বিপুল সম্পদের মালিক হামিদুল্লাহ, বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ

প্রকাশ : 18 Aug 2026
বিপুল সম্পদের মালিক হামিদুল্লাহ, বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি: একসময় রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি মেসে থাকতেন বলে পরিচিত হামিদুল্লাহ। সময়ের ব্যবধানে তার বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পল্টন, মুগদা ও রামপুরার বনশ্রীতে একাধিক বাড়ি এবং নয়াপল্টনের চায়না টাওয়ারে দোকান ও অফিসসহ বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা তার রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুরানা পল্টন লেন ও শান্তিনগরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।


তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি বা ভূমি-রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


রিক্রুটিং ব্যবসায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ


অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি রপ্তানি খাতে হামিদুল্লাহ নিজের, স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়েছেন। এর মধ্যে ‘মাসুদ জামিল’, ‘বাংলাদেশ রিক্রুটিং’, ‘রাজমুকুট’, ‘সুফি আব্দুল্লাহ’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম অভিযোগে এসেছে।


তবে সরকারি তথ্যভান্ডারে অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ও কার্যক্রমের তথ্য স্পষ্টভাবে পাওয়া গেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET)-এর OEP/RAIMS তালিকায় M/S. Masud Jamil Overseas-এর লাইসেন্স নম্বর RL-1400 এবং ঠিকানা ৩৫ পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা দেখানো হয়েছে। ১৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স Active এবং মেয়াদ ২৫ জানুয়ারি ২০২৯ পর্যন্ত দেখানো হচ্ছে।


BMET-এর প্রকাশিত বিভিন্ন নথিতেও RL-1400 নম্বরের এই প্রতিষ্ঠানকে ওমান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের জন্য জনশক্তি প্রেরণের কার্যক্রমে দেখা যায়।


পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি নতুন প্রশ্ন


মাসুদ জামিল ওভারসিজকে ঘিরে অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে ওমানে কর্মরত এক বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনায় BMET কর্তৃপক্ষ ওই রিক্রুটিং এজেন্সিকে ডেকেছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে মোহাম্মদ হামিদুল্লাহর বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি অভিযোগ সম্পর্কে আগে জানতেন না বলে দাবি করেছিলেন।


এদিকে ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রবাসী ভবন ও BMET ঘিরে কথিত একটি প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে মাসুদ জামিল ওভারসিজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয় এবং অতীতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলা হয়।


মানবপাচার ও অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ


আরেকটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে BMET-এর বিভিন্ন নথি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও মানবপাচারের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে মাসুদ জামিল ওভারসিজের নামও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে কোন ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে আইনগত দায় প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।


BMET ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ


অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় BMET ও প্রবাসী ভবনকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সি গোষ্ঠী জনশক্তি রপ্তানির বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। সরকার পরিবর্তনের পরও সেই প্রভাব পুরোপুরি ভাঙেনি বলে তাদের অভিযোগ।


অভিযোগে হামিদুল্লাহসহ কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু দেশ ও বাজারে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে তারা প্রভাব বিস্তার করতেন এবং অন্য এজেন্সির জন্য সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করতেন।


তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া না গেলে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।



রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ


হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটসহ কয়েকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।


জুলাই আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।


তবে এসব সম্পর্কের প্রকৃতি, আর্থিক লেনদেন কিংবা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।


দুদকে ১১০০ কোটি টাকার অভিযোগ—তদন্তের অবস্থা স্পষ্ট নয়


হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলছে বলে আগের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।


তবে এ বিষয়ে দুদকের প্রকাশ্য ওয়েবসাইট, সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা যাচাইযোগ্য নথিতে তদন্তের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে ১১০০ কোটি টাকার অঙ্কটি অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে; এটি প্রমাণিত আত্মসাতের পরিমাণ নয়।


মালয়েশিয়া বাজার নিয়েও প্রশ্ন


মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর কার্যক্রমে হামিদুল্লাহর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার মালিকানাধীন বলে উল্লেখ করা মাসুদ জামিল ওভারসিজের নাম আসন্ন জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে সর্বশেষ সরকারি অনুমোদন বা নির্দিষ্ট কার্যাদেশের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।


সরকারি OEP-এর বর্তমান এজেন্সি তালিকায় অবশ্য RL-1400 নম্বরের মাসুদ জামিল ওভারসিজকে সক্রিয় রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে দেখানো হয়েছে।


BMET-এর ভেতরে প্রভাবের অভিযোগ


সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, BMET-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে হামিদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও প্রভাব রয়েছে। তার কর্মচারী সোলেমানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাতে BMET ভবনে আসা-যাওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


BMET-এর নিজস্ব কর্মকর্তাদের তালিকা ও দাপ্তরিক তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে। কোনো বেসরকারি ব্যক্তি নিয়মিতভাবে সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কি না, সেটি যাচাই করতে প্রশাসনিক রেকর্ড, প্রবেশ-নিবন্ধন ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা প্রয়োজন।


ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ


BMET-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার ও কর্মকর্তার দাবি, অতীতে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জনশক্তি রপ্তানির বিভিন্ন ধাপে প্রভাব বিস্তার করত। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সার্ভার-সংক্রান্ত অনিয়ম, ভুয়া চালান বা পে-অর্ডার, নির্দিষ্ট রেট নির্ধারণ এবং শ্রমিকপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায়।


একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নির্দিষ্ট কিছু দেশের শ্রমবাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরে বেশি অর্থ আদায় করা হতো। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে BMET-এর সার্ভার লগ, আর্থিক রেকর্ড, পে-অর্ডার, ছাড়পত্রের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর লেনদেনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।



হামিদুল্লাহর বক্তব্য


অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে হামিদুল্লাহ আগের প্রতিবেদনে বলেন, “আমি সেই হামিদুল্লাহ নই। রং নাম্বারে কল দিয়েছেন।”


অন্যদিকে, ২০১৮ সালে মাসুদ জামিল ওভারসিজের বিরুদ্ধে শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, তার কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি এবং প্রতিবেদকের কাছ থেকেই তিনি বিষয়টি শুনেছেন।



সম্পর্কিত খবর

;