কেন প্রয়োজন সমাজ বিপ্লব

প্রকাশ : 15 Feb 2025
কেন প্রয়োজন সমাজ বিপ্লব


এডভোকেট কুমার চন্দ্র রায়:

 

কমিউনিস্টরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান ঘটিয়ে উৎপাদনের উপকরণসমূহের উপর যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠার কথা বলে। ব্যক্তিমালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে কাজ করে বলে কমিউনিস্টরা ব্যক্তি সম্পত্তিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার অবসান চায়। প্রযুক্তিগত বিকাশের ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্রকে সামাজিক করে তুলেছে। কিন্তু উৎপাদনের উপকরণগুলির মালিকানা থেকে গেছে ব্যক্তিগত। উৎপাদন ব্যবস্থার সামাজিক চরিত্রের সঙ্গে মালিকানার এই ব্যক্তিগত চরিত্রের বিরোধিতার ফলেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। একটি সমাজ বিপ্লব যা উৎপাদনের উপকরণগুলির উপর ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটায়, সেটিই পারে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথকে অবাধ করতে। কমিউনিস্টরা যে উৎপাদনের উপকরণের উপর ব্যক্তি মালিকানার অবসান চায় তার কারণ এটাই।


বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মতে ব্যক্তিগত উদ্যোগই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের গ্যারান্টি সৃষ্টি করতে পারে। অ্যাডাম স্মিথ এই মতবাদের উদ্যোক্তা। পরবর্তীকালে বুর্জোয়া তাত্ত্বিকগণও এই মতবাদকে জোরালো করেছেন। তাদের মতে উদ্যোক্তাগণ লাভ-লোকসানের নিরিখেই কাজের সিদ্ধান্ত নেয়। এই লাভ-লোকসানের তাগিদেই ঘটায় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা, তার মধ্য দিয়েই উৎপাদনের উপকরণগুলি সবচেয়ে ভালভাবে কাজে লাগাবার কারণগুলিও উদ্ভাবিত হয়। মুক্ত প্রতিযোগিতা নির্ভর (Laissez fair) অর্থনীতিই তাই কাম্য অর্থনীতি।

 

১৯১৭ সালের রুশ অক্টোবর বিপ্লবের পর গড়ে উঠা সোভিয়েত অর্থনীতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়লো সেই বুর্জোয়া অর্থনৈতিক তত্ত্বকে। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের মুনাফা ভিত্তিক নীতি বর্জন করেও যে অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়, ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের তাগিদ ছাড়াও যে উৎপাদনে জনগণকে সামিল করা যায়, সোভিয়েত রাশিয়ায় তা প্রমাণিত হলো এবং দেখা গেলো যে অ্যাডাম স্মিথের অর্থনৈতিক নীতির হাত ধরে যে শিল্প বিপ্লবের সমাজ গড়ে উঠেছিল, ঐ সব সমাজের শিল্প বিপ্লবের যুগে অর্জিত জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হারের চেয়ে যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় জাতীয় আয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। সমগ্র দুনিয়া জানলো ‘‘স্টাকানো ভাইট’’ আন্দোলনের কথা। শ্রমিকদের স্বেচ্ছাশ্রমে মস্কোতে পাতাল রেল গড়ে ওঠার কাহিনী।

 

বাস্তব নিদারুণভাবে প্রকাশিত হওয়ায় বুর্জোয়া অর্থনীতিকে আপস করতে হলো মার্কসীয় তত্ত্বের সঙ্গে। ত্রিশের দশকের মহামন্দা, ব্যক্তি পুঁজির প্রতিযোগিতা নির্ভর অর্থনীতির রাশ টেনে ধরা বাধ্যতামূলক করে তুললো। অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বলশেভিক মতবাদের যারা বিরোধী ছিলেন, তারাই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ তত্ত্বের সমর্থক হয়ে উঠলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চাকুরি, ব্যক্তি মানুষের প্রতিটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে বলশেভিকদের সাফল্য বুর্জোয়া অর্থনীতিতে নিয়ে এলো কল্যাণব্রতী রাষ্ট্রের ধারণা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্সও কল্যাণ রাষ্ট্রের অর্থনীতি কায়েম করলো। 


