নাসরীন জাহান লিপি:
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং স্বপ্নের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রæতই সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে একটি অভূতপূর্ব গণজাগরণে রূপ নেয়, যা প্রায় দেড় দশকের একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তে এক নতুন সূর্যের উন্মোচন করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার কোনো উপায় যেমন নেই, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে ঘটমান এই পরিবর্তনের ঢেউ নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নতুন পথে চালিত করবে। কিন্তু কেমন হতে পারে সেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ? কেমন হওয়া উচিত হাজারো শিশু-কিশোর-তরুণের রক্তে ভেজা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের সংস্কারলব্ধ অবয়ব?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড়ো অর্জন হলো গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে নির্বাচন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নগুলো নিয়ে যে সংকট ছিল, এই আন্দোলন তার অবসানের জোরালো দাবি পেশ করেছে এবং দাবিগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে বলে সবার মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বরকে দমন করা হবে না এবং সংসদ কেবল একটি রাবার স্ট্যাম্প হবে না। জনগণের রায়কে সম্মান জানানো হবে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। মনে আছে নিশ্চয়ই, আগের সরকারগুলোর আমলে অনেক সময় দেখা গেছে যে, বড়ো বড়ো অবকাঠামো প্রকল্প জনগণের প্রকৃত প্রয়োজন ও পরিবেশগত প্রভাবের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ভবিষ্যতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ সমীক্ষা ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (ESIA) করার ওপর জোর দেওয়া হবে, পরিবেশবাদী এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত আরও গুরুত্ব পাবে বলে বাংলাদেশের মানুষ আশাবাদী হতে চায়। মানুষ চায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে, যাতে গ্রামের মানুষ তাদের নিজেদের উন্নয়নের বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল আগে।
গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজের স্বপ্ন দেখতে পারি, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে প্রতিটি স্তরে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুদ্ধি অভিযান চলবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নিজ নিজ দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালন করবে। আমলাতন্ত্র হবে জনবান্ধব, পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু এবং বিচারব্যবস্থা হবে নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ। ব্যাংকিং খাতের ঋণ কেলেঙ্কারি আর দেখতে হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। অর্থপাচারকারীদের দ্রুত বিচার ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। ই টেন্ডারিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের প্রসার ভূমি অফিস বা পাসপোর্ট অফিসের মতো সরকারি পরিষেবাগুলোতে ঘুষের সুযোগ কমিয়ে আনবে, যা পূর্বে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা ছিল।
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়ন হোক্ অনিবার্য বাস্তবতা, কেননা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে। শুধু মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনা বা ডিগ্রি অর্জনের পরিবর্তে, বাস্তবিক জ্ঞান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করা হোক্। তরুণদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং দেশপ্রেমকে কাজে লাগাতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অর্থনীতির মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আমরা সামাজিক সম্প্রীতি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতে পারি। নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হবে, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে, যা তাদের সমাজে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা চায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বিশ্বের অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায়, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালন করবে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য অসীম সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। তবে, জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশীরা পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই আত্মবিশ^াস নিয়ে বলা যায়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে এমন একটি দেশ, যেখানে গণতন্ত্র হবে শক্তিশালী, সুশাসন হবে প্রতিষ্ঠিত, দুর্নীতি হবে নির্মূল এবং সবার জন্য থাকবে সমান সুযোগ। এটি হবে একটি প্রগতিশীল, সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ, যা তার পূর্বপুরুষদের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই স্বপ্নের পথে এক নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে যাবে এক নতুন বাংলাদেশের বার্তা।
#
-লেখক: উপ প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা।
পিআইডি ফিচার
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments