সাইফুল আলম ছদরুল:
ভাটির জনপদের হাওরাঞ্চলের প্রায় সব কটি উপজেলা বছরের ৭/৮ মাসই জলমগ্ন থাকে। ভাটির জনপদের খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণের কাজের অন্যতম ভরসাস্থল এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উচ্চভূমির বালি ও পাথর মহাল (যাদুকাটা নদী, ধোপাজান-চলতি নদী, ভোলাগঞ্জ, জাফলং, সারি নদী, পিয়াইন নদী, চেলা নদী ইত্যাদি)। আবহমানকাল থেকে হাওরাঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক কৃষক-শ্রমজীবী দরিদ্র পরিবারের বারকি শ্রমিকগণ বেলচা, বালতি ও নেটের সাহায্যে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বালু-পাথর আহরণের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বালি, নুড়ি, পাথর ও কয়লা। আবহমানকাল থেকে এখনও পর্যন্ত জায়মান আছে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ‘মেঘালয়ে খনি, বাংলাদেশে সঞ্চয়ন’ বলে অভিহিত করেছেন। বলা হয়েছে :
“মেঘালয়ে মূল চুনাপাথরের স্তর থাকে পাহাড়ের ভেতরে। সেখানকার কোম্পানিগুলো (যেমন খধভধৎমব, কড়সড়ৎৎধয) সরাসরি খনি খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করে।
“মেঘালয়ের পাহাড় থেকে পাথর স্বাভাবিকভাবে নদীপথে নেমে এসে বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তে জমা হয়। বাংলাদেশে পাথর তুলতে আলাদা খনি খননের দরকার পড়ে না, যেন প্রকৃতি নিজে ডেলিভারি দিয়ে দেয়।” (এমজানিউজ.কম, ২৯ আগস্ট ২০২৫)।
এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মেঘালয়ের পাহাড়সংলগ্ন বাংলাদেশের অভ্যন্তর অঞ্চলে পাথর ও বালির মহালগুলো তৈরি হয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকার শ্রমিকরা পরিবেশবান্ধব উপায়ে বেলচা, বালতি ও নেট (তারের জাল) দিয়ে যুগ যুগ ধরে এই বালি-পাথর আহরণ (উত্তোলন নয়) করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই আহরণ পদ্ধতি সাধারণত নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বারকি শ্রমিকদের সংগৃহীত বালি-পাথর লোড-আনলোড শ্রমিকরা ট্রাকে বা নৌযানে তোলে দেন এবং নৌযান বা ট্রাক পরিবহণের শ্রমিকরা সেই বালি-পাথর সুনামগঞ্জ, সিলেট, ঢাকাসহ দেশের নানা অঞ্চলে পৌঁছে দেন। কর্মমূখর এই সব শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে লোকসমাগকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে নৌ-ঘাটসমূহের পাশে গড়ে উঠে জমজমাট হাট-বাজার। একদা শুধু নৌ-ঘাটসমূহই নয়, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন শহরের ব্যবসাবাণিজ্যেও এই সব শ্রমিক ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। বালি-পাথর আহরণের এই কাজের সঙ্গে বারকি শ্রমিক, লোডআনলোড শ্রমিক, নৌযান ও ট্রাক পরিবহণসহ বিভিন্ন সেক্টরে কয়েক লাখ শ্রমিকের জীবিকার যেমন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে তেমনি আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে এই বালি-পাথর আহরণের কাজের সঙ্গে। অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিনিয়মেই এখানে সৃষ্টি হয়েছ প্রকৃতিনির্ভর একটি কর্মসংস্থানের এবং প্রকারান্তরে বালি-পাথর উত্তোলনের কাজে অপরিহার্য বারকিশ্রমিকদের আবির্ভাবকে সম্ভব করে তোলেছে। একদা এই বালি পাথর আহরণের সমগ্র প্রক্রিয়াটি ছিল বারকিনৌকা, বেলচা ও বালতি নির্ভর। তখন বালি-পাথর মহালে পুঁজির বিনিয়োাগ ও পুঁজির পক্ষে মুনাফা অর্জন ঠিকই ছিল, কিন্তু তখনও পুঁজিপতির অধিক বলতে বেপরোয়া মুনাফালাভের লোভ বারকিশ্রমিকদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে উঠে নি, এখনকার মতো। অর্থাৎ পুঁজি তখনও বালি-পাথর মহাল থেকে শ্রমিক ছাঁটাই-নির্মূলের শক্তিচরিত্র অর্জন করে নি। কিন্তু অর্থনীতির নিয়মানুসারে ক্রমে পুঁজির চরিত্র বদলে গিয়ে যথারীতি বালি-পাথর মহালগুলোতে পুঁজির অন্তর্গত নিয়মে পুঁজির আধিপত্য বৃদ্ধির সঙ্গে মুনাফা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়ে, বা যাকে বলে, প্রবলাকার ধারণ করে ক্রমে বালি-পাথর উত্তোলনের কর্মপরিসর থেকে বারকিশ্রমিক উৎখাতের শক্তিচরিত্র অর্জন করে এবং যথারীতি বারকিশ্রমিক উৎখাতের প্রবণতার ক্রমবিস্তার ঘটে। ফলে যথারীতি কার্যক্ষেত্রে বালি-পাথর উত্তোলন-পরিবহণের কাজে যথাক্রমে ড্রেজার, বোমা মেশিন ইত্যাদি শক্তিশালী খননযন্ত্র ও স্টিলবডি নৌকার মতো বপুত্ববহরে বড় নৌকার ব্যবহার শুরু হয়। অর্থাৎ সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার পরিসরে পুঁজির আধিপত্য বিস্তারের অনিবার্য প্রক্রিয়ার প্রভাবে পুঁজিপতির মালিকানাধীন হাতিয়ার (স্টিলবডির বড় নৌকা ও ড্রেজার-বোমা মেশিন) বারকিশ্রমিকের মালিকানাধীন হাতিয়ারকে (বারকিনৌকা, বেলচা ও বালতি) হটিয়ে দিতে শুরু করে এবং এই নির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের পরিসরে ক্রমে আগ্রাসী পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কাঠামোগত সহিংসতাকে বেপরোয়া করে তোলে দৃশ্যমান সন্ত্রাসে পর্যবসিত করে।
সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘ (রেজিঃ নং চট্টঃ ২৩৫৫) প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে সনাতন পদ্ধতিতে বালি-পাথর উত্তোলনের দাবি জানিয়ে আসছে। শুরুতে বারকিশ্রমিকরা বালি-পাথর উত্তোলনে রয়ালিটির নামে চাঁদাবাজি বন্ধসহ নদীতে স্টিলবডির বড় নৌকা প্রবেশ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে এবং এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ধোপাজান নদীতে চাঁদাবাজি বন্ধ, বোমা-ড্রেজারের ব্যবহার বন্ধের দাবিতে ২০১০ সালে ১৭ দিন এবং ২০১২ সালে ২২ দিন কর্মবিরতি পালন করে। কিন্তু পরাক্রমশালী ইজারাদার ও অসাধু ব্যবসায়ী, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও এনজিওদের সংঘবব্ধ শক্তিচক্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে শ্রমিকরা নানা রকম অকার্যকর প্রতিশ্রুতি ব্যতীত কোন কিছুই পায় নি। বালি-পাথর লুটপাটকারিদের পরিচালিত বিভিন্ন রকম অন্যায় উৎপাৎ ও অব্যাহত লুণ্ঠনতাণ্ডবের কারণে সরকারি আদেশে ২০১৮ সন হতে ধোপাজান নদীতে বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ আছে। ফলে অসহায় বারকিশ্রমিকদের বেকার জীবনে ‘কাজের সন্ধানে উদ্বাস্তু হওয়া’ একমাত্র উপায় হয়ে উপস্থিত হয়েছে। বর্তমানে, বলতে গেলে, অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছে বারকিশ্রমিকরা। রোজগারের একমাত্র উপায় বালি-পাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ থাকায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে নদীতীরবর্তী শ্রমিকদের মাঝে। এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে সরকারের বিআইডব্লিউটিএ। ধোপাজান বালি মিশ্রিত পাথর কোয়ারি সরকারের বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত নদী। এই নদী ইজারা দেওয়ার এখতিয়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ভিন্ন অন্য কোনও মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নেই। কিন্তু এক্তিয়ারবহির্ভূতভাবে “লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং” নামক প্রতিষ্ঠানকে ড্রেজার দিয়ে ভিটবালি উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। অনুমতিপত্র হাতে পেয়ে লিমপিডের লোকজন ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর পাড় কেটে ভিটবালির পরিবর্তে সিলিকা বালি উত্তোলন শুরু করলে বিক্ষুব্ধ হয় বারকি শ্রমিকরা। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় সভা সমাবেশ করছেন ছাত্র-শিক্ষকসহ, সামাজিক সংগঠনের সচেতন নাগরিকগণ। বালি/মাটি ব্যবস্থাপনা আইন (সংশোধিত ২০২৩) মোতাবেক রাতের বেলা বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও লিমপিডের লোকজন রাতের বেলাই বেশি খনিজ বালি (সিলিকা বালি) উত্তোলন করছে মর্মে সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচার হচ্ছে ।
