॥ এম এইচ নাহিদ ॥
১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস! ‘না’। বরং ভালোবাসার রঙে সাজানো গণতন্ত্রকামী বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ের রক্তস্নাত স্মারক। মধ্য ফেব্রুয়ারি’র ইতিহাস নবতারুণ্যের অগ্নিঝরা স্পর্ধিত স্পন্দন। ’৮৩-র এই ফাগুনে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ভালোবাসার স্রোতে গা না ভাসিয়ে রাজপথের রক্তপ্রবাহ স্বৈরাচারবিরোধী ঘৃণার শিহরণ তুলেছিল। ছাত্রজনতার স্পর্ধিত স্পন্দনে সংগ্রামী সেই মিছিলের আওয়াজ তৎকালীন স্বৈরশাসকের ক্ষমতার মসনদ কাঁপিয়েছিল। সেদিনের সেই আন্দোলন কেবল কুখ্যাত মজিদ কমিশনের গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে নয়, পরবর্তীকালে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা, আয়ুব, কাঞ্চনের রক্তরাঙা পথে সেলিম, দেলোয়ার, তাজুল, রাউফুন, বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, নুর হোসেন, জেহাদ আর ডা. মিলন সহ অসংখ্য শহীদের রক্তগঙ্গার মধ্য দিয়েই ’৯০-র ৬ ডিসেম্বর বিদায় নিয়েছিল বিশ্ব বেহায়া খ্যাত সামরিক স্বৈরশাসক শাসক এরশাদ সরকার। সূচিত হয়েছিল গণতন্ত্র মুক্তির পথ।
তাই
তো মধ্যফেব্রুয়ারিকে পুঁজিবাদী শোকদের এত ভয়! তারুণ্যের প্রতিবাদের ভাষা চিরতরে স্তব্ধ
করতেই দেশি-বিদেশী শোষক গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় শফিক রেহমান আবিষ্কার করেছিল পশ্চিমা সংস্কৃতির
তথাকথিত ভালোবাসা দিবস। লাল গোলাপে রাঙানো সেই ভালোবাসায় বাঙালি সংস্কৃতির ছিঁটেফোটাও
নেই, বরং অপসংস্কৃতির ওই ভালোবাসা দিবস আজো ‘কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা লুটের হাতিয়ার’-এ
পরিণত হয়েছে ; যা ভুলিয়ে দিতে চায় আগুন রাঙা ফাগুনের রক্তস্নাত মধ্য ফেব্রুয়ারির ইতিহাসকে।
রঙ-বেরঙের কৃত্রিমতায় ভরা এ দিবস নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও মনন থেকে মুছে দিতে চায় প্রতিবাদে
গর্জে ওঠার ভাষা। কিন্তু বাঙালি লড়াইয়ের জাতি, বীরের উত্তসূরী। এ জাতি যেমন ভালো বাসতে
জানে, তেমনি লড়াইয়ের প্রয়োজনে প্রিয়জনের হাত ধরেই মিছিলে পা মিলিয়ে রক্ত দিতেও দ্বিধা
করেন না। তার প্রমাণ দিয়েছে বারে বারে। যেখানেই শোষণ-বৈষম্য, অন্যায়-অনিয়ম, দমন-পীড়ন,
সেখানেই প্রতিবাদে গর্জে উঠার নাম বাঙালি।
’৮২-র
২৪ মার্চ সামরিক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেই তা আঁকড়ে থাকতে নানামুখী অপকৌশল গ্রহণের
পাশাপাশি তারুণ্যের কণ্ঠস্বর দমাতে শিক্ষায়
আঘাত হানে। মেতে উঠে ‘শিক্ষা’ ধ্বংসের চক্রান্তে। শিক্ষক না হয়েও হন শিক্ষক ফেডারশনের
চেয়ারম্যান। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পেশ করা হয় শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের নেতৃত্বে
‘মজিদ খান শিক্ষা কমিশন’-এর প্রস্তাবিত গণবিরোধী শিক্ষানীতি।
শিক্ষার্থীদের
দাবি ছিল একটি অবৈতনিক, সার্বজনীন, বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা।
কিন্তু মজিদ খানের ঘোষিত শিক্ষানীতিতে বাণিজ্যিকীকরণ আর সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ
ঘটেছিল। উচ্চ শিক্ষার শতকরা ৫০ ভাগ যারা বহন করতে পারবে কেবল তারাই শিক্ষা লাভের সুযোগ
পাবেন বলে ওই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গণবিরোধী সেই শিক্ষানীতিকে
পাকিস্তান আমলের শরীফ খানের শিক্ষা কমিশনের নব্য সংস্করণ অ্যাখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে
প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেন ছাত্র সমাজ। মধুর ক্যান্টিনে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম
পরিষদ।
’৮৩-র
১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র
সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে জমায়েত হন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। মজিদ খানের শিক্ষানীতি
প্রত্যাহার ও রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি প্রদানের জন্য মিছিল শুরু হয় শিক্ষাভবন
অভিমুখে। দৃপ্ত পদাভার, বজ্রমুষ্টি আর উচ্চকিত শ্লোগানে ধাবমান স্পর্ধিত মিছিল এগিয়ে
চলে। দোয়েল চত্বরে কাঁটাতার, সাজোয়া যান, জলকামান আর যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে অবস্থান
নেয় এরশাদের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী। মিছিল বাংলা একাডেমি পার হতেই পুলিশ হিংস্রতার নগ্নমূর্তি
ধারণ করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। মিছিলের উপর ট্রাক উঠিয়ে দেয়। হিংস্রতায়
উন্মাদ পুলিশ বাহিনীর গুলিবর্ষণে একে একে লুটিয়ে পড়েন জাফর, জয়নাল, দিপালীসহ অসংখ্য
তাজা প্রাণ। রক্তরঞ্জিত হয় রাজপথ। পুলিশ অনেক লাশ গুমও করে ফেলে। নির্মম ওই নির্যাতনের
হাত থেকে রক্ষা পাননি শিশু একাডেমির অনুষ্ঠানে থাকা নিষ্পাপ শিশুরাও। সেখানেও চালানো
হয় বর্বর হামলা। অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। রঙিন পানি ছিটিয়ে চিহ্নিত করে শত
শত ছাত্র ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়। কারফিউ জারি হয় সারা দেশে। কিন্তু তাতেও ছাত্র জনতার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়
না, উল্টো ঢাকার তাণ্ডবের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে আরো তীব্র ক্ষোভে রাস্তায় নামেন
হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
১৫
ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে হরতালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আইয়ুব,
চট্টগ্রামে শহীদ হন কাঞ্চন নামে এক ছাত্র। অনেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো
হয়। স্বৈরশাসক এরশাদ সরকার দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। লড়াই আরো
তীব্র হয়। অবশেষে ১৭ ফেব্রুয়ারি এরশাদ বাধ্য হয়ে ঘোষণা দেন, “জনগণের রায় ছাড়া শিক্ষা
সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।”
মূলত
’৮৩-র মধ্য ফেব্রুয়ারি’র ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সামরিক শাসন বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার
জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐক্য ও সংগ্রামের পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক
দলগুলোও বিভিন্ন জোটের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে জেলায় জেলায়, শিল্পাঞ্চলে
বড় বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রীপাড়া ঘেরাওয়ের সাহসী কর্মসূচীও সফল হয়। জাতীয় নেতৃবৃন্দ,
শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শ্রমিক-কর্মচারী, কৃষক-খেতমজুর,
যুব-নারী এমনকি সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত লড়াইয়ে
বেসামাল হওয়া এরশাদের মসনদ কেঁপে উঠে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ’৯০-র ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা
ছাড়তে বাধ্য হন। তাই মধ্য ফেব্রুয়ারির সেই লড়াইয়ের ইতিহাস গণতন্ত্র মুক্তির স্মারক।
গোটা
নব্বই দশক জুড়ে এ দিনটি ‘স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হতো। কিন্তু
সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠী রক্তাক্ত সেই ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে শফিক
রেহমানের মাধ্যমে আবিষ্কার করে তথাকথিত ভালোবাসা দিবস। কর্পোরেট হাউসের বাণিজ্যিক
মহোৎসবে আজকের তারুণ্য সে ইতিহাস আজ ভুলতে
বসেছে। মাঝে মাঝে গর্জে উঠলেও এখনো তারুণ্যের বৃহদাংশ ভালোবাসা দিবসে বুঁদ হয়ে থাকে।
অথচ স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের অগ্নিগর্ভ থেকে রচিত ঐতিহাসিক দশ দফার আলোকে তৈরি
শিক্ষা আজো অধরা।
“স্বৈরাচারের
পতনের পর ক্ষমতায় আসলেই দশ দফার আলোকে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে”-এ অঙ্গীকার ছিল সকল
রাজনৈতিক দলের নেতারা। কিন্তু কাক্সিক্ষত সেই শিক্ষাযাত্রা আজো চলছে উল্টো রথে। শিক্ষার ধারাবাহিক বাণিজ্যিকীকরণ,
বেসরকারিকরণ আর সাম্প্রদায়িকীকরণের ফলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা আজ জরাগ্রস্ত। অধরা পূর্ণ গণতন্ত্র।
কিন্তু
ভালোবাসা দিবসের আঁড়ালে নতুন প্রজন্মকে যতই দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক, ইতিহাসের সংগ্রামী
চেতনা হারাবে না। হারাতে পারে না। রক্তস্নাত মধ্য ফেব্রুয়ারির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে
এ প্রজন্ম আবার গর্জে উঠবেই। ভালোবাসার আগুন রাঙা কোনো এক ফাগুনে আবার জাগবে তারুণ্য।
স্পর্ধিত স্পন্দনের সে মিছিল ফিরিয়ে আনবে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রগতির চিন্তায়
এগিয়ে চলা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা। আজকের এ দিনে মধ্য ফেব্রুয়ারি ও
’৯০-র স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের সকল শহিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments