তামাক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ক্ষতিকর পণ্য। এটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি অধিকতর শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেক সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যথারিতী নিয়মে এই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তামাক কোম্পানী অপতৎপরতা শুরু করেছে।
আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জনস্বাস্থ্যকে অধিকতর সুরক্ষা দেবার লক্ষ্যে। এসডিজি-এর মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল। এতে মোট ১৭টি অভীষ্ট, ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা এবং ১৩৩ টি নির্ধারক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৭ টি অভীষ্টের মধ্যে সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ (এসডিজি-৩) অন্যতম।
সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে সর্বপ্রথম নিশ্চিত করতে হবে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোনভাবেই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব না।
অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable Diseases - NCDs) যেমন- ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগসমূহ বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ।
তামাক ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট প্রধান অসংক্রামক রোগসমূহ: হৃদরোগ (Cardiovascular Diseases): তামাক রক্তচাপ বাড়ায়, রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
ধূমপানের কারণে COPD, অ্যাজমা, ও ব্রঙ্কাইটিস হয়। ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালী ও মূত্রথলির ক্যান্সারের প্রধান কারণ তামাক। ডায়াবেটিস: ধূমপান ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
সরকারের পক্ষ থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য যখনই কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়; তখনই তামাক কোম্পানী’র গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। তারা বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়। সরকার ও নীতিনির্ধারকদেরকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার জন্য নানা প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়।
আইন সংশোধনী প্রস্তাবনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে তারা জোরেসোরে কয়েকটি বিষয়ে আওয়াজ তুলছে। এর মধ্যে একটি, স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ না করে মন্ত্রণালয় আইন সংশোধনের খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে। এই বাদ পড়া স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে রয়েছে তামাক কোম্পানীগুলি।
তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষার সাথে সম্পর্কিত। জনস্বাস্থ্যকে রক্ষার স্বার্থেই দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি প্রণয়ন হয়েছে এবং সময়ের দাবিতে সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। তামাক কোম্পানী একইরকমভাবে প্রত্যক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ।
সেক্ষেত্রে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন এবং তামাক কোম্পানীর ব্যবহারিক অবস্থান একে অপরের বিপরীতে। উভয়ের স্বার্থ রক্ষাও বিপরীতমুখী। সেখানে কোন যুক্তিবলে তামাক কোম্পানী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের প্রস্তাবনায় স্টেকহোল্ডার হিসাবে বিবেচিত হবে??
তাদের স্টেকহোল্ডার হিসাবে বিবেচিত হবার নুন্যতম কোন যৌক্তিক কারণ নেই। অন্তত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন প্রক্রিয়ার সাথে।
তামাক কোম্পানীর আব্দারটাও আইন সংশোধনীর ক্ষেত্রে এমন; ওনাদেরকে স্টেকহোল্ডার বিবেচনায় নিয়ে কথা শুনতে হবে। তারা প্রস্তাবিত আইনের সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা বিরোধিতা করে প্রস্তাবনা দেওয়ার সুযোগ চায়।
যাতে জনস্বাস্থ্য ক্ষতি করার জন্য তাদের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়, তাদের জনস্বাস্থ্য ক্ষতির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেটা বাধাগ্রস্থ না হয়!!
কী চমৎকার আব্দার তামাক কোম্পানীর!! এই আব্দারকে ন্যায্যতা দেবার জন্য একপক্ষ নির্লজ্জভাবে তামাক কোম্পানীর পক্ষে কাজ করছে দেশের জনস্বাস্থ্যকে হুমকীর মধ্যে ফেলে দিয়ে। এটা তামাক কোম্পানীর চরম দুঃসাহস।
এভাবেই তারা প্রতিনিয়তো এফসিটিসি’র আর্টিক্যাল ৫.৩ ভঙ্গ করে তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য তারা কিছু অনুগত সঙ্গী-সাথীও জোগাড় করেছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র Guidelines for implementation of Article 5.3 এ বলা হয়েছে, ‘The purpose of these guidelines is to ensure that efforts to protect tobacco control from commercial and other vested interests of the tobacco industry are comprehensive and effective. Parties should implement measures in all branches of government that may have an interest in, or the capacity to, affect public health policies with respect to tobacco control (decision FCTC/COP3(7))’.