বালি উত্তোলনে লিমপিডের এইরূপ বেপরোয়া আচরণ স্থানীয় প্রশাসনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিগত ২৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ কর্তৃক উর্ধতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে প্রেরিত একটি পত্র হতে সুনিশ্চিতভাবে এই প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানা যায়। জেলা প্রশাসনের বিবেচনায় ‘লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রতিষ্ঠানকে দেয় অনুমতিপত্রটি বিধিসম্মত নয়। উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট প্রেরিত পত্রে জেলা প্রশাসক লিখেছেন, “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধন ২০২৩)-এর ৭ ধারা অনুযায়ী সরকারি কার্যক্রম বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চাহিত বালু/মাটি ব্যবহারের জন্য জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন এবং ভূমিমন্ত্রণালয়ের সম্মতি প্রয়োজন।” কিন্তু সে অনুমোদন ও সম্মতি নেয়া হয় নি। এই কারণে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত ‘ধোপাজান নদীর বালিমহাল থেকে ভিটবালি উত্তোলনের অনুমতি’টি বৈধ নয়। পাঠকদের সার্বিক অবগতি ও বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্যে জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রেরিত পত্রের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে ধরছি। তিনি বলেছেন :
“[...] “.বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০-এর ৩ ধারায় উল্লেখ আছে “ঢ়ড়ৎঃং ধপঃ, ১৯০৮ (ধপঃ ঢঠ ড়ভ ১৯০৮), ওহষধহফ ধিঃবৎ ঃৎধহংঢ়ড়ৎঃ ধঁঃযড়ৎরঃু ঙৎফরহধহপব, ১৯৫৮ (ঊ.চ. ০ৎফ. ঘড়. খঢঢঠ ড়ভ ১৯৫৮) খনি ও খনিজ সম্পদ (নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন) আইন, ১৯৯২ (১৯৯২ সনের ৩৯ নং আইন) অথবা অন্য কোন আইন বা প্রণীত বিধি বা অন্য কোন আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনায় বালু ব্যবস্থাপনা এবং এতসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে যাহা কিছুই থাকুক না কেন আইনের এই বিধানাবলী প্রধান্য পাইবে"।
“খ) উল্লিখিত আইনের ৬(১) ও (২) ধারায় উল্লেখ আছে, “দেশের যে কোন চর এলাকা অথবা যে কোন স্থলভাগ হইতে বালু বা মাটি সরকার কর্তৃক ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে এবং সরকারি যে কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দিষ্ট নদী, নদী বন্দর, সমুদ্র বন্দর, খাল-বিল প্রভৃতি স্থান হইতে উত্তোলিত বালু বা মাটির বিপননের প্রয়োজন দেখা দিলে উক্ত বিপননের জন্য একক কর্তৃপক্ষ হইবে ভূমি মন্ত্রণালয়। উপ-ধারা (১) এর অধীন কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের সহিত সমন্বয় করিবে।”
আইনের এই ধারা মতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ‘লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং’কে দেয় অনুমোদন বিধিসম্মত নয় অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। আইন মতে ‘দেশের যে কোন চর এলাকা অথবা যে কোন স্থলভাগ হইতে বালু বা মাটি সরকার কর্তৃক ইজারা প্রদানের ... একক কর্তৃপক্ষ ... ভূমি মন্ত্রণালয়’ এবং সংশ্লিষ্ট মহালটি বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত। এই কারণে এই মহাল থেকে বালি (সে যে প্রকারেরই হোক না কেন) উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার কোনও আইনি বিআইডবিøউটিএ কর্তৃপক্ষের নেই।
জেলা প্রশাসক তাঁর পত্রে আরও উল্লেখ করেছেন :
“গ) জেলা বালুমহাল ব্যবস্থা কমিটির মতামত ছাড়াই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআইডাবিøউটিএ ভবন, ঢাকা এর বিগত ০৯/০৭/২০২৫ তারিখের নং ১৮.১১০০০০.০০০.০৯৯.৪১.০০১.২২.২৬৩/১(৩) নং স্মারকমূলে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১০ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১১ এর অনুযায়ী ১,২১,২০,১২৯.০০ (এক কোটি একুশ লক্ষ বিশ হাজার একশত উনত্রিশ) ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। উল্লিখিত বিষয়ে জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ অবগত নয়।
“০৪। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধন, ২০২৩) এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের টিএ শাখা কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রের নির্দেশনা অবমাননা করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং’কে ধোপাজান নদীর তলদেশ হতে ড্রেজিং এবং ড্রেজিংকৃত বালু/মাটি জেলা ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর অধীনে সাউথ এশিয়ান সাব রিজিওনাল কো অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পে বালু সর্বরাহ করার অনুমতি প্রদান করার বিষয়টি বিধি বহির্ভূত মর্মে প্রতীয়মান হয়।”
এই পত্রটি ‘সিনিয়র সচিব, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবারয়, ঢাকা’সহ অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সাত (১. মন্ত্রীপরিষদ সচিব, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয় ঢাকা; ২. সিনিয়র সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা; ৩. সিনিয়র সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা; ৪. সচিব, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা; ৫. বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট বিভাগ; ৬. উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর/বিশম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ; ৭. সহকারী কমিশনার (ভূমি), সুনামগঞ্জ সদর/বিশ^ম্ভরপুর, সুনামগঞ্জে) কর্মকর্তাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
উপরে পত্রোক্ত বক্তব্য অনুসারে প্রতিপন্ন হয় যে, ‘বালু বা মাটি সরকার কর্তৃক ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে’ প্রশাসনিক অনিয়মের সুবাদে অবৈধ অনুমতি নিয়ে মূল্যবান খনিজ বালি লুট করে যাচ্ছে একটি লুটেরা চক্র। এই চক্রটি বালুলুটের চমৎকার কৌশল ফেঁদেছে। সাউথ এশিয়ান সাব রিজিওনাল কো অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পে অর্থাৎ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বালু সর্বরাহের অদূরবর্তী ও কম খরচে সংগ্রহ করা যায় এমন উত্তমস্থান হলো নিকটবর্তী (ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের) কুশিয়ারা নদী, কালনী নদী কিংবা সুরমা নদী। এই সব স্থান থেকে বালু সংগ্রহের আবেদন না করে দূরের সুনামঞ্জের ধোপাজান চলতি নদী থেকে ভিটবালু সংগ্রহের আবেদন করে অনুমতিপত্র আদায় করা হয়েছে এবং ধোপাজান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে ভিটবালুর চেয়ে দামি সিলিকা বালু। বিআইডবিøউটিএ অনুমতি দিয়েছে ভিটবালুর উত্তোলণ করা হচ্ছে সিলিকা বালু। এর চেয়ে বড় জুচ্চুরি আর কী হতে পারে ? এই কুমতলব দিবালোকের মত স্পষ্ট। গত ২৬ অক্টোবর ২০২৫ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘লুটের বালু কেনা বেচায় সরকারি প্রকল্পের নাম’। সংবাদ বিবরণীতে বলা হয়েছে, “জেলার ধোপাজান-চলতী নদীর বালু লুট উৎসব থামানোর যেন কেউ নেই। প্রত্যেক দিন সরকারি কাজের টোকেনে ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে তোলা হচ্ছে ভিটবালুর বদলে সিলিকা বালু। রাতের দৃশ্য আরও ভয়ঙ্কর। ধোপাজান বালু মহাল থেকেই তোলা হচ্ছে উন্নতমানের সিলিকা বালু। দিনে প্রকাশ্যে বের হয় ড্রেজিংয়ের বালু আর রাতে সনাতন পদ্ধতিতে তোলা হয় উন্নতমানের দামী বালু। বিআইডবিøউটি’র অনুমতি চুক্তি ভেঙে টোকেনের