দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বোরো মৌসুমের গুরুত্ব

প্রকাশ : 06 Jun 2025
দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বোরো মৌসুমের গুরুত্ব

ইমদাদ ইসলাম:


বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত বাংলাদেশের ও ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রধান খাদ্য। ভারতীয় উপমহাদেশ  ছাড়াও চিন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে ভাত খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে স্থান ভেদে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন রকম ভাত খাওয়ার প্রচলন আছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ ঝরঝরে ভাত খাওয়া হয়। কিন্তু চিন, জাপান ও কোরিয়ায় আঠালো ভাতের খাবারের প্রচলন রয়েছে। এ সব দেশে সাধারণত বেশিরভাগ অন্যান্য  খাবারের সাথে আঠালো ভাত খাওয়া হয়। বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক চালের চাহিদা বিবেচনায় বছরে চালের প্রয়োজন হয় কম-বেশি তিন কোটি এগারো লাখ টন। চালের হিউম্যান কনজাম্পশন ছাড়াও নন-হিউমান কনজাম্পশনে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাল ব্যয় হয়। নন-হিউমান কনজাম্পশন হিসেবে  বিভিন্ন পোলট্রি ফিড, বীজসহ অন্যান্য প্রয়োজনেও চাল ব্যবহার হয়। বিভিন্ন পোলট্রি ফিড, বীজ ও অন্যান্য অপচয় হিসেবে আরও ১৫ শতাংশ যোগ করে মোট চাহিদা দাঁড়ায় কম-বেশি ৩ কোটি ৫৭ লাখ মেট্রিক টন।



বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী ও চালের ভোক্তাদেশ। চাল উৎপাদনে শীর্ষ দুই অবস্থানে আছে যথাক্রমে চীন ও ভারত। দেশে উৎপাদনের সময়ের উপর নির্ভর করে আউশ,আমন ও বোরো  ধানের প্রধান তিনটি আবাদ করা হয়। বোরোর মৌসুম শুরু হয় আমনের মৌসুম শেষ হওয়ার পরে। বোরো ধান এখন দেশের প্রধান ধানের মৌসুম। বোরো মৌসুমে মোট জাতীয় উৎপাদনের ৬০ শতাংশ ধান উৎপাদিত হয়। যদিও ব্যাপকভিত্তিতে বোরো ধানের আবাদ বেশি দিনের নয়। সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগের জামানায় ধানের প্রধান মৌসুম ছিল আমন ও আউশ। উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে আউশ ধানের আবাদ কমতে থাকে এবং অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে সেচনির্ভর বোরো ধানের। একথা অনস্বীকার্য বোরোর ওপর ভিত্তি করেই দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি রচিত হয়েছে। এ বছর প্রায় ৫০ দশমিক ৪৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন। গত বছর বোরো উৎপাদন হয়েছিলো ২কোটি ১০ লাখ টন। বোরো ধান সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় হাওড় অঞ্চলে। এবার বোরোর ফলন খুব ভালো হয়েছে । আবহাওয়া সামগ্রিকভাবে অনুকূলে থাকায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল কোনো প্রকার বাধা বিপত্তি ছাড়াই ঘরে তুলতে পারছে। দেশের মোট ধানের চাহিদার দশ শতাংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। হাওড় অঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল হয়,আর তা হলো বোরো ধান।


 


বাংলাদেশে আউশ, আমন এবং বোরো এই তিন মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। আউশ অনেকাংশে কম হয়, সারা দেশে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে ৪০ লাখ টনের মতো আউশ ধান উৎপাদন হয়। এ বছর বোরো ফলনের লক্ষ্যমাত্রা হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৪৬ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি এক থেকে দুই টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ৩০টি বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভক্ত। ধান এমন একটা ফসল যা দেশের প্রায় সকল পরিবেশ অঞ্চলে চাষাবাদ করা গেলেও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে এর অভিযোজনশীলতায় কিছুটা তারতম্য রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকরা অনেক সময় এলাকাভিত্তিক সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। অর্থাৎ কোনো জমিতে কোন জাতের ধান ভালো হবে , তা না জানার কারণে সেখানে কৃষকরা সঠিক জাত নির্বাচন করতে ব্যর্থ  হন। ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ফসল থেকে বঞ্চিত হন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১১৫টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে আগের চেয়ে ফলন ও উৎপাদন অনেক বেড়েছে।


প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ফসলের বৈচিত্র্যও বেড়ে চলেছে। বোরো মৌসুমে মাঠভরা বোরো ধান দেখা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন, সেচের পানির সংকট ও আন্তফসল প্রতিযোগিতার ফলে আস্তে আস্তে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বোরো চাষ। তবে হাওড় অঞ্চলে সেচের সমস্যা নেই বললেই চলে। বোরো ধানের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন খরচও বেশি। প্রতি হেক্টর জমিতে সেচ বাবদ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। হেক্টর প্রতি নিট মুনাফা অন্যান্য ফসলের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশে ছয়টি জলবায়ু হটস্পটে বোরো ধানের আবাদ বিঘ্নিত হচ্ছে। হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের আবাদ বিঘ্নিত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল বোরো চাষের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। লবণাক্ততার অব্যাহত বৃদ্ধি ও স্বাদুপানির সংকটে এখানে বোরোর আবাদ সংকটের মুখে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকটে বোরো চাষ বিঘ্নিত হয়। খরাপ্রবণ উত্তরাঞ্চল বোরোর বিকল্প হিসেবে পানিসাশ্রয়ী বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছে কৃষক।


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)  ইতিমধ্যে রাইস ভিশন ২০৫০ প্রণয়ন করেছে; যাতে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে চালের উৎপাদন প্রক্ষেপণ করা হয়েছে এবং তা অর্জনে ব্রি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ব্রি-এর পলিসি গবেষণার প্রজেকশন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে ৪ কোটি ৬৯ লাখ টন, ২০৪১ সালে ৫ কোটি ৪১ লাখ টন এবং ২০৫০ সালে ৬ কোটি ৯ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে। ব্রি-এর হিসেব অনুযায়ী , ২০৩০ সালে ৪২ লাখ টন, ২০৪০ সালে ৫৩ লাখ টন এবং ২০৫০ সালে ৬৫ লাখ টন চালে উদ্বৃত্ত থাকবে।


সরকার দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে  সাড়ে ১৭ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ করবে । এরমধ্যে সাড়ে তিন লাখ টন ধান ও ১৪ লাখ টন সেদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকে প্রাইস সাপোর্ট দেওয়ার জন্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ৪ টাকা বৃদ্ধি করে ধান ৩৬ টাকা এবং চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে কেনা হচ্ছে। ২৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে বোরো মৌসুমের ধান-চাল কেনা শুরু হয়েছে এবং এ সংগ্রহ অভিযান  ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে । বর্তমানে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি সন্তোষজনক। খাদ্য মজুদ আছে কম-বেশি ১৫ লাখ মেট্রিক টন। যা গত বছরের চেয়ে ৩ লাখ মেট্রিক টনের মতো বেশি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫শত কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছরে এখাতে বরাদ্দ ছিলো  ৮ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। সরকার ওএমএস  এবং টিসিবি মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। আগামী অর্থবছরে এসব কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হবে। বর্তমানে এ কার্যক্রম বছরে পাঁচ মাস চালু আছে,আগামী অর্থবছর থেকে পাঁচ মাসের স্থলে ছয় মাস চালু থাকবে।


বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ । দেশে সবচেয়ে বেশি বোরো উৎপাদন হয় ময়মনসিংহ জেলায়,আমন দিনাজপুরে এবং আউশ ধান কুমিল্লায়। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার কমলেও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ২০ কোটি ৪০ লাখ। ২০৫৭ সালে জনসংখ্যা হবে ২০ কোটি ৭০ লাখ। বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তা আরও ৩৪ বছর অব্যাহত থাকবে। দেশের ফলে কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। প্রতিনিয়তই কৃষি জমি কমছে। অধিক হারে ধান উৎপাদনের ফলে এক ধরনের সমন্বয় সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন এটা সম্ভব হবে না। তাই পরিকল্পিতভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের সচেষ্ট হতে হবে।


#

-লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়।


পিআইডি ফিচার  


সম্পর্কিত খবর

;