বাবা, মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ

প্রকাশ : 02 Jun 2026
বাবা, মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ


বিশেষ প্রতিনিধি,  বরিশাল অফিস: উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও নয়বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদকে মঙ্গলবার দুই জুন বেলা সোয়া চারটায় ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়েছে। ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্র শেষ শয্যায় শায়িত হলেন নিজ জন্মভূমির মাটিতে।


এর আগে বেলা আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মুফতি মজিরুদ্দিন। জানাজা শেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করে প্রশাসন। পরে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।


তোফায়েল আহমেদ সোমবার বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। তিরাশি বছর বয়সী এই রাজনীতিক নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে গত বছরের চব্বিশ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন। আট মাস আট দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা হয়। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে এগারোটায় স্কয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহ হযরত শাহজাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে বেলা দেড়টায় মরদেহ ভোলা হ্যালিপেডে পৌঁছায়। দুপুর দুইটায় ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ জানাজাস্থলে আনা হয়। জানাজা ও গার্ড অব অনার শেষে গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন মসজিদ প্রাঙ্গণে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।


এক হাজার নয়শ তেতাল্লিশ সালের বাইশ অক্টোবর ভোলা সদরের কোড়ালিয়া গ্রামে আজহার আলী ও ফাতেমা খানমের ঘরে তার জন্ম। ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে এক হাজার নয়শ ষাট সালে ম্যাট্রিক পাসের পর বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে এক হাজার নয়শ বাষট্টিতে আইএসি ও এক হাজার নয়শ চৌষট্টিতে বিএসি সম্পন্ন করেন। একই বছর ভোলার আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় চিকিৎসক। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন।


ছাত্র রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন কিংবদন্তি। এক হাজার নয়শ চৌষট্টি সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, এক হাজার নয়শ পঁয়ষট্টিতে বিভাগের সহসভাপতি এবং এক হাজার নয়শ ছেষট্টি থেকে উনসত্তর সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচিকে এগারো দফায় রূপ দিয়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। তিনিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। উনসত্তরেই ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।


এক হাজার নয়শ সত্তরের দুই জুন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। মাত্র সাতাশ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হিসেবে বরিশাল খুলনা ফরিদপুর যশোর কুষ্টিয়া পাবনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।


স্বাধীনতার পর এক হাজার নয়শ তিয়াত্তরে ভোলা থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পঁচাত্তরে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী এবং বাকশালের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পঁচাত্তরের পনেরো অগাস্টের পর গৃহবন্দি ও কারাগারে তেত্রিশ মাস বন্দি ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় এক হাজার নয়শ আটাত্তরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।


এক হাজার নয়শ ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং দুই হাজার চৌদ্দ থেকে উনিশ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। নৌকা প্রতীক নিয়ে মোট বারো বার নির্বাচন করে নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এক হাজার নয়শ সত্তর থেকে দুই হাজার চব্বিশ সাল পর্যন্ত টানা জয়ী এই রাজনীতিক আশি বছর বয়সেও নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এক হাজার নয়শ বিরানব্বই থেকে দুই হাজার দশ সাল পর্যন্ত আঠারো বছর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং মৃত্যু পর্যন্ত উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

সম্পর্কিত খবর

;