বিনিময়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন এসব বালু বিক্রয় করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিয়ারিং। অনুসন্ধানে মিলেছে বিক্রির প্রমাণও। যে টোকেন দিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাওয়ার কথা বালু। সেই টোকেন পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীদের কাছে। টোকেন দিয়ে আনা বালু কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এতে লাভবান হচ্ছে সরকারি প্রকল্পের কাজে বালু তোলার অনুমতি নেয়া লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। লুট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, রাজস্ব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার।” এই সংবাদ বিবরণ পাঠ করে যে কেউ বলে দিতে পারবেন কী হচ্ছে ধোপাজান চলতি নদীতে । এক কথায় যাকে বলে, ধোপাজান চলতি নদীতে কায়েমি স্বার্থবাদী লুটেরাচক্রের পুরনো সেই চক্রান্তের চক্কর চলছে অবিরাম।
এই চক্রের অপতৎপরতায় বারকি শ্রমিকদের মধ্যে বিক্ষোভ বিস্তৃত হয়েছে। এমন অন্যায় আদেশ বাতিলের দাবিতে বিক্ষুব্ধ বারকিশ্রমিকরা লাল ঝাÐা হাতে গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর ২০২৫) সুনামগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ কওে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বারকিশ্রমিকরা শুধু অন্যায় আদেশ বাতিল নয়, এই অবৈধ আদেশের সহিত জড়িতদের ও মদদদাতাদেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তাঁরা বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলেন, ‘ধোপাজানের খনিজ বালি, লুটেরাদের দেব না; ড্রেজার-বোমার আগ্রাসন, রুখে দাঁড়াও জনগণ।’ এছাড়া আরও দাবি উঠেছে, ‘ইজারা প্রথা বাতিল চাই, বারকিশ্রমিকদের কাজ চাই; বারকিশ্রমিক অনাহারে সরকার কী করে।’ সেই সঙ্গে এই বিক্ষুভ সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে, অবিলম্বে বালি পাথর মহলে সরকারিভাবে ক্রয়- বিক্রয়কেন্দ্র চালু করে হাজার হাজার বারকি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বারকিশ্রমিকগণ সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছেন । দাবিগুলো হচ্ছে : “১). উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা ধোপাজান নদী হতে বিআইডবিøউটিএ কর্তৃক ‘লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ভিটবালু উত্তোলনের অনুমতি বাতিল করতে হবে। ২). সরকারিভাবে পাথর-বালি ক্রয়কেন্দ্র অবিলম্বে চালু করে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ৩). পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পাথর ও বালি প্রকৃত মজুদের পরিমাণ নিরূপণ করে পাথর ও বালি আহরণের দুর্নীতিগ্রস্ত নীতিমালার পরিবর্তে শ্রমিকস্বার্থে গণনীতিমালা তৈরি করতে হবে। ৪). (ক) সুষ্ঠু ও সরল গণব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে বারকিশ্রমিকদের জন্য বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ দৈনিক মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। (খ) শিল্পশ্রমিকদের ন্যায় বারকিশ্রমিকদের পরিচয়পত্র প্রদানসহ সকল বারকিশ্রমিকের জীবিকা নির্বাহের স্বার্থে দৈনিক কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। (গ) বালি-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মধ্যে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৫). (ক) পরিবেশ বিধ্বংসী বোমা মেশিন, শ্যালো মেশিন, ড্রেজার ও সেইভ ইত্যাদি খননযন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। (খ) বালি-পাথর মহালে ইঞ্জিনচালিত স্টিলবডি নৌকা ও ট্রাক, ভ্যান, লরি ইত্যাদি প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এসকল পরিবহণ যন্ত্রযানের জন্য মহালের বাইরে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করতে হবে।
দুই.
