ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান ছিল ২৭০। এ স্কোর নিয়ে বিশ্বের ১২৩ নগরীর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। বায়ুর এ মানকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এ সময় নগরীর ঠিক পাশের জনপদ সাভারের বায়ুর মান ছিল ৬৪০। বায়ুদূষণের মান ২০০-এর বেশি হলে সেটিকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচনা করা হয়; আর ৩০০ হয়ে গেলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলে গণ্য করা হয়।
বায়ুদূষণের সর্বোচ্চ স্তর এটি। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার এ তথ্য দিয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অধিকাংশ জেলার বাতাসই দূষিত। এর মধ্যে গাজীপুর, ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের বাতাস চরম অস্বাস্থ্যকর। ২০২৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষিত সাভারে বায়ুদূষণ সৃষ্টিকারী কিছু কাজ পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। নিষিদ্ধ বিষয়গুলো ছিলো ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সাভার উপজেলার অন্তর্গত সব ধরনের ইটভাটায় (টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ছাড়া) ইট পোড়ানোসহ ইট প্রস্তুতের কার্যক্রম পরিচালনা, উন্মুক্ত অবস্থায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানো এবং বায়ুদূষণ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে ,এমন সব ধরনের নতুন শিল্পকারখানার অনুকূলে অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া। কিন্তু সেই ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ সেই সাভারের দূষণ তো কমেইনি; বরং বেড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাভার উপজেলায় ১০৬টি ইটভাটা আছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে ইট তৈরি করা হয়। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম। এ সময় উত্তর থেকে দক্ষিণে বাতাস প্রবাহিত হয়। ঢাকা দক্ষিণে হওয়ায় সাভারের দূষণ ঢাকা পর্যন্ত চলে আসে। সে কারণে ঢাকার দূষণও বেড়ে যায়।
বায়ুদূষণকে বিশ্বব্যাপী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে । শিল্পায়নের বৃদ্ধি, যানবাহনের ধোঁয়া, কারখানার নির্গমন এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কারণে বায়ু দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এই দূষিত বায়ু মানব স্বাস্থ্যের জন্য বড়ো হুমকি। বায়ু দূষণের অনেকগুলো উৎস রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া, শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস এবং কণা, কয়লা, তেল এবং গ্যাস জ্বালানোর ফলে বায়ু দূষিত হয়। এছাড়াও নির্মাণ কাজ, খনন কাজ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বন ধ্বংসের ফলে বায়ু পরিশোধন কমে যায় এবং বায়ু দূষণ বাড়ে। বায়ুদূষণ কেবল ঘরের বাইরের এবং শহরের সমস্যা নয়। শহরে দূষণ কিছুটা বেশি হলেও গ্রামে এর মাত্রা কোনো অংশে কম নয়। এটি এমন একটি সমস্যা, যা ধনী বা গরিব, গ্রামীণ বা শহুরে, তরুণ বা বৃদ্ধ সবাইকে প্রভাবিত করে। আমাদের ধারণা হলো, গাছ লাগালে বা ঘরে গাছ রাখলে বায়ুদূষণ কমে। গাছ নিঃসন্দেহে অনেক উপকারী কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গাছও বাতাসের দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারছে না।
বায়ুদূষণ নিয়ে কম বেশি সবাই চিন্তিত মূলত এর স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রায় ১০ লাখের মতো মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ প্রতিদিন অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, যার ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে আঞ্চলিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ অঞ্চলের পাঁচ দেশের বায়ুদূষণের মূল উৎস পাঁচটি। এগুলো হলো রান্না ও গরমের জন্য ঘরে কঠিন জ্বালানি পোড়ানো, যথাযথ ফিল্টার প্রযুক্তি ছাড়াই শিল্পকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানি ও বায়োগ্যাসের অদক্ষ ব্যবহার, অকার্যকর অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ব্যবহার, কৃষিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সার ও পশুবর্জ্য অদক্ষভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং ঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পোড়ানো।
বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কম-বেশি সকল পর্যয়ে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে নানা আলোচনা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, কোন উৎস থেকে কতটা বায়ু দূষণ হচ্ছে। আমরা কম বেশি সবাই জানি, যানবাহন, ইটভাটা, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, বিভিন্ন শিল্পকারখানা, রান্নায় কঠিন জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য পোড়ানো, সড়কের ধুলা, নির্মাণকাজ সবই বায়ুদূষণের বড়ো উৎস। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ এর কথা বলা হয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে গবেষকদের কোনো একক সিদ্ধান্ত নেই। যেমন ঢাকার বায়ুদূষণের কতটা ইটভাটা থেকে আসে, কেউ বলছে অর্ধেকের বেশি, কেউ বলছে মাত্র এক-দশমাংশ।
বায়ুদূষণের কারণে এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নানারকম মূল্যায়ন করা গবেষণা দেখা যায়। এক ধরনের গবেষণায় দেখানো হয়েছে ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতার ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব । এ ধরনের গবেষণাগুলো সাধারণত দেখা যায় যে কম বায়ুদূষণের সময় কর্মীরা বেশি উৎপাদনশীল হন। এটি প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের শ্রমে,হাতের শ্রম যেমন ফল তোলার শ্রমিক বা পোশাক কারখানার শ্রমিক এবং মেধাশ্রম যেমন কল সেন্টারের কর্মী বা দাবার খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বায়ুদূষণ আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে কম উৎপাদনশীল করে তুলছে। আর এক ধরনের গবেষণায় দেখানো হয়েছে আঞ্চলিক জিডিপিতে বায়ুদূষণের প্রভাবের সঙ্গে জিডিপির হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। এই ফলাফলগুলো প্রথম ধরনের গবেষণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তবে এই গবেষণাগুলো বায়ুদূষণের সঠিক প্রভাব নির্ধারণ করা এবং অন্যান্য ভেরিয়েবল থেকে আলাদা করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
দূষিত বাতাস থেকে শ্বাস নেওয়ার জন্য আমাদের সকলেরই ক্ষতি হচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানগত কারণে ক্ষতির পার্থক্যের কিছুটা তারতম্য হতে পারে। পার্থক্যগুলো মোট ক্ষতির তুলনায় অপেক্ষাকৃত নগন্য। দূষিত বাতাসের ফলে নানা রোগ-ব্যধি ছড়াচ্ছে, অকালমৃত্যু হচ্ছে অনেকের। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের দাবি অনুযায়ী বায়ুদূষণের কারণে সারা দেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। তবে রাজধানী ঢাকায় কমেছে প্রায় সাত বছর সাত মাস। বায়ুদূষণ কেবল বাইরের সমস্যা নয়। কারণ, বাইরে ধোঁয়া বা কুয়াশা দেখা যায়, কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাসে দূষণ চোখে পড়ে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ঘরের ভেতরের বাতাস বাইরের মতো প্রায় সমানই দূষিত।
আমাদের জানা দরকার বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি? বায়ুদূষণ রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার এটি খুব জটিল একটি সমস্যা, রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়। দেশের মানুষ আগের তুলনায় এখন বায়ুদূষণ সম্পর্কে অনেক সচেতন। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয় নিয়ে কাজ করছে। গণমাধ্যম জনগণকে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারিভাবে বায়ুদূষণ কমানোর জন্য ঢাকা শহরের রাস্তায় পানি ছিটানো হচ্ছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে বায়ু দূষণের আপডেট জনগণ জানতে পারছে। ঢাকায় প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারে পানির ফিল্টার আছে, কিন্তু খুব কম পরিবার আছে যাদের ঘরে এয়ার পিউরিফায়ার আছে। অথচ এটা এখন খুবই প্রয়োজন। ঘরের বায়ু দূষণের উৎস কমানো জন্য এয়ার পিউরিফায়ার খুবই প্রয়োজন।যদিও সবার পক্ষ্যে এয়ার পিউরিফায়ার কেনা সম্ভব না।
কাঠ ,কয়লা ও ডিজেলের মতো সবচেয়ে দূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার পরিকল্পিতভাবে কমিয়ে আনতে হবে। বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। ইটভাটাগুলো থেকে নিয়মিত মনিটরিং এর আওতায় আনতে হবে। পরিবেশ বান্ধব ইট তৈরিকে গুরুত্ব দিয়ে সনাতনি পদ্ধতিতে চালু ইটভাটাগুলো পর্যায়ক্রমে দ্রুততম সময়ে বন্ধ করতে হবে।পুরোনো ও দূষণকারী বাস ও ট্রাক পর্যায়ক্রমে দ্রুততম সময়ে বাদ দেওয়া। সরকার ইতোমধ্যে এটি নিয়ে কাজ করছে। বায়ু দূষণের প্রভাবে মানুষের অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), ফুসফুসের ক্যান্সার, নিউমোনিয়া ইত্যাদি অসুখ হয়ে থাকে। বায়ু দূষণ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরতে হবে। সম্ভাব হলে ঘরে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করতে হবে। যতটা বৃক্ষরোপণ করে বায়ু পরিশোধন করা যেতে পারে। বায়ু দূষণ কমানোর জন্য সরকারি নীতিমালা মেনে চলতে হবে।
বায়ু দূষণ আজ আমাদের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সকল নাগরিকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। দূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার কমানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার, বৃক্ষরোপণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই সব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলেই আমরা নির্মল ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলতে বায়ু দূষণ প্রতিরোধে আজ থেকেই আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে
#
-লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়।
পিআইডি ফিচার
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
আফসানা আরেফিন:
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলনের অমলিন অনুভূতি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আনন্দঘন মুহূর্তের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের গল্প জড়িয়ে আছে- ...
সব মন্তব্য
No Comments