ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালী।

প্রকাশ : 11 Apr 2026
ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালী।

অনিক রায়,ফরিদপুর অফিস: মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অস্থিরতার আবর্তে আরেকটি বাংলাদেশি প্রাণ নিভে গেল দূর প্রবাসে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার এক প্রবাসী নারী—দিপালী (৩৪)। জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো এই সংগ্রামী নারীর এমন করুণ পরিণতিতে তার গ্রামের আকাশ-বাতাস আজ শোকভারাক্রান্ত।


উপজেলার পূর্ব চর শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা সেক মুকার কন্যা দিপালী ছিলেন দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে চতুর্থ। অভাব-অনটনের সংসারে স্বস্তির পরশ বুলাতে প্রায় দুই বছর আগে তিনি লেবাননে গৃহকর্মীর কাজে যোগ দেন। পরিবারকে স্বচ্ছলতার মুখ দেখানোর স্বপ্নই ছিল তার প্রবাসজীবনের একমাত্র প্রেরণা।


পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৮ এপ্রিল) দিবাগত রাতে বৈরুতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে ভয়াবহ বিমান হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে পরাজিত হন তিনি।


দিপালীর ছোট বোন লাইজু বেগমের কণ্ঠে এখনো লেগে আছে শেষ কথোপকথনের রেশ। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো সেদিন বিকেলেও ইমুতে বোনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। কোনো অস্বাভাবিকতা টের পাননি। কিন্তু পরদিন থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকলে দিপালীর কর্মস্থলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অবশেষে তাদের এক স্বজনের মাধ্যমে জানা যায়, ওই হামলায় দিপালীসহ একই পরিবারের আরও ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।


জানা গেছে, সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে প্রায় এক মাস আগে দিপালী তার পূর্বের কর্মস্থল পরিবর্তন করে গৃহকর্তার পরিবারের সঙ্গে বৈরুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি তাকে।


বর্তমানে তার মরদেহ বৈরুতের একটি হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেক ফালু বলেন, “দিপালী অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ছিল। সংসারের দায় কাঁধে নিয়েই বিদেশে গিয়েছিল। আমরা চাই, দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”


এ ঘটনায় প্রশাসনও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া মমতাজ জানান, ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ দেশে আনার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।


উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য।


দিপালীর অকাল প্রয়াণে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে তারা আজ দিশেহারা। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—দ্রুত দিপালীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করা হোক।

সম্পর্কিত খবর

;