সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রঞ্জন কর্মকারের অবিস্মরণীয় পথচলা

প্রকাশ : 17 Aug 2026
সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রঞ্জন কর্মকারের অবিস্মরণীয় পথচলা

মোঃ নেছার উদ্দিন:


কিছু মানুষের প্রয়াণ কেবল একটি একক জীবনের প্রাকৃতিক সমাপ্তি নির্দেশ করে না; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়, সামাজিক রূপান্তরের ধারা এবং অসংখ্য মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক আশ্রয়ের বিলুপ্তির বার্তা বহন করে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা, প্রগতিশীল চিন্তা, জেন্ডার সমতা এবং সুশীল সমাজের অঙ্গনে রঞ্জন কর্মকার ছিলেন তেমনই এক অসামান্য ও অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর দীর্ঘ চার দশকের সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে কোনো একক প্রতিষ্ঠান, সংক্ষিপ্ত পদবি কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামোর পরিমাপে সীমাবদ্ধ করা অসম্ভব।


তিনি একই সঙ্গে ছিলেন একজন আপসহীন মানবাধিকার রক্ষক, নারী অধিকার সংগ্রামের অগ্রগামী পুরুষ সহযোদ্ধা, স্বাধিকার ও গণতন্ত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী, উন্নয়নচিন্তক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহক এবং এক প্রজ্ঞাবান প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ, বয়স ও পেশার মানুষকে একটি অভিন্ন মানবিক প্ল্যাটফর্মে একত্র করার যে অসামান্য সমন্বয় দক্ষতা তাঁর ছিল, তা তাঁকে বাংলাদেশের সমসাময়িক নাগরিক সমাজের এক অনন্য সেতুবন্ধনে পরিণত করেছিল।


২০২৬ সালের ১২ আগস্ট, বুধবার সকালে ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই মহান ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন। প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী কবিতা রানী বিশ্বাস, কানাডাপ্রবাসী একমাত্র পুত্র শুভারঞ্জন কর্মকার, আত্মীয়স্বজন এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত সহকর্মী, শিষ্য ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।


১৫ আগস্ট সকালে তাঁর মরদেহ ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে রাখা হলে সর্বস্তরের রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়ন অংশীদার ও সাধারণ নাগরিক তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।


তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান ১৫ আগস্ট ঢাকার পোস্তগোলা মহাশ্মশানে পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়। সামাজিক ও প্রথাগত প্রেক্ষাপটে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় প্রিয় সন্তান শুভারঞ্জন কর্মকার কানাডায় অবস্থানের কারণে উপস্থিত হতে না পারায় তাঁর সহধর্মিণী কবিতা রানী বিশ্বাস নিজেই সকল ধর্মীয় অনুশাসন পালনপূর্বক মুখাগ্নি সম্পাদন করেন—যা রঞ্জন কর্মকারের আজীবন লালিত নারী-পুরুষের সমতা ও প্রগতিশীল পারিবারিক চেতনারই এক নীরব বহিঃপ্রকাশ।


রঞ্জন কর্মকারের এই হঠাৎ প্রয়াণ এমন এক সংকটময় সময়ে ঘটল, যখন সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সার্বিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ এবং সংকুচিত নাগরিক পরিসর পুনর্গঠনের আন্দোলনগুলো এক সংবেদনশীল মোড়ে অবস্থান করছে। তাঁর অন্তর্ধানে জাতীয় সামাজিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন এক অপূরণীয় অভিভাবকত্বহীনতার সম্মুখীন হলো।


রঞ্জন কর্মকারের জীবনের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিকড় প্রোথিত ছিল দক্ষিণ বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্যে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঝালকাঠি জেলার ঐতিহ্যবাহী কীর্তিপাশা গ্রামে। পারিবারিক প্রয়োজনে ও ব্যবসায়িক সূত্রে তাঁর পিতা ধীরেন্দ্রনাথ কর্মকার ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার দধিভাঙা বাজারে এসে স্থায়ী নিবাস গড়েন। রঞ্জন কর্মকার ১৯৫৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ছয় ভাই-বোনের পরিবারে রঞ্জন কর্মকার ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান।


ছোটবেলা থেকেই গ্রামীণ অর্থনীতি, নদীর ভাঙন, সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য এবং কৃষক-শ্রমিকদের অসম লড়াই তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি অনুজদের, বিশেষ করে লোটাস কর্মকারসহ অন্যান্য ভাই-বোনের সঙ্গে এক নিবিড় পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলেন। শৈশব ও কৈশোরের এই গ্রামীণ বাস্তবতাই তাঁর ভেতরে সামাজিক অসাম্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম চেতনার স্ফুরণ ঘটায়। সাধারণ মানুষের প্রতি পরম সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ পরবর্তীতে তাঁর কর্মজীবনের পেশাগত চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।


রঞ্জন কর্মকারের প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবহ তাঁর সাংগঠনিক চিন্তাধারাকে অত্যন্ত পরিপক্ব ও সুদূরপ্রসারী করে তোলে। ছাত্রজীবনেই তিনি সমকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে প্রথম সারিতে চলে আসেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতির দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন এবং জাতীয় প্রগতিশীল রাজনীতির রূপরেখা গঠনে অবদান রাখেন।


১৯৮১-৮২ মেয়াদে রঞ্জন কর্মকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। রাজনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক ধারার অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ভিন্নমত ও রাজনৈতিক আদর্শের শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি ছাত্র নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত প্রভাব বা ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে না দেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন, শিক্ষা ও নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট সেবামূলক মাধ্যমে রূপান্তরিত করেছিলেন। রাজনৈতিক দ্বিমতকে কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপান্তর না করে ভিন্নমতের প্রতি পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের এক বিরল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান কখনোই ছিন্ন হয়নি। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (ডুয়া) মহাসচিব পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রবাসে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেও তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন যুক্তরাজ্য শাখার শতবর্ষ উদযাপন কর্মসূচি সফল করতে তাঁর সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা সর্বজনবিদিত।


বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে রঞ্জন কর্মকার সরাসরি যুক্ত হন জাতীয় রাজনীতি ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তিনি দীর্ঘকাল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।


আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ বাংলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেতমজুর আন্দোলন ও প্রান্তিক কৃষক সংগ্রাম গঠনে তিনি সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করেছেন। গ্রামীণ প্রান্তিক মেহনতি মানুষের রুটি-রুজির লড়াই, মজুরি বৃদ্ধি এবং খাসজমি বণ্টনের মতো মৌলিক প্রশ্নে তিনি কৃষক ও দিনমজুরদের সংগঠিত করেন।


গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল প্রাতিষ্ঠানিক। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের একজন সম্মানীয় সদস্য হিসেবে সাংবাদিক সমাজের অধিকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করতেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণচেতনার রূপান্তরে বিশ্বাসী রঞ্জন কর্মকার বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মঠবাড়িয়া উপজেলা শাখার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও উপদেষ্টা হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করতে আজীবন দিকনির্দেশনা প্রদান করে গেছেন।


রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপ দিতে রঞ্জন কর্মকার সত্তর ও আশির দশকের শেষভাগে বেসরকারি উন্নয়ন খাতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে সিডিএল (Community Development Library)-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সংস্থাটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং বগুড়ায় সিডিএলের ফ্ল্যাগশিপ ‘মডেল সেন্টার’ স্থাপনে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন।


তবে পেশাগত যাত্রাপথে প্রাতিষ্ঠানিক নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মতভিন্নতার সম্মুখীন হলেও তিনি নিজের মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। সামাজিক উদ্ভাবন ও অধিকারভিত্তিক চিন্তার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্মানজনক ‘আশোকা ফেলোশিপ’ অর্জন করেন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁর স্বাধীন ও সামাজিক রূপান্তরমুখী চিন্তাগুলোকে বাস্তবায়ন করার আত্মবিশ্বাস ও ভিত্তি জুগিয়েছিল।


যার ফলশ্রুতিতে, ১৯৯৫ সালে তাঁর গতিশীল চিন্তাভাবনা, দূরদর্শিতা এবং সহকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জন্ম নেয় জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা ‘স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট’ (Steps Towards Development)। প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জেন্ডার সমতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার এক বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত করেন।


উন্নয়ন ও মানবকল্যাণ খাতে রঞ্জন কর্মকারের দর্শন প্রচলিত ত্রাণের ধারণা কিংবা তথাকথিত ‘দয়া-দাক্ষিণ্য’ (Charity Approach)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তিনি দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক মানুষকে করুণার পাত্র হিসেবে না দেখে তাঁদের রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও আইনি অধিকারসম্পন্ন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল—‘দান মানুষকে ক্ষণিকের সহায়তা দেয়, কিন্তু অধিকার মানুষকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান করে।’


বাংলাদেশের এনজিও খাতে যখন অনেক সংস্থা কেবল প্রকল্পনির্ভর (Project-based) কাজ এবং দাতা সংস্থার কাগজে-কলমে প্রতিবেদন জমার সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছিল, রঞ্জন কর্মকারের প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। তিনি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রদর্শনের চেয়ে তৃণমূলের সত্যিকারের অংশগ্রহণ এবং শুধুই সংখ্যার চেয়ে মানুষের আত্মসম্মান ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতেন।


তিনি দীর্ঘকাল ধরে ‘মাসিক উন্নয়ন পদক্ষেপ’ পত্রিকাটির সফল সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতামূলক সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ উৎসাহ, প্রাতিষ্ঠানিক মেন্টরিং এবং সহযোগিতায় বাংলাদেশে শত শত ছোট-বড় স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয় ও রঞ্জন কর্মকারের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।


রঞ্জন কর্মকারের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম উজ্জ্বল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিলোপ এবং জেন্ডার সমতা আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। নব্বইয়ের দশকে যখন নারীর অধিকারের বিষয়টিকে কেবল নারীদের নিজস্ব আন্দোলন হিসেবে দেখা হতো, তখন তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন যে—পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হলে পুরুষদেরও তাঁদের সামাজিক অবস্থান, সুযোগ-সুবিধা ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।


তিনি নারী আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব দখলের চেষ্টা না করে সব সময় নারী নেত্রীদের পাশে একজন অনুগত, দায়বদ্ধ ও শ্রদ্ধাশীল পুরুষ সহযোদ্ধা (Male Ally) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় নারীবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও সামাজিক প্রয়োগে তাঁর অবদান অসামান্য।


জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন (২০০৪): বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক জন্মসনদ ব্যবহারের ওপর তিনি দেশব্যাপী গণসচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করেন।


যৌন হয়রানি সংক্রান্ত হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় (২০০৯): ২০০৯ সালের মে মাসে হাইকোর্ট কর্তৃক নির্দেশিত কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সংক্রান্ত নির্দেশনা কার্যকরভাবে প্রয়োগে তিনি সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে সোচ্চার ভূমিকা নেন।


বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (২০১৭): বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত অ্যাডভোকেসি এবং এর বিশেষ বিধানের অপব্যবহার রোধে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।


পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার সংস্কার: জাতীয় পরিচয়পত্র ও অফিশিয়াল নথিপত্রে বাবার পাশাপাশি মায়ের নাম বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা, হিন্দু বিবাহ বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন আইন প্রণয়নে অ্যাডভোকেসি এবং নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের (Unpaid Care Work) অর্থনৈতিক ও জিডিপিতে স্বীকৃতি আদায়ে তিনি জাতীয় ফোরাম তৈরি করেন।


আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ‘Citizens’ Initiatives on CEDAW-Bangladesh’-এর অন্যতম মূল রূপকার ছিলেন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সনদ সিডও (CEDAW)-এর ২ এবং ১৬(১)(গ) ধারার ওপর বাংলাদেশ সরকারের থাকা সংরক্ষণ দ্রুত প্রত্যাহারের দাবিতে তিনি আন্তর্জাতিক ফোরাম, যেমন জেনেভায় সিডও কমিটি, থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক লবি ও অ্যাডভোকেসি চালিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’র প্রতিটি জাতীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনা ছিল অপরিহার্য।


