ে জাজ্বল্যমান। সহজ ভাষায় বললে, ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় দূরবর্তী শহরে। শুধু শহর-গ্রামের বৈষম্য বললেও পুরো পার্থক্য সুস্পষ্ট হয় না। আসলে সব সুযোগ দুই-তিনটি বড়ো শহরে। সব অবকাঠামো গ্রামে পাওয়া সম্ভব নয়, বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু অন্তত জেলা শহর আর বিভাগীয় শহরগুলো উন্নত হলে তাতে একদিকে সব এলাকায় মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুষম বণ্টনের সুযোগ থাকত, আর উন্নত পরিষেবা সহজে পাওয়া যেত। শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানোর কিছু প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হওয়া দরকার। এ সবের জন্য তরুণরা হয়েছে বঞ্চিত। তরুণরা দেখছে জাজ্বল্যমান বৈষম্য। সেই বঞ্চনার বোধ রূপ নিয়েছে বিপ্লবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে কোনো শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করেন শিক্ষকরা। তাই বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল হয়ে পাঠদান করতে হবে। দেশ শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় নানা বৈষম্য রয়েছে। শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সিলেবাস পরিবর্তন, শিক্ষার কারিকুলাম ও পদ্ধতি নিয়ে যত চিন্তা-ভাবনা ও অর্থ ব্যয় হয় সে তুলনায় শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের মাথাব্যথা নেই। দেশের সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের নানা বৈষম্য বিদ্যমান।


 উন্নত রাষ্ট্রে শিক্ষকদের যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়। তাদের কোনো বিষয়ে আন্দোলন করতে হয় না। আমাদের দেশে শিক্ষকদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন হয়েছে। শিক্ষার মাধ্যমে যেহেতু একটি দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়, মানুষকে মানবীয় গুণাবলিতে গুণান্বিত করে মূল্যবোধ জাগ্রত করে তাই তাদের বিষয়ে আমাদের বিবেচনায় আনা দরকার । উন্নত রাষ্ট্রে শিক্ষকদের যেমনি সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা হয়, তেমনি তারা অত্যন্ত দক্ষ ও মেধাবী। আমাদের দেশেও অনেক দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন, যারা শিক্ষার্থীদের মেধা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। উন্নত, বিজ্ঞানমনস্ক ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে একটি উন্নত যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা যা বাস্তবায়ন করেন শিক্ষকরা। কিন্তু শিক্ষকরা যদি আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েন তাহলে শ্রেণিকক্ষে তারা কীভাবে শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। আর্থসামাজিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকদের উন্নয়নের বিকল্প নেই। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য দূরীকরণ ও শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে এ বৈষম্য দূর করা সম্ভব। এই খাতের উন্নয়নকল্পে যা যা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, তা থেকে রাষ্ট্র অনেক দূরে চলে গিয়েছিল।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। অনেক বছর ধরে দেশের মানুষ অনেক কথা বলতে পারেনি যা এখন বলতে চায়, অনেক ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেনি যা আদায় করতে চায়। বিগত সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি বিষয় অবহেলিত ছিল। যার মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন। প্রতিবছরই বাজেট প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। আগামী বাজেট সহসাই প্রণয়ন করা হবে। বিশ্বের চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির মুখে আমাদের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে বাজেট করা কঠিন কাজ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নতুন প্রজন্মকে তৈরি করতে হলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে তা ব্যবহার করে তরুণদের প্রস্তুত করার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি।

বিশ্বব্যাপী জাতীয় বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৬-৮ শতাংশ শুধু শিক্ষার জন্য বরাদ্দের কথা বলা হয়ে থাকলেও আমাদের দেশে বরাবরই শিক্ষাখাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের শিক্ষার উন্নতিকল্পে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ কম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কায় শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণের চেয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের বাজেট অত্যন্ত নগণ্য। বাংলাদেশে শিক্ষার চেয়ে কমগুরুত্বপূর্ণ খাতে  বরাদ্দ বাড়ানো হয় কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ে না বরং কমে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ার কারণে প্রতি অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণও বাড়ে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সেবা খাতে অর্থ বরাদ্দের যে পরিকল্পনা সেটাই সাধারণত বাজেট হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। একটি দেশের জনসংখ্যা ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর বাজেট অনেকাংশে নির্ভর করে। কারণ, কাম্য জনসংখ্যা হলে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ কম হবে এটাই স্বাভাবিক। বাজেটে বেকার সমস্যার সমাধানের দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। প্রতিবছর বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে যে-সব আলোচনা হয়, তার বিষয়বস্তুতে অনেকটাই মিল থাকে। সেটা জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা খাতভিত্তিক বরাদ্দ যাই হোক। এবারো সেগুলো আলোচিত হচ্ছে। কারণ এখন দেশের পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। কাজেই এবারের বাজেটে তরুণদের প্রতি মনোযোগের মাধ্যমে পরিবর্তন প্রত্যাশিত। সেটা সম্ভব হবে কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে।

শিক্ষাখাতে বাজেটের  মোট বরাদ্দ গত কয়েক বছরে যা ছিল তার চেয়ে বৃদ্ধি করা উচিত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, প্রাক-বাজেটে আলোচনায় প্রতিবছরই জোরেশোরে এবিষয়ে বলা হয়। কিন্তু পরিবর্তন হয় না । তবে এ বছরে প্রেক্ষিত যখন ভিন্ন, তখন এ পরিবর্তনের আশা করাই যায়। এ বছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে যখন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসবে, তখন তারা এটা কমাতে দ্বিধান্বিত হবে। কাজেই এখনই সময় নতুন কিছু করার। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। সেখানে এ বাজেট ব্যবহার করে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এবারের বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

গত দেড়-দুই দশকে দেশে বৈষম্য বেড়েছে অব্যাহতভাবে। সেই বৈষম্য শুধু আয়বৈষম্য নয়, সেই সঙ্গে সুযোগের বৈষম্যও। সর্বোপরি ব্যক্তি হিসেবে যা প্রত্যাশিত সম্মান ও স্বীকৃতি, উন্নয়নে অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মানুষের জীবন অর্থপূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তরুণদের স্বপ্ন হরণ করা হয়েছে। তাদের নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে বিপরীতমুখী করার মতো উপকরণ এ বাজেটে প্রত্যাশিত। সেটা শুধু কথা আর আশ্বাস নয়, হতে হবে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য। আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। তবে অন্তত দুই বা তিন বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনা, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষার্থীর সুস্বাস্থ্য রক্ষায় খেলার মাঠ, স্যানিটেশন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া দরকার, যা অনুপস্থিত রয়েছে বিগত বাজেট পরিকল্পনায়। সুতরাং সেদিক বিবেচনায় এবারের পরিকল্পনায় শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ খুবই জরুরি।

শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ যার ফল আসে ধীরে তাই এ খাতে সময়োপযোগী ও সুবিন্যস্ত বাজেট বরাদ্দ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু পরিমাণ নয়, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, জবাবদিহি এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও প্রণোদনা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। শিক্ষাই পারে বৈষম্যহীন, মানবিক ও কর্মক্ষম একটি জাতি গড়ে তুলতে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর শিক্ষা বাজেটই হতে পারে পরিবর্তনের সোপান।

#

-লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।


পিআইডি ফিচার


সম্পর্কিত খবর

;