ভুমি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৫৫টি বালি-পাথর মহাল আছে। এই মহালগুলোর বালি পাথরের উৎস মেঘালয় পাহাড়। প্রাকৃতিক নিয়মে বালি ও পাথর সঞ্চালিত হয়ে আসছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সুনামগঞ্জ-সিলেটের পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় এই সম্পদ সঞ্চিত হয়। কিন্তু এসম্পদ লুটে নিচ্ছে মুখচেনা লুটেরা মাফিয়া চক্র বা গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী আমলাতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার জোরে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয় এবং সÐামি, গুন্ডামি, হামলা, মামলা প্রতারণা, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মহাযজ্ঞে নিয়োয়িত হয়ে টাকার পাহাড় গড়ে তোলে। বঞ্চিত হয় দেশ, রাষ্ট্র, সরকার, দেশের মানুষ, বিশেষ করে শ্রমজীবি বারকিশ্রমিকদের জীবন ভয়াবহ বিপন্নতায় নিপতিত হয়। অপরদিকে ক্ষতবিক্ষত হয় নদীর তীর ও তীরবর্তী এলাকা, প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ হয়ে পড়ে ভারসাম্যহীন। অথচ যেকোনও দেশের জন্য যে কোনও খনিজ সম্পদ সব সময় সম্ভাবনাপূর্ণ একটি আর্থনীতিক উপাদান। আমাদের দেশে এই সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ করে রাখে ধোপাজান চলতি নদীতে বালু লুটেরা মাফিয়া চক্রের মতো অর্থলোভী মুষ্ঠিমেয় দানবেরা। এরা আসলেই সমাজবিরোধী ও অপরাধী, দানবে পরিণত হওয়া মাফিয়া। এদের হাত থেকে এই সম্ভবাবনাময় খনিজ সম্পদ মুক্ত করতে হবে। যদি মুক্ত করা হয় এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে সবগুলো মহালের প্রতিটি বালি কণা ও পাথরের টুকরো এক একটি স্বর্ণ কণিকা ও খÐে পর্যবসিত হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এতে করে স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে আনুমানিক ১১,০০০০০ (এগার লক্ষ) বারকিশ্রমিকসহ লোড-আনলোড ও পরিবহণ শ্রমিকের। সার্বিক বিবেচনায় প্রকৃতপ্রস্তাবে সময়ের দাবি এটাই যে, বারকিশ্রমিকদের পাঁচ দফা প্রস্তাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত নতুন ব্যবস্থাপনার কাজ চালিয়ে নিতে প্রয়োজন নদী, পরিবেশ, খনিজ সম্পদ ও ভূতাত্তি¡ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সমন্বয়ে জরিপ পরিচালনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞানের সমন্বয়।
সুনামগঞ্জ\ ৩১ অক্টোবর ২০২৫।
-লেখক :- শ্রমিক সংগঠক
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments