রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ স্মরণ

প্রকাশ : 20 Jun 2024
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ স্মরণ

চলে গেলে আমারো অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না থাকা জুড়ে


মোঃ নূর আলম শেখ ।।



"চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়---বিচ্ছেদ নয়/ চলে যাওয়া মানেই নয় বন্ধন ছিন্ন করা আর্দ্র রজনী/ চলে গেলে আমারো অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না থাকা জুড়ে।" কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ "পশ্চাতে হলুদ বাড়ি পঞ্চাশ লালবাগ" কবিতায় এসব কথা লিখেছেন। ১৯৯১ সালের ২১ জুন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সত্যিই আমরা বুঝেছি রুদ্র্র'র চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ নয়। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ চলে গেলেও অধিক কিছু রেখে গেছেন তাঁর না থাকা জুড়ে। তাইতো ২০২৪ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক দিলেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে। যদিও এসব পদক ও পুরস্কারে কখনোই বিশ্বাসী ছিলেন না কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। প্রচন্ড বৈরী সময়েও সাহসী এবং সত্য উচ্চারণ ছিলো রুদ্র'র স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ভুল মানুষ ও বিশ্বাসের কাছে কখনোই নতজানু ছিলেন না। এদেশের সকল গণআন্দোলন-গণসংগ্রামে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ প্রচন্ড রকমের শক্তি এবং সাহস নিয়ে আজো গণমানুষের জন্য প্রেরণা হিসেবে উপস্থিত থাকেন।

অকালপ্রযাত এই কবি নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে। সাম্যবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্যচেতনা ও অসাম্প্রদায়িকবোধে উজ্জ্বল তাঁর কবিতা। পচাত্তর পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিদের আস্ফালনের সময়েও রুদ্র "বাতাসে লাশের গন্ধ" কবিতায় লিখেছেন ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ এই নির্মম সত্য অবলোকনের পাশাপাশি উচ্চারণ করেছেন অবিনাশী স্বপ্ন ‘দিন আসবেই-- দিন সমতার’। যাবতীয় অসাম্য, শোষণ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান তাঁকে পরিণত করেছে ‘তারুণ্যের দীপ্র প্রতীক’-এ। একই সঙ্গে তাঁর কাব্যের আরেক প্রান্তর জুড়ে রয়েছে স্বপ্ন, প্রেম ও সুন্দরের মগ্নতা। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী সুমন চট্টপাধ্যায় বলেন "নানা কৃত্রিমতা ও ভন্ডামিতে ভরা আমাদের নাগরিক সমাজের লোক নন।--- তার লেখা পড়ে মনে হয়েছিলো কোন নিয়মে বা রীতি-নীতিতে তিনি বাঁধা থাকার পাত্র নন। তিনি শুধু লেখায় নয়, যাপনে বিশ্বাসী।" রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে "প্রকৃত আধুনিক বাংলা গানের স্রষ্টা" উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন "ভালো আছি, ভালো থেকে/ আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো এই দুটি লাইনের জন্য আমি রুদ্র ঈর্ষা করি। একটি বাংলা গান যে এতো লোকের এভাবে, এতটা ভালো লাগতে পারে তা কখনো দেখিনি।" কবি শামসুর রাহমান রুদ্র সম্পর্কে তাঁর এক লেখায় বলেন "কখনো কখনো একটি কি দুটি পঙতি একজন কবিকে স্মরণীয় করে রাখে। সন্দেহ নেই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সেই স্মরণীয়তা অর্জন করেছেন।" রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সাহিত্য চিন্তা বিষয়ক একটি লেখায় বলছেন "নিজের আত্মার সাথে, নিজের অনুভবের সাথে যারা প্রতারনা করে তারা কেউ কবি নয়- তার কেউ শিল্পী নয়। শিল্পকে যারা ফ্যাশন মনে করে কিংবা তাকে রাজনৈতিক বা অন্য যে কোন সুবিধে আদায়ের জন্যে ব্যবহার করে তাদের আমি লম্পট বলতে ভালোবাসি। আমাদের সাহিত্যাঙ্গন এখন এই দুই ধরনের লম্পটের উপদ্রব বিরাজ করছে।" অন্যদিকে রুদ্র তাঁর "শব্দ শ্রমিক" কবিতায় বলেছেন "আমি কবি নই- শব্দ শ্রমিক/ শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়/ হৃদয়ের কালো বেদনায়।" রুদ্র ছিলেন আর্টিস্ট কাম এক্টিভিস্ট। তিনি মনে করতেন "সাহিত্যের জ্বালানি হচ্ছে রাজনীতি। আমরা যারা লিখছি, ঠিক একই ভাবে পাশাপাশি কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ড আমাদের নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফাঁকাবুলির রাজনীতি, আপোসের রাজনীতি চলছে। রাজনীতি এবং সাহিত্য সমান্তরাল চলতে শুরু না করলে বড় ধরনের কোন সাহিত্যের নিদর্শন আশা করা যায় না।"

ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে কবিতা এবং কবির ভূমিকা সম্পর্কে এক সাক্ষাতকারে রুদ্র বলেছিলেন "কবিকে সময়ের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, ইতিহাসের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। ব্যক্তি বা জাতির জীবনে সত্যের উচ্চারণ করে কবি। জীবন থেকে উৎসারিত এই উচ্চারণ মানুষের হৃদয়ের ভাষা, চৈতন্যের ভাষা। যার হৃদয়ের ভাষা নেই, চেতনার ভাষা নেই সে তো পশু। মানুষতো এইটুকুর জন্যেই পশু থেকে উন্নতর জীব। কবি হৃদয়কে ভাষা দেয়, চেতনাকে শিক্ষিত করে।"রুদ্র ইশতেহার কবিতায় তার নিজের সম্পর্কে এভাবেই বলেছেন এই পৃথিবীর কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে যে-শিশুর জন্ম/দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে ছুটে বেড়ানোর অদম্য স্বপ্ন যে-কিশোরের/ জোস্না যাকে প্লাবিত করে/ বনভূমি যাকে দুর্বিনীত করে/ নদীর জোয়ার যাকে ডাকে নেশার ডাকের মতো/ অথচ যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ঔপনিবেশিক জোয়াল/গোলাম বানানো শিক্ষাযন্ত্র।---অথচ যাকে শৃংখলিত করা হয়েছে স্বপ্নহীন সংস্কারে।" কবি চেয়েছিলেন শস্য আর স্বাস্থ্যের, সুন্দর আর গৌরবের কবিতা লিখেতে। চেয়েছিলেন বসন্ত আর বৃষ্টির বন্দনা কোরে গান গাইবে। তাঁর আকাংখা ছিলো "আমরা উৎসব করবো শস্যের/আমরা উৎসব করবো পূর্ণিমার/আমরা উৎসব করবো/ আমাদের গৌরবময় মৃত্যু আর বেগবান জীবনের/কিন্তু-এই স্বপ্নের জীবনের যাবার পথে আটকে আছে সামান্য কিছু মানুষ/--- তারা সবচে' কম শ্রম দেয়/আর সবচে' বেশি সম্পদ ভোগ করে/ তারা সবচে' ভালো খাদ্যগুলো খায়/ আর সবচে' দামি পোশাকগুলো পরে। কবি বলেছেন "এইসব অতিকায় কদাকার বন্যমানুষগুলো নির্মূল করে/ আমরা আবার সমতার পৃথিবী বানাবো/সম্পদ আর আনন্দের পৃথিবী বানাবো/শ্রম আর প্রশান্তির পৃথিবী বানাবো।"

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মাত্র ৩৫ বছরের (১৯৫৬-১৯৯১) স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্যনাট্য এবং ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ সহ অর্ধ শতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন। পরবর্তীকালে এ গানটির জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরণোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন।‘উপদ্রæত উপকূল’ ও ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম’ কাব্যগ্রন্থ দুটির  জন্য ‘সংস্কৃতি সংসদ’ থেকে পরপর দু’বছর ‘মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরষ্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ভাষা ও সাহিত্যে ( মরণোত্তর ) দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেন। এছাড়া মোংলার মিঠেখালিতে তিনি গানের দল "অন্তর বাজাও" এবং "অগ্রদূত ক্লাব" প্রতিষ্ঠা করেন। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৫৬ সালে বরিশাল রেডক্রস হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। ওই সময়ে রুদ্রর মাতা শিরিয়া বেগম বরিশালে আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাঁর শৈশব ও যৌবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে মোংলার মিঠেখালি গ্রামে। মোংলার মিঠেখালি গ্রামের পাঠশালা, সাহেবেরমেঠ গ্রামে ইসমাঈল মেমোরিয়াল স্কুল ও সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই এসএসসি পাশ করেন। ঢাকা কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশের পর ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতক ( সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনোনীত প্যানেলে সাহিত্য সম্পাদক পদপ্রার্থী হন। নির্বাচনে বন্ধু আলী রিয়াজের কাছে মাত্র ৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ১৯৯১ সালের ২১ জুন ঢাকার পশ্চিম রাজা বাজারের নিজ বাসায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে হয়ে এই প্রতিভাবান তরুন কবি অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর আজ ৩৩তম মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর গানের ভাষায় বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরাণ ভালোবাসা জানিয়ে বলতে চাই "আমার ভিতরও বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।" সবশেষে বলবো রুদ্রদা "ভালো আছি, ভালো থেকে আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।

-লেখকঃ আহ্বায়ক- সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মোংলা ্ও সাবেক সভাপকি রুদ্র স্মৃতি সংসদ মিঠেখালি, মোংলা।

     

সম্পর্কিত খবর

;