ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:
গেল মাসে আরিচায় শাহ্ আমানত ফেরীটির দূর্ঘটনাটি ততটা আলোড়িত হয়নি, যতটা হতে পারতো হতাহতের ঘটনা ঘটলে। ঘটনার শুরু শিরোনামটি যখন পেলাম, তখন সবাই আঁতকে ওঠেছিলাম। এখন থেকে কী ভয়ানক বিভীষিকাময় খবর আসবে একটার পর একটা এই আতংকেই আঁতকে ওঠা। গেল দু’বছরে করোনায় কাছের কিংবা দূরের মানুষজনের অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিত মৃত্যু সংবাদে যেমনি আঁতকে ওঠতাম, অনেকটা তেমন।
খুব সম্ভবত আমার অফিস সহকর্মী ছোট্ট মেয়ে সোনির খুবই তরুণ বয়সী চাচার মৃত্যু সংবাদটিই ছিল করোনায় আমার কাছাকাছি মানুষজনের মধ্যে প্রথম মৃত্যু সংবাদ। বুকটা জ্বলে উঠেছিল খবরটায়। এরপর অফিসের রবিউলের শ্বশুর চলে গেলেন। চলে গেলেন আমার একজন চাচীও। ভেবেছিলাম এই বুঝি আপনজনদের হারানো শুরু। এই বুঝি করোনার ঘরে আসার সময় হলো। নিজের জীবনের ভয়ও পেয়ে বসেছিল।
২০২১ সালটা ভয়াবহ রকমের খারাপ গেছে বাংলাদেশ তথা বিশ্ববাসীর জন্যে। ২০২০ সালের চেয়েও বেশি খারাপ। ২০ সালে বাংলাদেশ অনেকটাই নিরাপদ ছিল বলা যায়। কিন্তু ২১ এ এসে করোনার ভারতীয় বা ডেল্টা ভেরিয়েন্টের প্রভাবে অক্সিজেনের অভাবে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু যন্ত্রণা আমাদেরকে পীড়িত করেছে মানসিক ভাবে। সংক্রমণ হুহু করে বেড়েছে, কিংবা ছড়িয়েছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
এক বছর আগে গ্রামের মানুষ করোনা চিনতোই না। পাত্তাই দেয়নি করোনাকে। কিন্তু এ বছর পাত্তা না দিয়ে পারেনি। পাত্তা তারা নিজেরাও পায় না কখনো। এই যে এত বড় একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেল, তারা কি পাত্তা পেয়েছে? সরকার মোটেই পাত্তা দেয়নি জনগণকে। পাত্তা দিলে অন্তত দূর্ঘটনার দায়ভার চাপিয়ে কাউকে না কাউকে শাস্তি দিয়ে জনগণকে এইটুকু বার্তা দিতে পারতো এই বলে যে, কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়।
জনগণ আশায় ছিল সরকার কিছু করবে। কিন্তু সরকার করেনি। ফিটনেসবিহীন প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো লক্করঝক্কর মার্কা ফেরীটি কিভাবে এতদিন প্রচন্ড ঝুকি নিয়ে জানমাল পারাপার করলো, এ নিয়ে দায়িত্বশীলদের ধরেনি। ধরা উচিত ছিল। ফেরীটি প্রাইভেট কোম্পানীর হলে কি করতো? এভাবেই চুপচাপ বসে থাকতো? নাকি উদ্ধার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থেকে সময় পার করতো?
মোটেই তা নয়। বরং প্রথমেই ফেরীর মালিককে ধরে হাতকড়া পড়িয়ে জেলে ভরতো। এমনি এমনি ধরতো না। ঘটা করে মিডিয়াকে ডেকে র্যাব পুলিশ দিয়ে বাসা ঘেরাও করে রাখতো। শ’দুয়েক পুলিশ থাকতো পাহারায়। শুরু হতো লাইভ শো। একটা দুটা টিভি ক্যামেরা না; না হলেও ৫০টা টিভি ক্যামেরা থাকতো। মালিক কেন ফেরীটির সুষ্ঠ রক্ষণাবেক্ষণ সময়মত করলো না এই অজুহাতে এসব হতো।
অন্তত দু’সপ্তাহ মিডিয়া গরম থাকতো ফেরী মালিকের দূর্দশাগ্রস্ত ছবি দেখিয়ে। শতশত পুলিশে ঘেরা হেলমেট পরিহিত বেচারা অবনত মস্তিষ্কে ঠেলাঠেলি করে কোর্টে যেত। টংগী এজতেমা শেষে রাস্তাঘাট যেভাবে লোকে লোকারণ্য হয়, ঠিক সে ভাবে। রিমান্ড হতো কয়েকবার। কিন্তু জামিন হতো না। বলার চেষ্টা করা হতো, লোকটা ধূরান্দর টাইপের দূর্নীতিবাজ। জীবনে কুকর্মের শেষ নেই তার।
কিন্তু আমানত শাহের বেলায় এর কিছুই ঘটলো না। দায়িত্বে অবহেলার জন্যে কাউকে ধরেনি। ধরেনি, কারণ এর মালিক সরকার। কী সেলুকাস এই দেশ! অপরাধ করলে বেসরকারি লোকজনের ধরপাকড় এদেশে নিমিষেই হয়। ধরপাকড় হয় না কেবল সরকারি লোকজনের। উল্টো তারা আয়েশ করে পাবলিক ধরে। যখন যাকে মন চায়, খপ করে ধরে। অপরাধ করলেও ধরে, না করলেও ধরে। শাস্তি যা দেবার রায়ের আগেই দিয়ে দেয়। আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকে না।