রঞ্জন কর্মকারের অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা ক্ষণস্থায়ী কৌশলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; তা ছিল তাঁর সামাজিক আচরণ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মৌলিক উপাদান। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করেন।


তিনি মনে করতেন, কোনো রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু পরিচয় দিয়ে নাগরিকের মর্যাদা বা নিরাপত্তা নির্ধারিত হতে পারে না; রাষ্ট্র হতে হবে সবার জন্য সমান ও বৈষম্যহীন। ধর্মীয় বা জাতিগত উপাসনালয়ে হামলা, জমি দখল, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান সুশীল সমাজে প্রশংসিত হয়েছে।


মানবাধিকার সুরক্ষায় তিনি দেশের শীর্ষ নাগরিক জোট ‘হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ’ (HRFB)-এর অত্যন্ত সক্রিয় নীতিনির্ধারক ও সংগঠক ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ‘Safeguarding Resource and Support Hub’-এর বাংলাদেশ ন্যাশনাল এক্সপার্ট বোর্ডের সম্মানিত সদস্য হিসেবে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সুরক্ষা নীতি (Safeguarding Policies) প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত সংস্থায় রূপান্তরের দাবিতেও তিনি সব সময় রাজপথে ও টেবিলে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।


রঞ্জন কর্মকার জীবনের সুরক্ষা ও চলাচলের স্বাধীনতাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর অন্যতম মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করতেন। এই দর্শন থেকেই তিনি ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি কোয়ালিশন’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং অত্যন্ত সক্রিয় নীতিনির্ধারক সদস্য হিসেবে নিজেকে যুক্ত করেন।


সড়ক দুর্ঘটনাকে সাধারণ ‘দুর্ঘটনা’ বা চালকের ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে না দেখে তিনি এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অবকাঠামোগত গলদ এবং আইন প্রয়োগে রাষ্ট্রের শিথিলতা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত, এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তিনি বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে একটি কার্যকর, আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের যৌথ কৌশলগত রূপরেখা প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।


রঞ্জন কর্মকারের দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব শুধুই একক সাফল্যের মসৃণ গল্প ছিল না; তার পেছনে ছিল বহু জটিল সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া এবং নানামুখী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার বাস্তব ইতিহাস।


‘স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট’-এর প্রথম পাঁচ বছরে (১৯৯৫-২০০০) তিনি এক বিরল দূরদর্শী ও আদর্শবান প্রাতিষ্ঠানিক নেতার পরিচয় দেন। তিনি সহকর্মীদের শতভাগ কর্মস্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার প্রদান করেছিলেন এবং যোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে এনে প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের স্থান দিয়েছিলেন। সেই সময় সংস্থাটিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সুশাসিত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে উঠেছিল। সেখানে যে কোনো জুনিয়র সহকর্মীও সংস্থার শীর্ষ নির্বাহীর সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তচিন্তার সমালোচনা করার সাহস রাখতেন।


পরবর্তী বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার, বড় বাজেটের প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক পরিসরে রঞ্জন কর্মকারের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক পরিচালনায় কিছু বাস্তব জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় প্রবণতা এবং তোষামোদকারী মহলের অনুপ্রবেশ পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা ও স্বকীয়তায় কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছিল।


এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো কাল্পনিক, ত্রুটিহীন রূপকথার নায়ক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন গুণ ও ভুলের সমাহারে গঠিত এক রক্ত-মাংসের বাস্তব মানুষ, যিনি প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিনিয়ত নিজেকে শুধরে নিতে এবং নতুন শিক্ষায় এগিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন।


পেশাগত নানামুখী চাপ ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও মানুষ রঞ্জন কর্মকারের (রঞ্জনদা) প্রতি সহকর্মী, অনুজ ও সুশীল সমাজের শ্রদ্ধা কখনো বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবদান অসাধারণ স্মৃতিশক্তির সাহায্যে ধরে রাখতে পারতেন। চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল, বগুড়া থেকে বরগুনা কিংবা পার্বত্য অঞ্চল থেকে শ্রীমঙ্গল—দেশের দূরদূরান্তের মাঠপর্যায়ের শত শত সংগঠককে তিনি নাম ধরে চিনতেন এবং তাঁদের ঘাম ও শ্রমের অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মূল্যায়ন করতেন।


ব্যক্তিগত ও সামাজিক মেলামেশায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও কোমল হৃদয়ের একজন মানুষ। সাধারণ চা-চক্র থেকে শুরু করে দীর্ঘ গম্ভীর নীতি-নির্ধারণী সভায় তিনি অনায়াসে জটিল সামাজিক সমস্যার সহজ সমাধান ও নতুন ধারণার উন্মেষ ঘটাতে পারতেন। নতুন ও তরুণ সহকর্মীদের সহসা নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আপন করে নেওয়ার এক অকৃত্রিম ও জাদুকরী ক্ষমতা তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।


রঞ্জন কর্মকারের স্মৃতি ও জীবনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল কোনো শোকসভা বা প্রথাগত স্মারকগ্রন্থে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। তিনি যে আদর্শ ও আন্দোলনগুলোকে অসমাপ্ত রেখে গেছেন, সেগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে নাগরিক সমাজের প্রধানতম দায়িত্ব।


সিডও সনদের সংরক্ষণ প্রত্যাহার: জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সিডও (CEDAW) সনদের ২ এবং ১৬(১)(গ) ধারা থেকে সরকারি সংরক্ষণ তুলে নিয়ে পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।


জেন্ডার সুরক্ষা ও বৈষম্যবিরোধী আইন: হাইকোর্টের ২০০৯ সালের রায় অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং বাল্যবিবাহ শূন্যে নামিয়ে আনা।


সংখ্যালঘু ও প্রান্তিকের অধিকার: ধর্মীয়, জাতিগত ও সমতলের প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক নিরাপত্তা ও জমির অধিকার রক্ষায় স্বাধীন কমিশন গঠনে চাপ অব্যাহত রাখা।


নিরাপদ সড়ক: সড়ক নিরাপত্তাকে নাগরিকের মৌলিক ‘জীবনের অধিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের সড়ক আইন প্রয়োগ করা।


ঐক্যবদ্ধ নাগরিক প্ল্যাটফর্ম: সুশীল সমাজের মধ্যে তৈরি হওয়া বিচ্ছিন্নতা দূর করে আবারও একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও আপসহীন নাগরিক মোর্চা গড়ে তোলা।


রঞ্জন কর্মকার এমন এক জীবনের অধিকারী ছিলেন, যার প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ রাখা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন আন্দোলন—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি ছিলেন এক ক্লান্তিহীন, প্রজ্ঞাবান ও দরদী পথপ্রদর্শক।


তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, উন্নয়ন মানে শুধুই কোনো যান্ত্রিক হিসাব-নিকাশ বা ইট-পাথরের অগ্রগতি নয়; উন্নয়ন হলো মানুষের আত্মসম্মান, সমতা ও নাগরিক মর্যাদার বিষয়। রাজনীতি কোনো ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের মোক্ষম সিঁড়ি নয়, বরং তা সাধারণ ও নিঃস্ব মানুষের সেবা ও আইনি অধিকার আদায়ের পবিত্র মাধ্যম।


প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবির নশ্বরতা পেরিয়ে তিনি লাখো মানুষের হৃদয়ে ‘রঞ্জনদা’ হিসেবে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে গেছেন, তা বাংলাদেশের সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রতিটি সংগ্রামে অনন্তকাল অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে জ্বলবে।


-লেখক: মোঃ নেছার উদ্দিন, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সাগরকূল।

সম্পর্কিত খবর

;