এরপরই আবার শুরু পালা বদলের। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে যে তাত্ত্বিক বির্তকের সূত্র ধরে পালা বদলের শুরু এবং ওই শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে যে আনুষ্ঠানিক পালা বদলে নিয়ে আলোচনা চলছে এবং চলবে। এই পালা বদলের কারণ হিসাবে যে প্রশ্নটা সামনে আসছে তাহলো যৌথ মালিকানা ভিত্তিক যে সমাজ, বিপ্লবোত্তর দেশগুলিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কী উৎপাদিকা শক্তির অবাধ বিকাশের পথে অন্তরায় ছিল না ব্যক্তিমালিকানা ভিত্তিক বাজার অর্থনীতিই সঠিক ছিল ইত্যাদি প্রশ্ন। আমরা দেখলাম, যে বুর্জোয়া অর্থনীতির তত্ত্ব এক সময় মার্কসবাদের সঙ্গে আপসের পথ খুঁজতো বিপ্লবোত্তর সমাজগুলিতে সেই তত্ত্বই আবার বলশালী হয়ে উঠা এবং সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার কুশীলবরা বুশ, কোল, মিঁতেরো ‘পুঁজিবাদ শাশ্বত, সমাজতন্ত্র ব্যর্থ’ ইত্যাদি আপ্তবাক্য দ্বারা মুক্তিকামী জনগণকে, দুনিয়াকে বোকা বানাতে চাইলো। কিন্তু কয়েক বৎসরের মধ্যেই দেখা গেলো প্রতিযোগিতা নির্ভর অর্থনীতিই কাম্য অর্থনীতি নয়। বাজার ভিত্তিক অর্থনীতি যদি উৎপাদনের উপকরণগুলিকে সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই দক্ষ অর্থনীতিই কাম্য অর্থনীতি কিনা। দক্ষ অর্থনীতি হল এমন এক অর্থনীতি যেখানে উৎপাদন ব্যয় সর্বনিম্ন। কিন্তু কাম্য অর্থনীতি হল এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সমস্ত মানুষের মঙ্গল হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বাজারী প্রতিযোগিতা এই সর্ব্বোচ্চ মঙ্গলের কোন গ্যারান্টি দিতে পারে না। তাত্ত্বিক বিচারে যে কোন বাজারী অর্থনীতিই দক্ষ অর্থনীতি নয়। বাজারী অর্থনীতিতে উৎপাদনের সীমিত উপকরণগুলি দিয়ে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করানো যাবে যদি সেই অর্থনীতিতে থাকে পূর্ণ প্রতিযোগিতার নিয়মগুলি। কিন্তু আমরা দেখছি বাজারী অর্থনীতিতে পূর্ণ প্রতিযোগিতার নিয়মগুলি কার্যকরী হচ্ছে না। পূর্ণ প্রতিযোগিতা বলতে ভাবা হয়েছে এমন এক অর্থনীতি যেখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা প্রত্যেকেরই সংশ্লিষ্ট বাজার সর্ম্পকে ধারণা আছে। অর্থাৎ এই বাজারে যোগান কত, ক্রেতা কত দাম উঠানামা করে কোথায় স্থির হবে ইত্যাদি বিষয় ক্রেতা-বিক্রেতার নখদর্পণে থাকবে। বাজার ব্যবস্থায় এমন এক অর্থনীতি কায়েম করা সম্ভব নয়। মার্কেট সার্ভে করে ও ক্রেতার মনোজগতের ওপর পূর্ণ আস্থা আনা সম্ভব না হওয়ায় সমাজে অনিশ্চয়তা থাকে। অনিশ্চিয়তার জন্য বিনিয়োগে থাকে লোকসান বা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না হবার ঝুঁকি। যে জন্য বিক্রেতা বা উৎপাদক ও কিভাবে তার পুঁজি বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করবে তা নিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। উৎপাদিকা শক্তির সুষ্ঠু বিকাশের জন্য যে অর্থনীতির কথা বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা সম্ভাব্য কমিউনিস্ট তত্ত্বের বিপরীতে উপস্থাপন করেন তার অনেকটাই অবাস্তব অর্থনীতি। সোভিয়েত ধাচের সমাজগুলির ব্যর্থতায় উল্লসিত হয়ে বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা বলেছিলেন এই অর্থনীতি উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে শেষ পর্যন্ত উৎপাদনের অগ্রগতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল তার কারণ যৌথ মালিকানা ভিত্তিক অর্থনীতি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, যৌথ মালিকানা ভিত্তিক অর্থনীতি ব্যর্থ হয়েও থাকে, তবে তার কোন গ্রহণযোগ্য বিকল্প অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউট থেকে জন্ম নেয়নি। Laissaz fair অর্থনীতি তথা বাজারী অর্থনীতির সীমানা ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাত্ত্বিকদের কল্পনাতেই তা সীমাবদ্ধ। বাজারী অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষমতা প্রমাণ করতে যারা পূর্ণ প্রতিযোগিতার তত্ত্ব আমদানি করেন, তারা এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল। এটা প্রমাণিত একটা কাম্য অর্থনীতি বাজারী লাভ-লোকসানের টানা-পোড়নের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে না। কাম্য অর্থনীতি গড়ে উঠার জন্য সমাজতান্ত্রিক সমাজের মতই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেরও প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের। পূর্ণ প্রতিযোগিতার কল্প স্বর্গে পৌঁছে দেবার মত নীতি যদি আদৌ কিছু থাকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রই পারে তা প্রয়োগ করতে। তা যদি হয় তাহলে স্বীকার করতে হবে বাজার  কাম্য অর্থনীতি গড়ে না, কাম্য অর্থনীতি গড়ে বাজার বহির্ভূত কিছু শক্তি। 


