নারী দিবস

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে সন্তু লারমার অপসারণ দাবি

প্রকাশ : 09 Mar 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে সন্তু লারমার অপসারণ দাবি

চট্টগ্রাম অফিস: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ) রবিবার ( ৮ মার্চ ২০২৬ ) নারী সমাবেশ, প্রতিবাদী নৃত্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বরাবরে স্মারকলিপ পেশ করেছে।


স্মারকলিপিতে নারীদের যৌন শোষণের দায়ে সন্তু লারমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে  এই স্মারকলিপিটি পেশ করা হয়। এতে সন্তু লারমার স্ত্রী মিসেস শিপ্রা দেওয়ান কর্তৃক ১১ অক্টোবর ২০০৫ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) তৎকালীন সহ-সভাপতির কাছে লেখা একটি চিঠি সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সন্তু লারমার বিরুদ্ধে নারীদের যৌন শোষণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।


 

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কণিকা দেওয়ান, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য রেশমি মারমা, জনপ্রতিনিধি অংক্রই মারমা। স্মারকলিপি প্রদানকালেও তারা উপস্থিত ছিলেন।


সমাবেশে শেষে দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসন জনাব মো. আনোয়ার সাদাত স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।


আজ সকাল ১০:৩৫টার সময় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদ মাঠ থেকে মিছিল সহকারে গিয়ে চেঙ্গী স্কোয়ারে সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন উপজেলা থেকে সহস্রাধিক নারী ও শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন শ্লোগান দেন ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সমাবেশের পূর্বে  বিভিন্ন উপজেলা থেকে নারী ও শিক্ষার্থীরা উপজেলা পরিষদ মাঠে এসে সমবেত হন।


সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কণিকা দেওয়ান, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য রেশমি মারমা, জনপ্রতিনিধি অংক্রই মারমা ও সুদুঅং মারমা।


কণিকা দেওয়ান অভিযোগ করে বলেন, আজকের সমাবেশ যাতে যথাসময়ে করা না যায় সেজন্য প্রশাসন থেকে হয়রানিমূলক নানা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।


তিনি সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের মা-বোনদের নিজ বাড়িতে, নিজ জায়গায় শান্তিতে বসবাস করার মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারেন তাহলে আমাদের মা-বোনেরা আপনাদের ভাষায় কথা বলবেন। কিন্তু আপনারা তা না করে মা-বোনদের হয়রানি করবেন, তাদেরকে নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করবেন, তাদেরকে ধর্ষণ-ধর্ষণের চেষ্টা করবেন তাহলে আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলবো। ২০২৬ সালে এসেও আপনারা যদি মনে করেন আপনাদের ভয়ে আমরা ঘরের কোণায় বসে থাকবো, এটা কীভাবে সম্ভব?


তিনি বলেন, কল্পনা চাকমাকে আপনারা রাতের আঁধারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছেন। আপনারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন বলে পার পেতে পারেন না। কল্পনা চাকমা অপহরণের সাথে জড়িত লে. ফেরদৌস গংদের বিচার করে নারী সমাজের দাবি পূরণ করতে হবে।


কণিকা দেওয়ান অভিযোগ করে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনার সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনী জড়িত রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে জানতে পারছি, নতুন করে পাহাড়িদের জায়গা-জমি বেদখলের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এতেই বুঝা যাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আগামীতে আমরা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।

 

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো অনেক অমীমাংশিত বিষয় রয়ে গেছে। যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে জড়িত আছেন তারা যদি মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে ভয় দেখিয়ে, পুলিশ প্রশাসন দিয়ে, সেনাবহিনী দিয়ে, মা-বোনকে অপহরণ করে, ধর্ষণ করে, ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন তাহলে আপনারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।


পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে রাজনৈতিকভাবে ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে, তার আগে নয়।


তিনি বলেন, সরকার পর্যটনের নামে উন্নয়নের কথা বলছে। কিন্তু যে পর্যটন পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে সে ধরনের পর্যটন আমরা চাই না।


তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী-শিশুর ওপর নির্যাতন-ধর্ষণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল বন্ধের মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানান।


রেশমি মারমা বলেন, আমারা এ যাবত দেখে আসছি সমতলে এক শাসন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক শাসন। সমাবেশ করতে গিয়েও প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা করতেই আমাদের সময় চলে যায়। সকালে এসে দেখলাম সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আমার প্রশ্ন- এখানে এত বৈষম্য কেন? আমরা সমানাধিকার চায়। এখানে নারী সমাবেশে পুরুষ থাকতে পারবে ন তাা কোন সংবিধানে, কোন আইনে লেখা আছে- এর উত্তর যদি দিতে পারেন তাহলে সমাবেশ থেকে আমরা পুরুষদের বিদায় করে দেবো।


তিনি আরো বলেন, এখানে আমাদের বোনদের নানা হয়রানি করা হয়, ভাইদেরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে প্রেরণ করা হয়। প্রশাসনের মদদে ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘাত বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের বুঝতে হবে।


