ইরান-আমেরিকা সমঝোতা ঘিরে সংশয়, ‘নীতি’তে সম্মতি হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে টানাপোড়েন

প্রকাশ : 25 May 2026
ইরান-আমেরিকা সমঝোতা ঘিরে সংশয়, ‘নীতি’তে সম্মতি হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে টানাপোড়েন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:  ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু সমঝোতা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার দাবি করেছেন যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ‘বেশিরভাগই আলোচনা হয়ে গেছে’। চুক্তির খসড়ায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড় এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানায়, প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী ইরান ‘নীতিগতভাবে’ তাদের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হয়েছে এবং প্রণালিতে পুঁতে রাখা মাইন সরিয়ে নেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। 


তবে তেহরান এই দাবি নাকচ করেছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে তেহরান রাজি হয়নি এবং পরমাণু ইস্যু বর্তমান প্রাথমিক চুক্তির অংশ নয়। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি খোলার দাবিকে ‘অসম্পূর্ণ ও বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, খসড়া সমঝোতায় ১৪টি ধারা থাকবে, তবে পরমাণু ইস্যু এই পর্যায়ে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। 


যুক্তরাষ্ট্রও তাড়াহুড়ো না করার কথা বলেছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘চুক্তিতে তড়িঘড়ি করা হবে না’ এবং ‘কোনো ভুল করা যাবে না’। তিনি স্পষ্ট করেন, অবরোধ সম্পূর্ণ বহাল থাকবে যতক্ষণ না চুক্তি স্বাক্ষর ও প্রত্যয়িত হয়। একজন মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ধুলো নেই, ডলার নেই’—অর্থাৎ উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর না হলে ইরান কোনো প্রকৃত ছাড় পাবে না। 


সমঝোতার শর্ত নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখুক এবং মজুত ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা বিদেশে পাঠিয়ে দিক। অন্যদিকে ইরান পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দিয়েছে এবং নিজস্ব সেন্ট্রিফিউজ রেখে জ্বালানি উৎপাদনের অধিকার চাইছে। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি থাকলেও ইরান এগুলোকে ‘অ-আলোচনাযোগ্য’ বলছে। 


তিন মাসের যুদ্ধের পর গত ৭ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে দুই দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা আগামী সপ্তাহে চলবে। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ ‘জাতীয় মর্যাদা’ রক্ষার চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতির কারণে দুই পক্ষই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ নতুন চুক্তির জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। তবে ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে সমঝোতা না হলে পুরো চুক্তিই ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা। 


সম্পর্কিত খবর

;