​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

প্রকাশ : 13 Apr 2026
​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

মানিক লাল ঘোষ:

​বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণতালিকার শিরণি হলো পহেলা বৈশাখ। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর দিন নয়, বরং হাজার বছরের লালিত বাঙালি সংস্কৃতির এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। আজ যখন আমরা নতুন একটি বছরকে বরণ করে নিচ্ছি, তখন সময় এসেছে ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের চিনে নেওয়ার এবং আগামীর জন্য এক শান্তিময় পথনকশা তৈরি করার।


​পহেলা বৈশাখের শিকড় প্রোথিত আছে কৃষি আর অর্থনীতিতে। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী খাজনা আদায়ে বেশ জটিলতা দেখা দিত। কৃষকদের সুবিধার্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজীর পরামর্শে সৌর পঞ্জিকা এবং হিজরি ক্যালেন্ডারের সমন্বয় ঘটিয়ে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তন করেন 'ফসলি সন'। যা কালক্রমে আজকের 'বঙ্গাব্দ' বা বাংলা সনে রূপ নেয়। অর্থাৎ, এই উৎসবের জন্ম কোনো ধর্মীয় আধিপত্য থেকে নয়, বরং একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার থেকে। এটি এমন এক সংস্কৃতি যা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার যৌথ যাপনের ফসল।

​বাঙালির এই নববর্ষ উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর নামকরণ নিয়ে এক গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়েছে।

​এক শ্রেণির মানুষের কাছে এই মঙ্গল শব্দটি  ও কিছু আচার  'ভারতীয় সংস্কৃতি' থেকে এসেছে  বিবেচিত হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এর নামকরণে পরিবর্তন আনা হয়। মূলত সেই আপত্তির মুখে ২০২৫ সালে অনেক জায়গায় একে 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নামে পালিত হতে দেখা যায়। পরবর্তীতে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র আদি নামে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করা হলেও, একটি বিশেষ মহলের বিরোধিতার মুখে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কৌশলী অবস্থান নেওয়া হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ২০২৬ সালে অর্থাৎ এই বছর 'আনন্দ' এর পরিবর্তে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা' নামটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নামের এই ঘনঘন পরিবর্তন আসলে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ওপর চলমান মনস্তাত্ত্বিক চাপের এক প্রতিফলন। তবে নাম যেটাই হোক, অশুভকে দূরে ঠেলে কল্যাণের আবাহনই এই যাত্রার মূল সুর হওয়া উচিত।

​দুর্ভাগ্যবশত, বাঙালির এই প্রাণোচ্ছ্বল উৎসব বারবার আঘাতের সম্মুখীন হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের শাসনামল পর্যন্ত—শাসকগোষ্ঠী বারবার বাঙালি সংস্কৃতিকে 'হিন্দুয়ানি' বা 'বিজাতীয়' তকমা দিয়ে দমন করতে চেয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি জান্তা যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নববর্ষ উদযাপনে বাধা দেয়, তখনই বাঙালি জাতি সম্মিলিতভাবে ছায়ানটের মাধ্যমে রমনার বটমূলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আজও সেই একই সংকীর্ণমনা গোষ্ঠী একে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। কিন্তু সত্য এই যে, পহেলা বৈশাখ কোনো ধর্মের প্রতিপক্ষ নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার হাতিয়ার।

​একটি জাতির অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতভেদ যখন ঘৃণা আর প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পহেলা বৈশাখের এই হালখাতা আমাদের সুযোগ করে দেয় পুরনো সব 'পাওনা-দেনা' বা তিক্ততা মিটিয়ে ফেলার। রাজনীতির ময়দানেও আমরা এমন এক 'হালখাতা'র প্রত্যাশা করি যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং গঠনমূলক সমালোচনা স্থান পাবে এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে না করে সহযাত্রী ভাবার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

​নতুন বছরের এই শুভলগ্নে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শান্তি ও সম্প্রীতি। বর্ষবরণের  শোভাযাত্রার যে বিচিত্র মুখোশ আর রঙের খেলা, তা আসলে আমাদের সমাজের বৈচিত্র্যেরই প্রতীক। সেখানে উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ থাকে না।

​"মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।"

​রবীন্দ্রনাথের এই পঙক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নতুন বছর মানেই হলো পেছনের সব কালিমা ধুয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করা। এই বৈশাখে আমাদের শপথ হোক—আমরা ঘৃণা ছড়াবো না, বরং ভালোবাসার সংস্কৃতি দিয়ে সমাজকে গড়বো। প্রতিহিংসার রাজনীতি ছুড়ে ফেলে সম্প্রীতির বাংলাদেশে আমরা একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে যাবো।


-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি; এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।



সম্পর্কিত খবর

;