বাংলাদেশ এফসিটিসি’তে অনুস্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। সেই অবস্থান থেকে উল্লেখিত গাইডলাইন অনুসারে, বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অথবা তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্য যেকোন ধরনের কৌশলপত্র নির্ধারণে তামাক কোম্পানীর মতামত দেবার নুন্যতম কোন সুযোগ নেই। তাদের মতামত গ্রহণ করা অর্থ, এফসিটিসি’র আর্টিক্যাল ৫.৩ এর ধারা ভঙ্গ করা। সঙ্গত কারণেই আমাদের সরকার এবং সরকারের যেকোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সেটা করতে পারেনা।
বাংলাদেশ অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই চুক্তিটি করা হয়েছে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।
ঘোষণাপত্রের প্রধান পাঁচটি প্রতিশ্রুতির মধ্যে (ক) নীতি প্রণয়নে অগ্রাধিকার অংশে বলা হয়েছে,‘প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ তাদের নিজস্ব কর্মকৌশল ও নীতিমালা প্রণয়নের সময় ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য (Health in All Policies)’ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করবে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে’।
সরকারের যে ৩৫ টি বিভাগ/মন্ত্রণালয় এই যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে, এনবিআর তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনকে সামনে নিয়ে এফসিটিসি আর্টিক্যাল ৫.৩ এবং এই যৌথ ঘোষণাকে উপেক্ষা করে এনবিআর তামাক কোম্পানীগুলির সাথে সভা করার পরিকল্পনা করেছে।
এধরণের সভা অনুষ্ঠিত করা এফসিটিসি এবং যৌথ ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক। এনবিআরের এই কাজটি করা একেবারেই অনুচিত।
সংশোধিত আইনের খসড়া প্রস্তাবনায় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত হওয়াতে কোম্পানীর গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। এটা নতুন বিষয় নয়। ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’তে লাইসেন্সিং ব্যবস্থাটি যখন যুক্ত করা হয় তখনই তাদের অপতৎপরতা শুরু হয় এটা বাতিলের জন্য।
তামাক নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম লক্ষ্য এর সহজপ্রাপ্যতা হ্রাস করা। তার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ব্যবহার কমিয়ে আনা। লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এই উদ্দেশ্য পূরণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে সেটি ইতিমধ্যে প্রমাণিত।
ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হতে তামাক বিক্রেতারা লাইসেন্স গ্রহণ করে ব্যবসা করছে। এলজিআই গাইডলাইন অনুসারে, ৪৩ টি পৌরসভায় ৪১৫৫টি লাইসেন্স (নিবন্ধণ) ইস্যু হয়েছে; যাতে সরকার ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব পেয়েছে; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ২০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার সিগারেট/ তামাক বিক্রেতা আছে, লাইসেন্স (নিবন্ধণ) হলে সরকারের রাজস্ব আয়ে যোগ হবে ৩০ কোটি টাকা। একই সাথে চোরাচালান এবং অবৈধ কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হবে।
প্রচার করা হচ্ছে, ১৫ লাখ নিম্ন আয়ের খুচরা বিক্রেতা আছে। এই তথ্যের কোন সঠিকতা নেই। বলা হচ্ছে, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর হলে এদের জীবন-জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে। কী হাস্যকর যুক্তি! এদের বক্তব্য অনুসারে মনে হয়, বাংলাদেশে ফেরি করে বিক্রি করার একমাত্র পণ্য সিগারেট। এটা ব্যতীত ফেরি করে অন্য কোন পণ্য বিক্রি করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেনা!!
লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গত তিনবছর ধরে চলমান। যারা দ্বৈত লাইসেন্স গ্রহণ না করে তামাক বিক্রি করা ছেড়ে দিয়েছে তাদের কারো জীবন-জীবিকাই বন্ধ হয়ে যায়নি। যেটা হয়েছে সেটা হলো ঐ এলাকাগুলিতে সিগারেট বিক্রি কমে গেছে।
আরে ভাই, সরকারের লক্ষ্যই তো তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি কমিয়ে আনা। সেজন্যই তো আইন করে এই বিক্রিকে কঠিন করে আনা উচিত যাতে সিগারেট বা অন্য তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করতে বিক্রেতা নিরুৎসাহিত বোধ করে। সিগারেটের পরিবর্তে অন্য কিছু বিক্রি করা শুরু করে। তার জন্য তো আর পৃথক লাইসেন্স নেওয়ার কথা বলেনি সরকার।
তামাক নিয়ন্ত্রণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধীত ২০১৩) এর সংশোধনী এখন সময়ের দাবি। সেই দাবি’র প্রতি সাড়া দিয়েই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুনভাবে আইনে যেসকল সংশোধনী প্রস্তাবনা যুক্ত করেছে তা অত্যন্ত যুগোপযোগী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে ইতিমধ্যে এই ধারাগুলি সংযুক্ত হয়েছে। এবং তারা এর সুফল পাচ্ছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের লক্ষ্য তামাক কোম্পানীর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা না; জনস্বাস্থ্যকে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা। আর তামাক কোম্পানীর লক্ষ্য তামাজাত দ্রব্যের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা; চুড়ান্তভাবে যা জনস্বাস্থ্যকে মারাত্বক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
তামাক কোম্পানী তার অনুগতদের দিয়ে আইনের সংশোধন বিষয়ে যে নেতিবাচ প্রচারণা চালাচ্ছে তার উদ্দেশ্যই হলো আইনের নতুন ধারাগুলি যাতে যুক্ত না হয়।
কারণ এই ধারাগুলি যুক্ত হলে তামাক কোম্পানীর বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। লাইসেন্সিং(নিবন্ধণ) ধারাটি তার মধ্যে অন্যতম। সেকারণে এই বিষয়টি নিয়ে তাদের বিরোধীতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
আমাদের আগামী প্রজন্মকে তামাকের সর্বনাশা ছোবল থেকে রক্ষা করার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের নাগরিক দায়িত্ব তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীর প্রস্তাবনাকে সমর্থন করা এবং তামাক কোম্পানীর কূটকৌশলকে প্রহিত করা।
-লেখক: আবু নাসের অনীক, উন্নয়ন কর্মী।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments