একটি পিঁড়ি ও একটি কাঁচির সাথে ৬৬ বছরের পথচলা।

প্রকাশ : 11 Mar 2026
একটি পিঁড়ি ও একটি কাঁচির সাথে ৬৬ বছরের পথচলা।

অনিক রায়: ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। চারপাশে আধুনিকতার ছোঁয়া—নতুন দোকান, সেলুন, সাজসজ্জার ঝলক। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেই নিরবে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও কর্মে ক্লান্তি নেই। তিনি ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল—যিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের চুল-দাড়ি কেটে জীবনের গল্প লিখে চলেছেন।


সময়ের স্রোতে বদলে গেছে মাঝারদিয়া বাজারের চেহারা। আধুনিক সেলুনে এসেছে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি, উন্নত পরিবেশ আর আরামদায়ক ব্যবস্থা। কিন্তু অকিল শীলের কর্মক্ষেত্র রয়ে গেছে আগের মতোই—পুকুরপাড়ের সেই ছোট জায়গা আর কাঠের পিঁড়ি। এখানেই বসে তিনি মানুষের চুল-দাড়ি কেটে দেন, আর সেই সঙ্গে বয়ে চলা সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকেন।


অকিল শীলের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তার বাবা হরিবদন শীলও একই পেশার মানুষ ছিলেন। কৈশোরেই বাবার পথ অনুসরণ করে জীবিকার তাগিদে নাপিতের পেশায় যুক্ত হন তিনি। তখন গ্রামাঞ্চলে আধুনিক সেলুনের প্রচলন ছিল না। পুকুরপাড়ে বা খোলা জায়গায় বসেই চুল-দাড়ি কেটে দিন গুজরান করতেন। সেই শুরু—যা আজও থামেনি।


মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটের দিন সকাল হলেই অকিল শীল এসে পুকুরপাড়ে একটি কাঠের পিঁড়ি পেতে বসেন। পাশে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর। বয়সের ভার সত্ত্বেও কাজের প্রতি তার একাগ্রতা এখনো অটুট। ধীর হাতে, মনোযোগ দিয়ে তিনি গ্রাহকদের চুল-দাড়ি কাটেন।


সরেজমিন দেখা যায়, পুকুরপাড়ের ছোট সেই জায়গাটিতে বসে তিনি কাজ করছেন মনোযোগ সহকারে। সামনে কয়েকজন গ্রাহক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ কেউ সিরিয়াল ধরে বসে আছেন। অনেকের কাছেই এটি শুধু চুল কাটার জায়গা নয়—এ যেন শৈশবের স্মৃতি আর গ্রামীণ জীবনের এক পুরোনো ঠিকানা।


স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন,“আমি আধুনিক সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটাই। তার হাতে চুল কাটালে এক ধরনের আলাদা স্বস্তি লাগে।”


আরেক স্থানীয় সাইদুল ইসলাম বলেন,“এখানে ধনী-গরিব ভেদাভেদ নেই। সবাই একই জায়গায় বসে চুল কাটায়। অকিল কাকার কাছে চুল কাটাতে যেন এক ধরনের আন্তরিকতা পাওয়া যায়, যা সেলুনে পাওয়া যায় না।”


অকিল শীল জানান, বর্তমানে প্রতি জনের চুল কাটার জন্য তিনি ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক তার কাছে আসেন। সেই সামান্য আয়ে এখনো সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।


নিজের দীর্ঘ জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,

“ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, তবু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না।”


অকিল শীলের পাঁচ ছেলেমেয়ে থাকলেও তাদের কেউই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নন। তবু তিনি নিজের পুরোনো অভ্যাস আর দায়িত্ববোধ থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।


স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের ইতিহাস আর স্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে অকিল শীলের এই পুকুরপাড়ের সেলুন। আধুনিকতার ভিড়ে তার সরল কর্মজীবন যেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।


হাটের দিনগুলোতে এখনো পুকুরপাড়ে বসে হাতে কাঁচি আর ক্ষুর নিয়ে অপেক্ষা করেন তিনি। কাঁচির টুংটাং শব্দে যেন ধরা পড়ে সময়ের দীর্ঘ যাত্রা—একটি পিঁড়ি, একটি কাঁচি, আর ৬৬ বছরের অমলিন গল্প ।


সম্পর্কিত খবর

;