বাজারী কাঠামো বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের যে প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়, তার মূল কথা হলো অর্থ নিয়ন্ত্রণ নীতি (Monitory policy) এবং কর ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত নীতি বা (Fiscal Policy) বুর্জোয়া অর্থনীতিকে অর্থ নিয়ন্ত্রণ নীতি বা ফিসকেল নীতি অনেক সংকট থেকে উদ্ধার করলেও, কড়া হাতে অর্থনীতিক নীতি প্রয়োগ করে বহু পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচানো হচ্ছে। সংকট মোচন আর কাম্য অবস্থা অর্জন এক কথা নয়। কাম্য অবস্থা বলতে যদি বুঝায় সকলের জন্য ধন বণ্টনে অসাম্য দূর করা কিংবা সমাজের সার্বিক মঙ্গলকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাওয়া। তাহলে এই আর্থিক ও ফিসক্যাল নীতি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই সব পলিসিগুলি কিছু আংশিক পদক্ষেপ মাত্র এবং আংশিক পদক্ষেপগুলি অর্থনীতিকে কাম্য অবস্থায় বা স্থিতিশীল অবস্থায়ও নিয়ে যেতে পারে না। 


সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কথা বলে উল্লেখিত পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকরা পুঁজিবাদের মধ্য দিয়েই যখন জনগণের সমস্যা সমাধানের পথ দেখান বাস্তবে পুঁজিবাদ তখন একচেটিয়া পুঁজি নিয়ন্ত্রিত (Monopoly Capital), যে একচেটিয়া পুঁজিবাদ জনগণের সমস্যা সমাধানের কোন উপায়ই খোলা রাখেনি। এমনকি উৎপাদনের উপকরণগুলির বিকাশ ঘটাবার পথেও বাধা হিসাবে কাজ করে। আজকের পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদ সামান্য কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল এবং ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি সমগ্র পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই একচেটিয়া পুঁজি যে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের বাধা হয়ে কাজ করে উৎপাদনের উপকরণগুলিকে পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগাতে তা অক্ষম মার্কিন ও উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলিতে একটি বিরাট সংখ্যক লোক বেকার থাকে একই সঙ্গে কারাখানাগুলির উৎপাদন ক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদনের কাজে লাগানোই হয় না। ঐসব অর্থনীতিতে উপকরণগত উৎপাদনশীলতা শূন্যের কোঠায়। 


উপকরণগত উৎপাদনশীলতা শূন্যের কোঠায় মুনাফার গতি হ্রাসমান তবুও প্রতিহত করা হচ্ছে তার কারণ ফাটকাবাজি। পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ হল ফাটকাবাজি। উৎপাদিকা শক্তির বিকল্প ঘটানোর ক্ষমতা একচেটিয়া পুঁজির যত কমছে, ততই অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য সপে দেওয়া হচ্ছে ফাটকাবাজির হাতে। ফাটকাবাজদের বদৌলতে ফেপে উঠছে আন্তজার্তিক ব্যাংক ব্যবসা। কর্পোরেট সেক্টরে ধার করা টাকা দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে নতুন সম্পত্তি কেনা বা কেনানোর দালালি করার প্রবণতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানেও দেখা দিয়েছে। ধার করা টাকা ঢুকছে শেয়ারবাজারে, জমির বাজারে, বিদেশি মুদ্রার বাজারে। ধার করা টাকা উৎপাদনে লগ্নি না হওয়ায় ব্যাংকগুলির পক্ষে তা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থায় পতিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মহামন্দা পরবর্তীকালে পুঁজিবাদের সাধারণ সংকটের অংশ হিসাবে ২০০৮ সালে সূচিত বৃহত্তম ও গভীরতম বৈশ্বিক মন্দা থেকে পরিত্রাণ পেতে সাম্রাজ্যবাদীরা উদ্ধার ও উদ্দীপক কর্মসূচি কৃচ্ছ্রতাসাধনের কর্মসূচি ইত্যাদি গ্রহণ করে। সংকটের মূল কারণকে আড়াল করে সংকটের বোঝা আরও বেশি বেশি করে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের অর্থে ১০ ট্রিলিয়ন (১০ লক্ষ কোটি) ডলারের বেশি ব্যয় করে একচেটিয়া ও লগ্নিপুঁজির স্বার্থরক্ষকারী ব্যাংক, আর্থিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান উদ্ধার কল্পে উদ্ধার কর্মসূচি, চাঙ্গাকরণ কর্মসূচি, পরিমাণগত সহজীকরণের কর্মসূচি, কৃচ্ছ্রতাসাধনের কর্মসূচি ইত্যাদি গ্রহণ করে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এই সংকট ৮ বছরে পড়লেও তা থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়। যে অর্থনীতি উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটায় না, কিন্তু একচেটিয়ার মুনাফার হার অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করে তার পরিণতি কী হতে পারে বর্তমান মার্কিন বা ইউরোপীয় অর্থনীতি তার প্রকৃত উদাহরণ।

 

একক পরাশক্তি ও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু প্রবৃদ্ধি ও চাকুরির সংস্থান দেখালেও কার্যত তা গভীর সংকট ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। উৎপাদনমূলক প্রকৃত অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ না হয়ে আর্থিক বাজার স্টক ও শেয়ার বাজারে উঁচু মূল্যের বুদবুদ যে কোন সময় ফেটে গিয়ে ধস নামার আশংকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে জিডিপি ১৭ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি ডলার এবং ঋণের পরিমাণ ১৮ লক্ষ ২০ হাজার কোটি ডলার (২০১৫ সালের হিসাব)। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বিশ্ব জিডিপির ২৩% এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ১২% । যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ সংকট অব্যাহত আছে। আন্তর্জাতিক কর্পোরেট বিনিয়োগ স্টকের শেয়ারে আমেরিকার ফার্মের অংশ ১৯৯৯ সালে ৩৯% থেকে নেমে বর্তমানে ২৪% দাঁড়িয়েছে। বেকারত্বে প্রকৃত হার ও প্রদত্ত হার ও বাস্তব বেকার সংখ্যা মিলছে না।

 

আজ সাম্রাজ্যবাদ মন্দা থেকে বের হয়ে আসার জন্য বাজার ও প্রভাব বলয় পুর্ণবণ্টনের লক্ষ্যে আগ্রাসী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাজার ও প্রভাব বলয় পূর্ণবণ্টন নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়ে মুদ্রাযুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী কার্যকর তিন মৌলিক দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়ে বস্তুগত বিপ্লবী পরিস্থিতি আরও বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব তীব্রতর হওয়ায় আন্দোলন সংগ্রাম, ধর্মঘট, সাধারণ ধর্মঘট বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব তীব্রতর হওয়ায় এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের আন্দোলন সংগ্রাম কোথাও কোথাও সশস্ত্র সংগ্রাম অগ্রসর হয়ে চলেছে। ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উপজাত আজকের পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী এই বিশ্ব ব্যবস্থার কারণেই জনগণের সমগ্র দুনিয়াব্যাপী এই দুর্ভোগ দুর্যোগ। এই সব মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা। বিপ্লবোত্তর সমাজগুলির ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েই সমাজতন্ত্রের নিকটই আবার যেতে হবে। কারণ সমাজতন্ত্রের বিকল্প সমাজতন্ত্রই অর্থাৎ যৌথ মালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা।

সম্পর্কিত খবর

;