খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক:
একটি পরিবার যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যসংকট, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক আয়হানির মুখোমুখি হয়, তখন সংকটটি কেবল একজন ব্যক্তির থাকে না—তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। তাই সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তাও যদি পরিবারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত হয়, তাহলে তা হতে পারে অধিক কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। এই দর্শন থেকেই বাংলাদেশে নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’।
ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি ভাতা পাওয়ার কার্ড নয়; এটি একটি ডিজিটাল, তথ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে খাদ্য, শিক্ষা, কৃষি ও অন্যান্য সরকারি সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনায় একটি পরিবারের জন্য একটি কার্ড এবং পরিবারের নারীপ্রধানের নামে কার্ড প্রদানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি, কর্মসংস্থানভিত্তিক কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে আসছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (NSSS) জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার ধারণাকে সামনে আনে। এর লক্ষ্য ছিল শিশু, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা। ২০২৬ সালে প্রথম পর্যায়ের (NSSS) এর মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এখন ২০২৬–২০৩৫ মেয়াদের জন্য নতুন কৌশলগত কাঠামো প্রণয়নের দিকে এগিয়েছে।
নতুন কৌশলে দারিদ্র্য, জীবনচক্র, ঝুঁকি, জলবায়ুজনিত অভিঘাত, নগর দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসূচির বিভাজন, উপকারভোগী নির্বাচনে ভুল, বাদ পড়ে যাওয়া এবং সীমিত সুবিধার মতো সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের মার্চে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা নীতিগত সহায়তা কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ১০ মার্চ ২০২৬ পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কর্মসূচিটির মূল দর্শন হলো ‘পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা একজন ব্যক্তির পরিবর্তে পুরো পরিবারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হবে। এতে একই পরিবারের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও অন্যান্য ঝুঁকিকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবার নির্বাচন করতে আয়, সম্পদ, জীবনযাপন ও অন্যান্য আর্থসামাজিক সূচক বিবেচনা করে প্রক্সি মিনস টেস্ট (PMT) বা পরোক্ষ সম্পদ যাচাই পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু অনুমান বা স্থানীয় প্রভাবের ওপর নির্ভর না করে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং একাধিক পর্যায়ে তদারকির মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা এবং একই পরিবারের একাধিক কর্মসূচিতে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পরিবারের নারীপ্রধানের নামে কার্ড প্রদানের পরিকল্পনা। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে রয়েছে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবারের নারী সদস্যের হাতে সহায়তার অর্থ পৌঁছালে খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে তা ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ে। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সরকারি নীতিগত আলোচনাতেও ফ্যামিলি কার্ডকে নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনা এখানেই—এটি ভবিষ্যতে কেবল নগদ অর্থ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় একই পরিচয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে খাদ্য, শিক্ষা উপবৃত্তি, কৃষি সহায়তা এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ধারণা রয়েছে। এর ফলে দরিদ্র একটি পরিবারকে আলাদা আলাদা কর্মসূচির জন্য বারবার নিবন্ধন করার প্রয়োজন কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত সামাজিক রেজিস্ট্রি গড়ে তোলার লক্ষ্যও এর সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে কোন পরিবার কোন ধরনের সহায়তা পাচ্ছে, কোথায় সহায়তার ঘাটতি রয়েছে এবং কোন পরিবার নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে—এসব তথ্য দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
দারিদ্র্য ও সামাজিক ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে সরাসরি সহায়তার লক্ষ্যে দেশে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি পাইলট কার্যক্রমের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১৪টি উপজেলা/এলাকায় নির্বাচিত পরিবারকে এ সুবিধার আওতায় আনা হয়। তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করে দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রায় ৪ কোটি নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, পাইলট পর্যায়ের কয়েক হাজার পরিবার থেকে ভবিষ্যতে কয়েক কোটি পরিবারে এ কর্মসূচি সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বর্তমানে যোগ্য পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নারীদোর নামে কার্ড ইস্যু করার ফলে একদিকে দরিদ্র পরিবারের আয়-ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নও ত্বরান্বিত হবে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় একটি বড়ো ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তায় সরকারের বৃহত্তর উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ডকে বিচ্ছিন্ন একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝা কঠিন হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও জীবনচক্রভিত্তিক করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
সামাজিক নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র মানুষকে কিছু অর্থ দেওয়া নয়; বরং তাকে ঝুঁকি মোকাবিলা করার সক্ষমতা দেওয়া। একজন দরিদ্র পরিবারের হাতে নিয়মিত সহায়তা পৌঁছালে খাদ্যনিরাপত্তা কিছুটা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সন্তানের স্কুলে যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা ছোটখাটো আয়মূলক কাজে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই জায়গায় দারিদ্র্য বিমোচন থেকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনে ফ্যামিলি কার্ডের সম্ভাবনা অনেক বড়ো। যদি নগদ সহায়তার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিবারকে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে সামনে যে চ্যালেঞ্জ তা হলো, কর্মসূচিটির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা। কেউ যেন রাজনৈতিক, সামাজিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে অযাচিত সুবিধা না পায় এবং প্রকৃত দরিদ্র কেউ যেন বাদ না পড়ে—এটি নিশ্চিত করতে হবে। একটি পরিবার আজ দরিদ্র হলেও কয়েক বছর পর তার অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। আবার মধ্যবিত্ত একটি পরিবার আকস্মিক দুর্যোগ, অসুস্থতা বা চাকরি হারানোর কারণে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই সামাজিক রেজিস্ট্রিকে গতিশীল রাখতে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা জরুরি। সরকারও এসব বিষয়ং মাথায় রেখে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিধি গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখন প্রয়োজন সেই ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গতিশীল করা। ফ্যামিলি কার্ড সেই রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। একটি দরিদ্র পরিবার যদি একটি কার্ডের মাধ্যমে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পায়, ভর্তুকিমূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ পায়, সন্তান শিক্ষা সহায়তা পায়, কৃষক পরিবার কৃষি সহায়তার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং অসুস্থ সদস্য প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার পথ খুঁজে পায়—তাহলে একটি কার্ড কেবল একটি কার্ড থাকে না; এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার একটি কার্যকর সেতু।
ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য শুধু কতগুলো কার্ড বিতরণ হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন দেশের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো আরও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাবলম্বী জীবনের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। সামাজিক নিরাপত্তাকে যদি সহায়তা থেকে সক্ষমতায়, বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি থেকে সমন্বিত ব্যবস্থায় এবং কাগজভিত্তিক প্রশাসন থেকে তথ্যনির্ভর সেবায় রূপান্তর করা যায়, তাহলে ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্রের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
#
-লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও গবেষক
পিআইডি ফিচার।
সেলিনা আক্তার:শিশুরা ভবিষ্যৎ জাতির রূপকার। একটি দেশ গড়ে তুলতে শিশুদের সুন্দর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্ব প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পর ...
একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সঙ্গে বই, শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা, খেলাধুলা কিংবা কোনো একটি পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে থাকত। এখন সেই স্বপ্নের জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে প ...
সাইফুল আলম ছদরুল।।রাজনৈতিক মঞ্চের বাগাড়ম্বর, সুশীল সমাজের চটকদার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা কিংবা শহরের ঝলমলে রেস্তোরাঁর রঙিন আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এক নির্মম সত্য। যে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমে নামীদামি ...
নাসরীন জাহান লিপি:টেলিভিশনের পর্দায় চলছে টক শো। মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন আলতাফ সাহেব। প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কথা হচ্ছে। আধুনিক সমাজের দায়বদ্ধতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে। সবার সব কথ ...
সব মন্তব্য
No Comments