বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ অ্যামচেমের

প্রকাশ : 17 Aug 2026
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ অ্যামচেমের

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি তার কার্যকর, ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। সংগঠনটি বলেছে, নীতিগত উদ্যোগগুলো বাস্তবে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ নিতে পারলেই বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।


রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেক্টিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক এক মধ্যাহ্নভোজ সভায় এ বিষয়গুলো উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, বিনিয়োগকারী ও অ্যামচেমের সদস্যরা অংশ নেন।


অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে উদীয়মান ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক মৌলিক সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও আস্থায় রূপ দিতে হলে সংস্কারের উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।


সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, নীতিগত সংস্কারকে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তা দৃশ্যমান ও পূর্বানুমানযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে হবে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।


এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য মূলধনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর ভিত্তি হলো স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সহজ করা গেলে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা কমাতে সরকার কাজ করছে। ব্যবসায়ীরা যেন নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ বা উদ্বেগ জানাতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।


করব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন—এই দুই অংশে আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।


তিনি বলেন, করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন বাস্তবায়ন করা হলে আয়কর রিটার্ন দাখিল থেকে শুরু করে কর ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াও অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে করদাতাদের হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ কমার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম সহজ করার বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করা গেলে ব্যবসার ব্যয় কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।


অর্থমন্ত্রী একই সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বাইরে বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বড় বিনিয়োগের জন্য শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পুঁজিবাজার, বন্ড, ইকুইটি ও অন্যান্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আগ্রহ বাড়ছে বলেও তিনি জানান।


তিনি আরও জানান, সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে অর্থায়নের কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং নতুন নতুন অর্থায়নের উৎস কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।


ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের কথাও আলোচনায় উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে আর্থিক খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় পুনঃমূলধনীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের একক অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।


জ্বালানি খাত নিয়েও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়; এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জ্বালানি কাঠামো তৈরির উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।


অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে তৈরি পোশাকের বাইরের নতুন রপ্তানি খাতগুলোকে প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। নতুন পণ্য রপ্তানিকারী উদ্যোক্তাদের বন্ডেড ওয়্যারহাউস, করমুক্ত সুবিধা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।


অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের সঞ্চালনায় প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রক পরিবেশ এবং স্টার্টআপ ও উদীয়মান ব্যবসার জন্য মূলধনপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন।


আলোচনায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ব্যবসা পরিচালনায় যৌক্তিক কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বজায় রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।


অনুষ্ঠানটি আয়োজন ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে শেভরন বাংলাদেশ, এইচএসবিসি, ট্রান্সকম গ্রুপ ও ভিসা।

সম্পর্কিত খবর

;