বিল্লাল বিন কাশেম:
এক সময়ের পল্লী জীবন মানেই ছিল প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা নির্ভেজাল, সহজ-সরল এক জীবনের প্রতিচ্ছবি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যে আমরা যে পল্লী সমাজের পরিচয় পাই, তা ছিল আবেগময় সম্পর্ক, পারস্পরিক নির্ভরতা, কুয়াশায় মোড়ানো ভোর আর নদী পাড়ের এক বিকেল। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই সমাজ প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে গ্রামীণ সমাজের চেহারা, পরিবর্তিত হয়েছে জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের অভিব্যক্তি।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিবর্তন কি কেবল উন্নতির প্রতীক, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু অস্পষ্ট বেদনা ও অসমাপ্ত স্বপ্ন?
আধুনিকতার ছোঁয়া ও গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নয়ন
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিকাঠামোতে বিপুল উন্নয়ন হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ, টিউবওয়েল, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট। অনেক গ্রামে এখন ছোট ছোট মার্কেট, পাকা ঘরবাড়ি, সোলার প্যানেল এমনকি সিসিটিভি ক্যামেরাও দেখা যায়। সরকার ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বদলে দিয়েছে গ্রামবাংলার অবয়ব।
শরৎচন্দ্রের সময়ে যেখানে কাঁচা পথ ধরে গরুর গাড়িতে চলতো যাত্রা, সেখানে এখন মোটরসাইকেল, রিকশাভ্যান, এমনকি প্রাইভেট কারও চলছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটেছে, নারীশিক্ষা বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে। এসবই নিঃসন্দেহে পজিটিভ দিক।
আধা-সম্পন্ন উন্নয়ন: অসমাপ্ত স্বপ্নের গ্রাম
তবে বাস্তবতা হলো—এই উন্নয়ন সবক্ষেত্রে পরিপূর্ণ নয়। গ্রামীণ সমাজে যেসব পরিবর্তন এসেছে, তা অনেক সময়ই অসম্পূর্ণ ও বৈষম্যমূলক। অনেকে পাকা বাড়ি গড়েছেন, কিন্তু অর্থের অভাবে তা শেষ করতে পারেননি। ইটের দেয়াল তোলা হলেও ছাদে টিন, জানালায় গ্রিল নেই, ফ্লোরে সিমেন্ট পড়ানো হয়নি। ঘরের ভেতরে নেই পর্যাপ্ত আসবাব, নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
অনেক পরিবার বড় ঋণ করে আধুনিকতা দেখাতে গিয়ে দারিদ্র্যর ফাঁদে পড়েছে। ছেলেমেয়ের বিয়েতে, বাড়ি তৈরিতে কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টায় বিক্রি করে ফেলেছে জমিজমা। ফলে এক ধরনের 'চাপাবাজ উন্নয়ন' গ্রামে দেখা দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য বাহ্যিক সৌন্দর্য, অন্তর্নিহিত স্থায়িত্ব নয়।
গ্রামীণ জীবনের মূল্যবোধে পরিবর্তন
শরৎচন্দ্র যে আন্তরিক, সম্পর্কনির্ভর, সহানুভূতিশীল পল্লী সমাজের কথা বলেছিলেন, তা আজকের আধুনিক গ্রামে খুঁজে পাওয়া ভার। আগে যেখানে প্রতিবেশীর বিপদে সবাই ছুটে যেত, এখন সেখানে ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে।
অনেক গ্রামে এখন ‘যার যার ঘর, তার তার ভুবন’ ধরনের এক মানসিকতা কাজ করে। প্রযুক্তির প্রভাবে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন দূরত্ব। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও আজ স্মার্টফোনের দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছে, মাঠে খেলার বদলে তারা ব্যস্ত ভিডিও গেমে।
কৃষি ও জীবিকার বৈচিত্র্য
গ্রামের মানুষ একসময় প্রধানত কৃষিকাজেই নিয়োজিত থাকতেন। এখন নানা পেশার সংযোগ ঘটেছে। কেউ কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ গার্মেন্টস বা বিদেশে কাজ করছেন। যদিও এটি গ্রামীণ জীবনে বৈচিত্র্য এনেছে, তবে কৃষি এখন অবহেলিত। চাষের জমি কমছে, কৃষিকাজে আগ্রহ কমছে, ফলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, টেকসই কৃষির অভাবে অনেক গ্রামীণ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বন্যা, খরা কিংবা পণ্যের দাম পড়ার মতো প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রামীণ জীবনে ঝুঁকি তৈরি করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটলেও তা এখনও সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়।
নারীর অবস্থান ও সচেতনতা
একটা সময় গ্রামের নারীরা ঘরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করতেন। এখন অনেক নারী বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, সেলাই কাজ, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের সচেতনতা ও সামাজিক অবস্থান আগের তুলনায় ভালো হয়েছে, তবে এখানেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ।
অধিকাংশ নারী এখনও সম্পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা পান না। স্বামীর বা পরিবারের উপর নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে। অনেক সময় প্রথাগত মানসিকতা নারীর অগ্রগতিতে বাধা দেয়। ফলে নারীর উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকেছে।
সংস্কৃতির পরিবর্তন ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব
আধুনিকতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে গ্রামের সংস্কৃতির উপর। আগে ছিল গ্রাম্য নাটক, যাত্রা, পালাগান, বৈঠকি গান—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ। এখন এগুলো বিলুপ্তপ্রায়।
এর বদলে এসেছে ইউটিউব, ফেসবুক, হিন্দি সিরিয়াল, কিংবা বিদেশি ধারার বিনোদন। একদিকে এটি নতুন দিগন্ত খুলেছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও উৎসবের চর্চা। ফলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
গ্রামীণ সমাজে আধুনিকতার ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতাও বেড়েছে। মানুষ ভোট দেয়, অধিকার চায়, রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন দাবি করে। কিন্তু একইসঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির দলাদলি, আধিপত্য বিস্তার, পেশিশক্তির ব্যবহারও বেড়েছে।
সামাজিকভাবে গ্রামে এখন ধনী-গরিবের ব্যবধান বেড়েছে। সমাজে অদৃশ্যভাবে দুই শ্রেণি গড়ে উঠছে—যারা উন্নয়নের সুযোগ পেয়েছে এবং যারা এখনও পিছিয়ে আছে।
শেষ কথা: পুনরায় ভাবনা জরুরি
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ সমাজের রূপ পাল্টে গেছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু এই পরিবর্তনকে আমরা কতটা মানবিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালনা করতে পেরেছি—সেটিই বড় প্রশ্ন। শুধু রাস্তা, ঘরবাড়ি কিংবা মোবাইল টাওয়ার নয়, দরকার অন্তর্নিহিত সামাজিক উন্নয়ন, মানসিক পরিবর্তন এবং ঐতিহ্য-সংরক্ষণ।
আমাদের উচিত হবে এমন এক পল্লী সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়ন হবে পূর্ণাঙ্গ, সবাইকে নিয়ে। শরৎচন্দ্রের মতো আন্তরিক সম্পর্ক থাকবে, আবার আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধাও থাকবে। গ্রামের মানুষ তখন কেবল আধুনিক জীবনধারার বাহক নয়, বরং একটি টেকসই, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজের রূপকার হয়ে উঠবে।
-লেখক: কবি ও কথা সাহিত্যিক।
bbqif1983@gmail.com
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments