থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত অঞ্চলে অনেকটা শান্তি ফিরে এসেছে

প্রকাশ : 29 Jul 2025
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত অঞ্চলে অনেকটা শান্তি ফিরে এসেছে

সামসুল আলম সজ্জন: দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মধ্যে পাঁচ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) আলোচনায় বসেছেন বিবদমান দুই দেশের সামরিক কমান্ডারগণ। এর ফলে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা ফিরে আসতে শুরু করেছে এবং তাদের বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চলে অনেকটা শান্তি ফিরে এসেছে।


থাই এবং কম্বোডিয়ার নেতারা গতকাল সোমবার (২৮ জুলাই) মালয়েশিয়ায় শান্তি আলোচনার পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাদের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত বন্ধ করার জন্য একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হন। চলমান সংঘাতে উভয় দেশে কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন উভয় দেশের ৩০০,০০০ এরও বেশি নাগরিক ।


মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের পুত্রজায়া শহরে অবস্থিত বাসভবনে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। থাই ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচাইয়াচাই ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত এর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় দায়িত্বরত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রাষ্ট্রদূতেরাও। আলোচনা শেষে আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা দেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘অবিলম্বে শর্তহীন’ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন।


সে সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সোমবার মালয়েশিয়ার সময় রাত ১২টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। আর আজ মঙ্গলবার আবার আলোচনায় বসবে দুই দেশের সামরিক বাহিনী।


বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে মঙ্গলবার ভোরে কমপক্ষে পাঁচটি স্থানে কম্বোডিয়ান সেনারা হামলা চালিয়েছে, যা মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির স্পষ্টত লঙ্ঘন।


প্রতিরক্ষামন্ত্রী টি সেইহার এক বিবৃতি অনুসারে, কম্বোডিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে জোর দিয়ে বলেছে যে তার সেনারা মধ্যরাত থেকে যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে চলেছে এবং তা বজায় রাখছে।


এখন পর্যন্ত আলোচনায় থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় অঞ্চলের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বদানকারী মেজর জেনারেল উইনথাই সুভারি, যিনি সংঘাতের সময় সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ের সম্মুখীন সীমান্তের অংশটি তদারকি করেন, জানিয়েছেন, সীমান্তে আলোচনারত কমান্ডাররা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে, যেকোনো সৈন্য চলাচল বন্ধ করতে এবং আহত ও মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার সুবিধার্থে সম্মত হয়েছেন।


"যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিটি পক্ষ চারজনের একটি সমন্বয়কারী দল গঠন করবে," উইনথাই আরো জানান।


কম্বোডিয়ার জাতীয় পরিষদের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমিশনের মহাপরিচালক লিম মেনঘোর বলেন যে, উভয় সেনাবাহিনী তাদের বিতর্কিত সীমান্তে আরো সেনা মোতায়েনের বিষয়ে একমত হয়েছে। এবং পাশাপাশি তিনি যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দিয়েছেন। তিনি রয়টার্সকে আরো বলেন, "গতকালের বৈঠকের সমস্ত শর্তাবলী এবং চুক্তি পর্যবেক্ষণ করার এটাই মূল চাবিকাঠি।"


ব্যাংককে, থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই বলেছেন যে তার সরকার কম্বোডিয়ার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে মালয়েশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে—তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় শান্তি ফিরে এসেছে।


থাই এবং কম্বোডিয়ান সৈন্যরা যে সীমান্তে এখনো মোতায়েন রয়েছেন সেই ফ্রন্টলাইন থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার (২০ মাইল) দূরে অবস্থিত থাইল্যান্ডের সিসাকেট প্রদেশের কান্থারালাক জেলায় আজ মঙ্গলবার যানবাহন চলাচল এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।


৫১ বছর বয়সী চাইয়া ফুমজারোয়েন বলেন, খবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা শোনার পর আজ মঙ্গলবার সকালে তিনি তার দোকান খুলতে শহরে ফিরে আসেন ।


"আমি খুবই খুশি যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে," তিনি বলেন। "যদি তারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তাহলে আমাদের অর্থ উপার্জনের আর কোন সুযোগ থাকবে না।"


কম্বোডিয়ার ওডার মিঞ্চে প্রদেশে, ৬৩ বছর বয়সী লি কিম ইং যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা শোনার পর একটি অস্থায়ী তেরপল আশ্রয়ের সামনে বসে নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।


"তাই, যদি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে যে সমস্ত শরণার্থীদের বাড়ি ফিরে যাওয়া নিরাপদ, আমি অবিলম্বে ফিরে আসব," তিনি বলেন।


দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এই দুই প্রতিবেশী তাদের বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধে লিপ্ত রয়েছে। এই বছর মে মাসের শেষের দিকে এক সংঘর্ষে একজন কম্বোডিয়ান সৈন্য নিহত হওয়ার পর থেকে বর্তমান পর্যায়ের সংঘাতের সূত্রপাত, যার ফলে উভয় পক্ষই সীমান্ত এলাকায় সৈন্য জড়ো করে এবং একটি ভয়াভয় কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়।


মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যাহত চাপের মুখে সোমবারের শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে থাই এবং কম্বোডিয়ান নেতাদের সতর্ক করা হয়েছিল যে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বাণিজ্য আলোচনা অগ্রসর হবে না।


থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া তাদের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পণ্যের উপর ৩৬% শুল্কের সম্মুখীন। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর, ট্রাম্প বলেছেন যে তিনি উভয় নেতার সাথে কথা বলেছেন এবং তার বাণিজ্য দলকে শুল্ক আলোচনা পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন।


মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী পিচাই চুনহাওয়াজিরা বলেছেন যে ওয়াশিংটনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা ১ আগস্টের আগে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং দেশটির উপর মার্কিন শুল্ক ৩৬% এর মত এত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সম্পর্কিত খবর

;