বছর শেষে আমরা অপেক্ষায় থাকলাম আমানত শাহ্ সংশ্লিষ্ট লোকজনকে ধরে বিচারের সম্মুখীন করার। এখনো আশা করতে চাই, এদের বিচার একদিন হবে। কেননা দেশ তো আর আগের বাংলাদেশ নেই। প্রভুত উন্নয়নের ধাক্কায় আমল বদলে গেছে। যেমনি পাল্টে যাচ্ছে এর অবয়ব, তেমনি নিশ্চয়ই পাল্টাবে স্বয়ং রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উন্নয়ন যেমনি জরুরী, তেমনি জরুরী আইনের প্রকৃত শাসন। আইন সবার জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। নচেৎ উন্নয়নের উজ্জ্বলতা মলিন হবে।
বিরোধীরা যাই বলুক, মুখে স্বীকার না করুক; আড়ালে আবডালে স্বীকার করতে বাধ্য হয় দেশের ফাটাফাটি উন্নয়ন। দেশের কোথায় উন্নয়নে হাত পড়েনি! সর্বত্র এবং সারা বাংলা উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। এমন কোন বিভাগ নেই, জেলা নেই যেখানে উন্নয়ন হচ্ছে না। গেল কয়েক বছরে আমুল পাল্টে গেছে দেশের চেহারা। মেগা প্রকল্পে গিজগিজ করছে সারাদেশের আনাচে কানাচ। কী গ্রাম, কী শহর; কোন না কোন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট আছেই।
আসছে নতুন বছরে মিনিমাম চারটি মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। হবে বহুল প্রত্যাশিত উদ্বোধন। বিগত বছরগুলোর চেয়ে নতুন বছরের পার্থক্যটা এখানেই। নতুন বছর হবে আশা পূরণের, আনন্দ উৎযাপনের বছর। জাতি সুফল পেতে শুরু করবে নতুন প্রকল্পগুলোর। যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিশাল রকমের পরিবর্তনে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বড় রকমের বৃদ্ধি পাবে। এমনিতেই এ বছর গড় আয় বেড়ে ২,৫৫৪ ডলার হয়েছে। আগামী বছর আরো বাড়বে। বাড়বে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
এগিয়ে গেছে পদ্মা সেতু। আগামী জুনে এটা চালু হবে। এটা কি শুধু একটা সেতু চালু হবার বিষয়? নাকি চালু হবে বাঙালীর উন্নয়নের অগ্রযাত্রার ট্রেন! সারা বাংলার সাথে দক্ষিণ বাংলা বিচ্ছিন্ন ছিল। সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। ওদিকে যেতে হলে পাড়ি দিতে হতো ফেরী। লাগতো ঘন্টার পর ঘন্টা সময়। সেদিন শেষ। এখন শুধু গাড়ি নয়, চলবে ট্রেনও। মাত্র তিন বছর পরে পর্যটন শহর কুয়াকাটা পর্যন্ত যাওয়া যাবে ট্রেনে করেই। আর ঢাকা থেকে যেতে লাগবে মাত্র তিনঘন্টা।
আর তিনঘন্টা নয়, মাত্র ৩২ মিনিটে মতিঝিল থেকে উত্তরা আসা যাবে। আগামী জুনে চালু হবার পর মতিঝিল থেকে উত্তরা আসতে আর সময় লাগবে না। এখন লাগে সাড়ে তিনঘন্টা। কপাল ভাল থাকলে আগে আসা যায়। সেটা ভাগ্যের কথা। পুরো ঢাকার মানুষ এর সুফল পাবেই। বাসে চড়ার ভোগান্তি অনেকাংশেই কমবে। সময় কম লাগা মানেই সময়কে জয় করা। প্রকৃত উন্নয়নের জন্যে সময়কে জয় করার বিকল্প নেই।
তাই তো কর্ণফুলী টানেল। চালু হচ্ছে কর্ণফুলী টানেলও। এতে করে বদলে যাবে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক শিল্প নগরী। এই নগরে যানজট ছিল নিত্য দিনকার ঘটনা। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর এপার ওপারের যানজট। প্রত্যাশিত সময়ের আগেই টানেলটি কোন বাঁধা ছাড়াই চালু হওয়ায় সরকার নড়েচড়ে বসেছে। সরে এসেছে পদ্মায় দ্বিতীয় সেতু করার সিদ্ধান্ত থেকে। আরিচার পদ্মায় আর সেতু নয়। হবে টানেল। কর্ণফুলীর মতই টানেল দিয়ে আরিচা দৌলদিয়াকে এক করা হবে।
এক করা হবে ঢাকা কক্সবাজারকে। রেল যোগাযোগ দিয়ে এক করা হবে। বহুল প্রত্যাশিত ঢাকা কক্সবাজার ট্রেন লাইনের শুভ উদ্বোধনও হবে এই ২২ সালে। কী চমৎকার ব্যবস্থা। ঢাকার কমলাপুরে মানুষ ট্রেনে চড়ে বসবে। আর মাত্র কয়েক ঘন্টায় চলে যাবে কক্সবাজার। সবই যেন স্বপ্নের মত মনে হয়। এবছরও যা স্বপ্ন, আসছে বছরেই তা বাস্তব। ২২ সাল হতে যাচ্ছে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবার বছর।
কয়েক বছর ধরে সে সব স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে আসুন না ক্লান্তি ভুলে একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠি। নববর্ষকে আলিঙ্গন করে নেই দু’হাত দিয়ে। প্রার্থনা করি নববর্ষ সত্যি সত্যি শুভ হোক। হোক নব রঙে সজ্জিত। বিশ্ব হোক করোনা মুক্ত। বিশ্ববাসীর মুখে আবার ফুটুক নির্ভয় চিত্তের উজ্জ্বল হাসি। শুভ নববর্ষ!!!
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments