কর্মসংস্থান অধিদপ্তর কেন প্রয়োজন?

প্রকাশ : 30 Apr 2025
কর্মসংস্থান অধিদপ্তর কেন প্রয়োজন?

মোহাম্মদ কুদ্দুছ আলী সরকারঃ 


Korea Employment Information Service (KEIS) হলো একটি সরকারি সংস্থা যা দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বেকারত্ব কমানোর কৌশল প্রণয়ন এবং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করে। KEIS একটি ইন্টেলিজেন্ট ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস যা ‘JobCare’ নামেও পরিচিত। এই সেবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিগ ডেটাভিত্তিক (Big Data), যা সেবাপ্রার্থীদের পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে সহায়তা প্রদান করে। এই সংস্থার মূল কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ, চাকরির তথ্য সংগ্রহ ও প্রদান, ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও পরামর্শ প্রদান, কর্মসংস্থান সম্পর্কিত সরকারি নীতির বাস্তবায়ন এবং চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন। KEIS মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ডাটাবেইজ ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত পরিষেবাগুলো সহজলভ্য করে তুলতে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে কাজ করে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করে থাকে। সরকার Korea Employment Agency for Persons with Disabilities (KEAD)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করে, যাতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ স্বনির্ভর হয়ে জীবন যাপন করতে পারেন।  

জাপানে Hello Work নামীয় কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র (Employment Service Cetre) রয়েছে যা জাপান সরকারের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। জাপানের প্রায় সব শহরে Hello Work অফিস রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো বেকার ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করে থাকে। Hello Work দপ্তর সে দেশের সাম্প্রতিক চাকরির প্রস্তাবগু্লোর একটি বিস্তৃত ডাটাবেইজ বজায় রাখে যা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি সহজলভ্য তথ্যভাণ্ডার হিসেবে গড়ে উঠেছে। এ দপ্তর চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জোরদার সহায়তা, নিয়োগ সাক্ষাৎকার প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার সাথে সংযোগ, মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ (Consultancy), প্রশিক্ষণ প্রদান, বেকারত্ব ভাতা (Unemployment Insurance) প্রদান এবং যোগ্যতা পরীক্ষা (Aptitude Test) নিয়ে থাকে। Hello Work জাপানে বসবাসকারী বিদেশী বাসিন্দাদের জাপানি ভাষায় দক্ষতা উন্নয়নেরও পরামর্শ দেয়। এছাড়াও জাপানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হয়। Hello Work, Vocational Rehabilitation Centers, এবং অন্যান্য বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের চাকরির সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা হয়।    

American Job Centers (AJC) হলো যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র, যা চাকরিপ্রার্থীদের কর্ম অনুসন্ধানে সহায়তা করে এবং চাকরিদাতাদের জন্য উপযুক্ত কর্মী খুঁজতে সহায়তা করে। এই কেন্দ্রগুলো U.S. Department of Labour-এর অধীনে পরিচালিত হয়। American Job Centers চাকরিপ্রার্থীদের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় চাকরির তালিকা প্রণয়ন, কর্মজীবন সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান ও পরিকল্পনা গ্রহণ, বেকারত্ব ভাতা (Unemployment Insurance) প্রদান সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ ও সহায়তা প্রদান, চাকরি প্রাপ্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন ফ্রি ও স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করা,  চাকরিদাতাদের সহায়তা প্রদান, চাকরিপ্রার্থীদের বিনামূল্যে রিজ্যুমে  তৈরি, এবং চাকরির ইন্টারভিউ-তে ভাল করার প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সহায়তা দেয়া হয়। American Job Centers (AJC)-এর পাশাপাশি কিছু বিশেষ সংস্থা ও প্রোগ্রাম রয়েছে, যা প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরি পেতে, এবং কর্মজীবনে সফল হতে সহায়তা করে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরণের কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র (Employment Service Cetre) রয়েছে। এই সেবা কেন্দ্রগুলো চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের সহায়তা প্রদান করাসহ এ সংক্রান্ত নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। এ সকল দেশের কর্মসংস্থান সেবা সম্পর্কিত উত্তম-চর্চা (Best Practice) অনুসরণ করে বাংলাদেশেও একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র সৃজন করা এখন সময়ের দাবি।    

বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরো (বিবিএস)-এর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরীপ ২০২৪ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনুযায়ী বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৬৫ বা তদুর্ধ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১৫ লক্ষ; এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লক্ষ। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৫৮ লক্ষ এবং মহিলা ২ কোটি ১৭ লক্ষ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮.৪ লক্ষ এবং বৈদেশিক কর্মে ৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষের শিক্ষা, পেশাগত মান ও সামাজিক অবস্থানের বৈচিত্র্য এবং পক্ষান্তরে কর্মের চাহিদা ও সুযোগের বৈচিত্র্য এত বেশি যে, কর্মক্ষম ব্যক্তিদের পক্ষে উপযুক্ত কর্ম অনুসন্ধান ও সেই কর্মের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

দেশে সরকারি-বেসরকারি ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে; তাদের চাকরিযোগ্য করে তোলা বা চাকরি পাবার পথ দেখিয়ে দেওয়া বা কাউন্সেলিং করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা দেশে নেই বললেই চলে। বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার এ সমস্ত কার্যক্রম সমন্বয় সাধনের জন্য নিবেদিত ও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাছাড়াও প্রতিবছর শ্রম বাজারে ট্রেডভিত্তিক শ্রমিকের চাহিদা এবং সরবরাহের বিষয়ে কোনো সুসংগঠিত তথ্যভাণ্ডার ও গবেষণা নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক/শ্রমিকদের কি সংখ্যক নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তৈরি এবং তা মনিটরিং এর জন্য কোনো দপ্তর/সংস্থা নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ কর্মের বাহিরে থেকে যাওয়ায় প্রশিক্ষণ বাবদ সরকারি অর্থের সদ্ব্যব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সম্পর্কিত একটি দপ্তর গঠন করা হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল যোগে কর্মসংস্থান পুল গঠন করে শ্রম বাজারে নিয়োগ পাওয়ার তথ্যটি নিশ্চিত করা বা মনিটরিং করা সম্ভব হবে। এতে কর্মক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা সহজতর হবে। কর্মসংস্থান বিষয়ে নীতি নির্ধারণ, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মে নিয়োগের উপায় নির্ধারণের উদ্দেশ্যে একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র গঠন করা অতীব জরুরী।      

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জোয়ারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ও অটোমেশনের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশেও শিল্প ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে, মানুষের কাজ দখল করে নেবে উন্নত মানের মেশিন ও রোবট, ফলে শিল্পক্ষেত্রে অনেক লোক তাদের কর্ম হারাবে। সম্প্রতি a2i এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৬০ শতাংশ, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পে ৪০ শতাংশ, চামড়া ও জুতা শিল্পে ৩৫ শতাংশ এবং সেবা শিল্পে ২০ শতাংশ লোক কর্মহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই টিকে থাকবে। জানা যায়, আমাদের দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল মাত্র ১৪ শতাংশ; কিন্তু উন্নত বিশ্বে কারিগরিভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। তাই আমাদের এখন থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে এবং সেই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি দিক থেকে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের মাধ্যমে শ্রম বাজারের চাহিদার তথ্যাদি সংকলন ও বিশ্লেষণ করে দক্ষতা সমন্বয়ের মাধ্যমে শ্রম বাজারের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা নিশ্চিতকরণ, শ্রম বাজারে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা এবং দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্ম প্রাপ্তিতে সহায়ক ভূমিকা পালন, একাডেমিয়ার সাথে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ইনকিউবেশন, স্টার্ট-আপ সেবা প্রদান এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনয়নসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

আমরা জানি দক্ষিণ কোরিয়ায় AI সহযোগী KEIS সিস্টেম সফলভাবে চলমান রয়েছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বর্তমানে এ ধরণের AI Assistant কর্মসংস্থান সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আমাদেরকেও AI সহযোগী কর্মসংস্থান সহায়তা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এই সিস্টেম একাধিক কাজ দ্রুত ও সঠিকভাবে করতে পারে, ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি নানা দিক থেকে উপযোগী হতে পারে যেমন,   

১। AI চাকরির প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ অনুযায়ী সঠিক চাকরি খোঁজা যাবে;

২। AI রিজ্যুমে বা কভার লেটার তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে, যেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য উপযুক্ত টেমপ্লেট ও ফরমেট ব্যবহার করা হবে;

৩। AI চাকরিপ্রার্থীর জন্য নিয়োগ পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে এবং যথাযথভাবে উত্তর দেওয়ার কাজে সহায়তা করতে পারে; 

৪। AI প্ল্যাটফর্ম কর্মজীবন সম্পর্কিত স্কিলের উপর কোর্স সাজেস্ট করতে পারে এবং শেখার জন্য রিসোর্স প্রস্তাব করতে পারে;

৫। AI বিষয়ভিত্তিক ক্যারিয়ার পরামর্শ দিতে পারে, যেমন প্রার্থীর কোন ক্ষেত্রে ভালো সুযোগ রয়েছে, কোন স্কিলগুলোর ক্ষেত্রে অধিকতর উন্নতির সুযোগ রয়েছে ইত্যাদি।  

Allocation of Business 2024 (সংশোধিত) অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৩৩টি দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬/৭টি দায়িত্ব কর্মসংস্থান সম্পর্কিত। তন্মধ্যে ১৭নং ক্রমিকে উল্লেখ আছে  ‘Matters Relating to Labour Employment, Training and Apprenticeship’ অর্থাৎ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষানবিশির দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।  বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ২৭৪ ধারা হতে ২৮২ ধারা পর্যন্ত শিক্ষাধীনতা (Apprenticeship) সম্পর্কিত। শিক্ষাধীনতার প্রয়োগ সম্পর্কিত ২৭৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান দুই বৎসরের অধিককাল যাবৎ চালু রয়েছে এবং যাহাতে অন্যূন পঞ্চাশ জন শ্রমিক রয়েছে সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই অধ্যায় প্রযোজ্য হবে। এই শিক্ষাধীনতা বাস্তবায়নযোগ্য শত শত শিল্প-কারখানা বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে রয়েছে, কিন্তু এই আইনী বাধ্যবাধকতার বাস্তবায়ন খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শিক্ষাধীনতা কর্মসূচি বাস্তবায়নে মালিকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র ধরণের কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠন করা হলে এ দপ্তর শিক্ষাধীনতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সমূহ অবদান রাখতে পারবে।  

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (DEMO) তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই দপ্তরের কার্যক্রম অভিবাসী কর্মী কেন্দ্রিক বিধায় দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জেলাতে স্থাপিত শিল্প কারখানাতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের কল্যাণ সংক্রান্ত বিষয়ে মনিটরিং এর জন্য কোনো দপ্তর জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে নেই। যার ফলে দেশীয় শিল্প কারখানাসমূহে নিয়োগের ক্ষেত্রে উত্তম-চর্চা নিশ্চিত করা দূরুহ কাজ। কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠন করা হলে জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে।  

প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম বাজার ছাড়াও দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিশাল শ্রম বাজার যেমন- গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল রেস্তোরা শ্রমিক ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু এই শ্রেণির শ্রমিকদের অদ্যাবধি উল্লেখযোগ্য কোনো ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়নি বিধায় তাদের কর্মসংস্থান ও কল্যাণ বিষয়ে সরকারকে নীতি নির্ধারণ ও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা দুরূহ বিষয় হয়ে দাড়ায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের শ্রেণিবিন্যাস করে ডাটাবেজ প্রস্তুতকরণ, রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় আনয়ন এবং তাদেরকে কর্মসংস্থানের মূল স্রোতধারায় আনয়নে কার্যক্রম গ্রহণ সৃজিতব্য কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের কার্যাবলিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।   

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থান একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরো (বিবিএস)-এর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরীপ ২০২৪ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনুযায়ী দেশে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৫ লাখ ৫০ হাজার। যদিও প্রকৃত বিবেচনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হলো ১২ কোটি ১৫ লক্ষ। প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, এই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম বাজারের শ্রেণিবিন্যাসকৃত পূর্ণাংগ তথ্য কোনো প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করে কিনা সন্দেহ আছে। শ্রম আইনে বাধ্যবাধকতা থাকা সত্বেও শিক্ষাধীনতা (Apprenticeship) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তিবর্গ, বয়স্ক ও নারী, এবং বিদেশ হতে ফেরত আসা অভিবাসীদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি, প্রশিক্ষণ প্রদান, এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করাও কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্রেরই কাজ। চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা, বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্নভাবে গড়ে তোলা,  চাহিদা অনুযায়ী যে ধরণের দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন, কর্মসংস্থান কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব, যার ফলে শ্রমবাজারের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয়। শ্রম বাজারে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা এবং শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম যেমন বেকার ভাতা প্রদান, EIS বাস্তবায়ন করাও বড় চ্যালেঞ্জ।  

নতুন চাকরির বাজারে প্রবেশকারীদের উপযুক্ত চাকরি খুঁজে পেতে সীমাহীন সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারি ও বেসরকারি চাকরির যাবতীয় তথ্য ও সেবা সহজলভ্য করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটাভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন জব পোর্টাল তৈরি করাও সময়ের দাবি। গ্রামের জনগণও যাতে সহজে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য পায়, সে জন্য মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবা মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে একটি কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র চালু হলে তা বেকারত্ব হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়ন, এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাকরির সুযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  

এহেন প্রেক্ষাপটে দেশের সুবিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয়ে নীতি নির্ধারণ, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মে নিয়োগের উপায় নির্ধারণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সেবা নিশ্চিতকরণ এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র হিসেবে ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।


-লেখক: যুগ্মসচিব (কর্মসংস্থান), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। 



সম্পর্কিত খবর

;