মৃত্যু যখন ডেথপোর্ট: আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনা ও অনন্ত যাত্রার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশ : 13 Jun 2025
মৃত্যু যখন ডেথপোর্ট: আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনা ও অনন্ত যাত্রার প্রতিচ্ছবি

বিল্লাল বিন কাশেম:


আন্তর্জাতিক রুটে ভ্রমণ কোনো সহজ বিষয় নয়। পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন, লাগেজ, ফ্লাইট টাইমিং- সব কিছু মিলিয়ে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কেউ যায় ব্যবসার প্রয়োজনে, কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ আবার বেড়াতে। আরেক দল মানুষ যায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। কারো হাতে বাবা-মায়ের ওষুধ, কেউ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সন্তানের খেলনা। সব ভ্রমণের পেছনে থাকে একটি লক্ষ্য- নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো।


এই তো বেশ কিছুদিন আগেই আমি নিজেই ব্যক্তগত সফরে একাধিক বিমানে যাতায়াত করেছি। শত শত যাত্রী, কারো মুখে হাসি, কারো চোখে ক্লান্তি, কেউ জানালায় তাকিয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনায় ডুবে, আবার কেউ ব্যস্ত স্মার্টফোনে। অবশেষে সবাই নিরাপদে পৌঁছে গেছে। তখন মনে হয়েছিল- ভাগ্যবানেরা আমরা।


এই এক প্রশ্ন, যা মানুষকে থমকে দেয়। সবাই কি সত্যিই পৌঁছায় গন্তব্যে? গুজরাটের আহমেদাবাদে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা যেন সেই প্রশ্নের নির্মম উত্তর। ওই বিমানের যাত্রীদের উদ্দেশ্য, স্বপ্ন, আনন্দ- সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো এক মুহূর্তেই। তারা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। তারা পৌঁছে গেছে অনন্ত এক গন্তব্যে- ডেথপোর্টে।


সেখান থেকেই শুরু হবে তাদের অনন্ত যাত্রা। একটি যাত্রা, যার আর কোনো ফেরত নেই, নেই আর কোনো পাসপোর্ট, নেই ব্যাগেজ কিংবা চেকিং, নেই কোনো ফেরার ফ্লাইট।


আমার ভ্রমণ তো একই পথে, একই আকাশে, একই প্রযুক্তির আশ্রয়ে। তাহলে কেন আমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটেনি? অনেকে বলবে- সৌভাগ্য। কিন্তু আমি বলবো- এটা আয়ু। এই পৃথিবীতে কে কখন চলে যাবে, কে থাকবে কিছুদিন- এটা একমাত্র স্রষ্টার পরিকল্পনার মধ্যেই নিহিত। এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারবে না।


মৃত্যু এমন এক সত্য, যা আমরা জেনেও ভুলে থাকতে চাই। এই তো, আমার সফরের এক সহকর্মীর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে ঈদের ছুটিতে মামার বাড়ি গিয়েছিল। কাজিনের সঙ্গে নদীতে নেমেছিল গোসল করতে। দুজনই ভেসে গিয়েছিল, কিন্তু বেঁচে ফিরেছে একজন। এই যে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য! কেন একজন ফিরে এলো আর একজন চলে গেল? আমাদের ব্যাখ্যা আছে- স্রোত, অবস্থা, সময়। কিন্তু আসল রহস্য যে আরেকজন জানে।


স্রষ্টা নিজেই বলেছেন- “আমি প্রত্যেক প্রাণীর জীবনকাল নির্ধারণ করে দিয়েছি। এক চুলও কমবেশি হবেনা।” তাই তো, আমরা কেউ পারিনা সেই সময়ের আগে কিছু করতে। আবার এটাও বলেছেন- কোনো কোনো ক্ষেত্রে আয়ু বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মফল অনুযায়ী তা কমেও যায়।


তাহলে প্রশ্ন আসে- আমরা মানুষ কিসের লোভে জীবনের অনিশ্চিত পথে এতো জোরে ছুটছি? কেন এই অব্যর্থ সত্যকে উপেক্ষা করে, আমরা এমন ভাবে প্লান সাজাই, যেন জীবন চিরস্থায়ী?


স্রষ্টা তো স্পষ্ট বলেই দিয়েছেন- “আমি তোমাদের দুর্বল করে বানিয়েছি, অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছি।” তাহলে অহংকারের এত আয়োজন কেন? কিসের এতো দাম্ভিকতা? মানুষ তো যেন আজীবন বাঁচবে এমন মনোভাব নিয়ে পথ চলে, সম্পর্ক গড়ে, ক্ষমতা চায়, ঘৃণা পোষে, বিভাজন করে।


আসলে মানুষ অনন্তের আকাঙ্ক্ষায় সময়িক কিছু দিয়ে চিরস্থায়ী সুখ পেতে চায়। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা যদি তার সৃষ্টিকর্তার সাথে না থাকে, তবে তা ব্যর্থতায় রূপ নেয়।


যদি মানুষ সত্যিই মৃত্যুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চায়, করুক না। অস্ত্রের পেছনে শত শত বিলিয়ন খরচ করেছে। তৈরি করেছে পারমাণবিক বোমা, জৈবিক অস্ত্র, সাইবার হ্যাকিং। এক একটি অস্ত্রে ধ্বংস হতে পারে পৃথিবী বহুবার। তাহলে এবার চেষ্টা করুক এমন একটি অস্ত্র বানাতে- যা মৃত্যুকে ঠেকাবে।


যদি পারে, তাহলে সত্যিই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রজাতি প্রমাণিত হবে। তবে, এখন পর্যন্ত ইতিহাস বলছে- মানুষ মৃত্যুর মুহূর্তে কেবল নতমস্তকই হয়।


এই মৃত্যু-চিন্তা মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং তাকে আত্মসমর্পণের পথ দেখানোর জন্য। সময় থাকতে মানুষ যদি এই অনিবার্য গন্তব্যের কথা মনে রাখে, তাহলে সে ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি নিতে পারে।


জীবন তো একটা পরীক্ষার হল- এখানে সবাই পরীক্ষার্থী। কেউ কেউ পাস করবে, কেউ কেউ ফেল করবে। কিন্তু সেই ফলাফল ঘোষণা হবে, যখন পরীক্ষার সময় শেষ হবে- অর্থাৎ মৃত্যু।


গুজরাটের আহমেদাবাদের সেই বিমানবন্দরে যাত্রীরা নামার আগেই থেমে গেল সব। ঠিক তখনই বন্ধ হয়ে গেলো সব স্বপ্নের দরজা। তাদের প্রতিটি জীবনের গল্প অসমাপ্তই রয়ে গেল। তাদের পরিবার পরিজন হয়তো আজো অপেক্ষা করছে, ফোন বাজবে, খবর আসবে- কিন্তু সে ফোন আর বাজবেনা।


আমাদের উচিত এইসব দুঃখজনক ঘটনার ভেতর থেকেও শিক্ষা নেওয়া। বোঝা যে, সব কিছুই শেষ হয়ে যেতে পারে এক মুহূর্তেই।


মৃত্যু নয়, আয়ুই আমার সৌভাগ্য। আমি যদি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি, সেটি আমার দক্ষতা বা সৌভাগ্য নয়- এটা আমার আয়ু। এবং যারা পৌঁছায়নি, তাদের নিয়ে কেবল সমবেদনা নয়, তাদের জীবন থেকেও শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের সবার।


এই পৃথিবী যদি সাময়িক হয়, তাহলে চিরকালিক জীবনের কথা ভাবা উচিত। তা না হলে মৃত্যু হঠাৎ এসে আমাদের চিরস্থায়ী সব পরিকল্পনা গুঁড়িয়ে দিয়ে যাবে।


তাই, সময় থাকতে ভাবি, প্রস্তুত হই। আত্মসমর্পণ করি সেই মহান স্রষ্টার কাছে, যিনি এই জীবনের দাতা, যিনি জানেন কে কবে কোন ডেথপোর্টে অবতরণ করবে।


-লেখক: কবি, কলামিস্ট ও গণসংযোগবিদ।

bbqif1983@gmail.com

সম্পর্কিত খবর

;