দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়

প্রকাশ : 02 Jun 2025
দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়

নাসরীন জাহান লিপি:


রাজধানীর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাব্বি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গিয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিতে হয়। থানার কর্মকর্তারা তাকে ‘সহজে কাজ করে দেওয়ার’ কথা বলে দুই হাজার টাকা ঘুষ চায়। 

রাব্বি এযুগের মানুষ। সিস্টেমের দুর্নীতি মেনে নিতে চাননি। দুর্নীতি প্রতিরোধে রাব্বি মৌখিক অভিযোগ করেন ৯৯৯-এ এবং এর পাশাপাশি পুলিশের অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্মে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। প্রতিরোধের ব্যবস্থা সত্যিই হয়েছিল। থানার এক সিনিয়র কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিনা ঘুষে ক্লিয়ারেন্স দেন এবং দায়ী কনস্টেবলকে মৌখিকভাবে সতর্ক করেন। রাব্বি বলছিলেন, দারুণ একটা শিক্ষা হয়েছে আমার।

সচেতনতা ও আইনি ব্যবস্থা জানলে সাধারণ নাগরিকও ঘুষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেন। এক রাব্বিকে দিয়ে কতটুকুই বা শিখব? তাহলে চলুন, রিনা বেগমের কথা শুনি। সিলেটের রিন বেগম কয়েক বছর ধরে একটি ছোটো জমির খতিয়ান ও পর্চা নিতে ভূমি অফিসে ঘুরেছেন। প্রতিবারই দালাল চেয়ে বসতো পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা। মন খারাপ করে ভাবতেন, এই দুষ্টুচক্রের হাত থেকে কী রেহাই নেই? রেহাই পেলেন রিনা বেগম। ছেলের সাহায্য নিয়ে ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে আবেদন করেন। মাত্র ১০০ টাকা ফি দিয়ে তিনি নিজেই পর্চা সংগ্রহ করেন। রিনা বেগম বললেন, আমি কী শিখেছি শুনবেন? ডিজিটাল সেবা জানা থাকলে সাধারণ মানুষ দালাল বা ঘুষ ছাড়াই সেবা পেতে পারে। অর্থাৎ দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছেন অনেকেই। কিশোরগঞ্জের এক কলেজের প্রভাষক সাইফুল ইসলামের সাহসিকতার গল্প শুনেছি। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েকজন অযোগ্য ব্যক্তিকে ঘুষের বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে কাগজপত্র সংগ্রহ করে সাংবাদিকদের সহযোগিতায় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে সেই এমপিও বাতিল হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গাড়ি চালানোর সময় পুলিশ এক তরুণকে ট্র্যাফিক আইন ভাঙার অভিযোগে জরিমানা দিতে বললে তিনি রসিদ ছাড়া টাকা দেবেন না, প্রয়োজনে কোর্টে ফাইন দেবেন বলে জানান। আসলে, যদি মানুষ ঘুষ দিতে না চায়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা ঠেকানো সম্ভব হয়। এই ছোটো ছোটো উদাহরণগুলো বড়ো সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি গড়তে পারে। দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সাহসী উদ্যোগও বড়ো ভূমিকা রাখে। দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সুশাসনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক অবক্ষয়, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং জনগণের আস্থার সংকট সৃষ্টি করে। এ লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত সততা সংগঠন দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। তারা সেমিনার, আলোচনা সভা, নাটক, বিতর্ক, প্রবন্ধ লিখনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুদক)  স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গণসচেতনতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দুর্নীতি বিরোধী র‌্যালি, মানববন্ধন, পোস্টার, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি বিরোধী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। 

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্যমান আইনি দুর্বলতা।  মানি লন্ডারিং আইন সংশোধন করে ২৭টি অপরাধ চিহ্নিত করা হলেও, দুদককে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থ পাচারের তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্যান্য অর্থ পাচারের অপরাধে দুদক সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না। দুর্নীতির মামলায় রাজনৈতিক চাপ ও পক্ষপাতিত্ব তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আর জনসচেতনতার অভাব তো রয়েছেই। অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে ভয় পান বা জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে।

পি কে হালদারের কথা মনে আছে আমাদের। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে আলোচিত একটি ঘটনা হলো প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারের অর্থ লোপাট কেলেঙ্কারি। পিপলস লিজিং ও বিএফআইসিসহ চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে আইন ভেঙে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট করে। এমন বড়োসড়ো অর্থপাচার দীর্ঘ সময় ধরে চললেও, প্রথমদিকে কেউ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অর্থ লোপাটের অভিযোগের অনুসন্ধান করছিল, সে সময়ই পি কে হালদার ইমিগ্রেশন বা গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি এড়িয়ে পালিয়ে যান, যা দুদক ও ব্যাংকিং খাতের নজরদারির কার্যকারিতা ও ‘দুর্নীতি করতে প্রশাসনিক সহযোগিতা বা দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রশাসনিক গাফিলতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি যেসব প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছিলেন, তা সম্ভবত রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া কঠিন হতো। কারণ, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক) অনেক ক্ষেত্রে নীরব থেকেছে বলে অভিযোগ আছে। 

দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড়ো বাধা হলেও, সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘দুর্নীতি’ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পি কে হালদারের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসিত বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। 

অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্র সংস্কারের অনেকগুলো উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম আলোচিত ও প্রতীক্ষিত ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার প্রতিবেদন। ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার কমিশন দুর্নীতি প্রতিরোধে ৪৭টির মতো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। কিছু প্রস্তাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য, আবার কিছু প্রস্তাবে দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে শক্তিশালীকরণ, দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, দুদককে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তকরণের প্রস্তাব দিয়ে কমিশন এসবের জন্য উপযুক্ত নীতি তৈরি ও তার বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। সরকারের কার্যক্রমে নাগরিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য তথ্য শেয়ারের সুপারিশ করেছে। সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ে অফিস স্থাপন, টাস্কফোর্স গঠন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্তকারী দল গঠনের প্রস্তাব সত্যিই প্রশংসনীয়। কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমি তৈরির সুপারিশ অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে। এসব সংস্কার প্রস্তাব জাতিসংঘের দুর্নীতি দমন কনভেনশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ভবিষ্যতে ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের বা ওজিপি (দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশের সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বহুপক্ষীয় সংস্থা) অংশীদারত্ব বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ যদি ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপে স্বাক্ষর করতে পারে, তাহলে অন্যান্য স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশকেও বিভিন্ন কার্যকলাপে পুরোপুরি স্বচ্ছতা আনতে হবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাঠামোগত অনেক পরিবর্তন আসবে এবং বাংলাদেশের দুর্নীতি দমনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে।

#

-লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর।

পিআইডি ফিচার



সম্পর্কিত খবর

;