তিনি বলেন, আমরা যদি পত্র-পত্রিকা দেখি তাহলে নারী-শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির চিত্র দেখতে পাই। কিন্তু এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার পাওয়া যায় না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশে নিয়ম হয়ে উঠেছে।


তিনি নারী নির্যাতনসহ সকল নির্যাতন বন্ধের জোর দাবি জানান এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের বিচার যেমন আমরা পাইনি, একইভাবে ২০১৮ সালে মন্টি ও দয়াসোনা চাকমাকে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী কর্তৃক অপহরণের ঘটনারও কোন বিচার হয়নি। এভাবে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশুদের ধর্ষণ-অপহরণের শিকার হতে হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলে হামলা-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তিনি এই বিচারহীনতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।


তিনি সবাইকে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।


নীতি চাকমা বলেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের অধিকারের দাবিতে এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে আসছে।


তিনি বলেন, অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে ’৯৬ সালে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস গং কর্তৃক অপহরণের শিকার হয়। আজ পর্যন্ত তার কোন হদিস আমরা পাইনি। পরবর্তীতেও আমরা দেখেছি, যারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে ও অধিকারের পক্ষে কথা বলেছে তাদেরও নানা নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। নারী সহযোদ্ধাদের কারাবরণ করতে হয়েছে, অপহরণের শিকার হতে হয়েছে। আমাদের সমর্থক,শুভাকাঙ্ক্ষীরাও নিপীড়ন-হয়রানির শিকার হয়েছেন। আজকে মানিকছড়ি থেকে সমাবেশে আসার পথে নারীদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানেও সকাল থেকে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।


নীতি চাকমা বলেন, নারীদের মধ্যে একটি পক্ষ প্রতিবাদী লড়াইয়ে যুক্ত থাকলেও আরেকটি পক্ষ রয়েছেন যারা নিজেদের নানাভাবে বিকিয়ে দিচ্ছে। তিনি দালালদের কঠোরভাষায় সমালোচনা করেন এবং আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ তোলেন। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের গণআদালতে বিচারের হুঁশিয়ারি দেন।


শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে রচিত স্মারকলিপি পড়ে শোনান।


সমাবেশ শেষে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বরাবরে স্মরকলিপিটি পেশ করা হয়। স্মারকলিপিতে সন্তু লারমার স্ত্রী মিসেস শিপ্রা দেওয়ানের সেই চিঠির তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, সন্তু লারমা ১৯ জানুয়ারি ২০০৪ তারিখে কল্যাণপুরের সরকারি বাসভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাঁর অফিসের এক পিয়নের স্ত্রীকে যৌন হেনস্তা করেন। এছাড়া তিনি ১১ জুন ২০০৫ তারিখে ঢাকার বনানীস্থ আঞ্চলিক পরিষদের রেস্ট হাউসে ওয়াচিংপ্রু মারমাকে, ২৯ জুন ২০০৫ তারিখে একই গেস্ট হাউসে ইনু চাকমাকে এবং খুশি আক্তার নামের একজনকে বারবার বনানী রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়ে যৌন শোষণ করেন। মিসেস শিপ্রা দেওয়ান সন্তু লারমার বিরুদ্ধে যৌন শোষণের বিনিময়ে কাজের চুক্তি (কন্ট্রাক্ট) প্রদানসহ দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও উত্থাপন করেছিলেন।


স্মারকলিপিতে আরো বলা হয়, তিনি গত ২৭ বছর ধরে এক নাগাড়ে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরি, কন্ট্রাক্ট, গয়না এবং বৃত্তির প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ডজনখানেক ‘আদিবাসী’ নারীকে যৌন শোষণ করেছেন। সবাই জানলেও ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না।


স্মারকলিপিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়েছে, “২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সিঙ্গিনালা এলাকায় টিউশন থেকে ফেরার পথে ১২ বছরের এক পাহাড়ি কিশোরী তিন সেটলার কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। পুলিশ সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিচার দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে গুইমারায় তিন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে।


“পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন যৌন শিকারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে এক ‘আদিবাসী’ ছাত্রীকে যৌন হয়রানির মামলায় আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সোহেল রানা জেল খাটেন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার স্কুলে যোগ দিলে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১ অক্টোরব ২০২৪ তারিখে [স্মারকলিপিতে তারিখ ভুল ছিল] আরেক ‘আদিবাসী’ ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টার পর পালানোর সময় রানার মৃত্যু হয়, যা জাতিগত দাঙ্গার এক ভয়াবহ রূপ নেয়।”


নারী অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর কন্যা জাইমা রহমানের বক্তব্যের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে স্মারকলিপিতে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলো হলো: আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারী নির্যাতনের দায়ে সন্তু লারমাকে অপসারণ করা; মিসেস শিপ্রা দেওয়ানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৭ বছরে আঞ্চলিক পরিষদে নিয়োগ, টেন্ডার এবং তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্নীতির তদন্ত করা; পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সারাদেশে নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।


সমাবেশে প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের শিল্পীরা প্রতিবাদী নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন।


সম্পর্কিত খবর

;