শিক্ষা বিপ্লবের নায়ক অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা

প্রকাশ : 03 Aug 2026
শিক্ষা বিপ্লবের নায়ক অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা

স্টাফ রিপোর্টার: ডেমরা-যাত্রাবাড়ী, কদমতলী-শ্যামপুর, খিলগাঁও-সবুজবাগ ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় শিক্ষা বিপ্লবের নায়ক অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা। এই অঞ্চলে তিনি বেসরকারি শিক্ষা প্রসারে নিরলস ভূমিকা রেখেছেন এবং নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে অখ্যাত ও দু-চালা ভাঙা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আজ দেশের অন্যতম সুপরিচিত ও সাড়াজাগানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপদানের কারিগরও তিনি। সেই প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এক কথায় বলতে গেলে মরা গাঙে বান এসেছে। ফলে শিক্ষা জোন হিসেবে দেশজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকাও।


জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে মাতুয়াইলের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মরহুম সামসুল হক খান-এর নামে প্রথমে সামসুল হক খান স্কুল এবং পরবর্তীতে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা। প্রতিষ্ঠানটিকে দেশসেরা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রতিষ্ঠান প্রধান মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের যাত্রা শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন হিসেবে, ক্রমান্বয়ে এর পরিধি বিস্তৃত হয়। প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রিন্সিপাল মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লার অসাধারণ চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটে। তাঁর হাত ধরেই ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় শিক্ষার বিস্তার ঘটে। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।


এক সময় ডেমরা প্রধানত শিল্পাঞ্চল হিসেবেই পরিচিত ছিল। এলাকাটি শিক্ষা-দীক্ষায় পূর্বে ততটা এগিয়ে ছিল না। হাতেগোনা দু-একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেনতেনভাবেই চলত। উৎসাহী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভালো স্কুল-কলেজের সন্ধানে শহরমুখী না হয়ে উপায় ছিল না। এমন পরিস্থিতি পাল্টে দেয় সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের আত্মপ্রকাশ। বলতে গেলে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন যুগের অভিযাত্রা ডেমরা-যাত্রাবাড়ীতে ইতিহাস রচনা করেছে।


প্রিন্সিপাল মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা অত্যন্ত দূরদর্শী। তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্রে বারবার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষকতাকে তিনি কেবল রুটি-রুজি উপার্জনের উপায় হিসেবে নেননি, কর্মক্ষেত্রে তিনি বিপ্লবাত্মক ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চাওয়া-পাওয়া পূরণে তিনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর ভাবনা মূলত এমন যে, তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ হয়ে বেরিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ যেন সুগম হয়। তাঁর সে বাসনা পূরণ হয়েছে।


শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা তিনি বিরামহীনভাবে করে যান এবং সেজন্য অনেক কর্মসূচিও তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মানের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেন না, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত মতবিনিময় করেন, তাদের সমস্যা উপলব্ধি করেন। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের বার্তা তাঁর নখদর্পণে থাকে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়— কোনো কোনো শিক্ষার্থী সাংবাৎসরিক শিক্ষাবৃত্তিও উপভোগ করে। এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য মূলত শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।


শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা, তারা নিজেদের জন্য বড় হবে, দেশ গঠনে অভিনব ভূমিকা রাখবে, কাঙ্ক্ষিত মানের মানুষ হয়ে উঠবে। এই প্রত্যাশা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে আরও হবে। দেশের সবগুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অনেকে গৌরবময় কর্মজীবনেও প্রবেশ করেছে। সরকারি চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, বিসিএস ক্যাডার— এসব পদমর্যাদা প্রাপ্তি তাদের সৌভাগ্য হয়ে উঠেছে।


এই প্রতিষ্ঠান কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এখানে সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গনও বেশ মুখর। প্রতিষ্ঠানের ক্লাবগুলোতে শিক্ষার্থীরা অবসরে অনুশীলন করে। তারা কেউ বিতার্কিক, কেউ নৃত্যশিল্পী, কেউ চিত্রশিল্পী হতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যায়। প্রতিষ্ঠানের স্কাউট গ্রুপটি বেশ জমজমাট, প্রতিবছর স্কাউট সদস্যদের অনেকে প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভালো শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু একই সাথে এ অঙ্গন খুদে শিল্পীদেরও।


প্রিন্সিপাল মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা তাঁর কর্মক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করেছেন— মূল কারণ যে শিক্ষার্থী-প্রীতি, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সম্ভবত তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে কল্পনা করেন। শিক্ষার্থীদের মানস গঠনের উদ্দেশ্যে তিনি দেশ-বিদেশের গুণীজন, শিল্পী-সাহিত্যিকদের এই প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন। তাদের জ্ঞানের কথা শিক্ষার্থীদের শুনিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগঠন এইচডব্লিউপিএল-এর নীতি-আদর্শের সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এখানে এসেছেন জাপানের হিতোৎসুবাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনিকোরা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ। এছাড়া রাষ্ট্রের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের আসা-যাওয়াও তো আছেই।


প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বেশ কয়েকবার শিক্ষার্থীরা বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ লাভ করে। স্কাউট সদস্য হিসেবে এবং শিক্ষা সফর উপলক্ষে তারা গিয়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। পৃথিবী কোথায় কেমন, একটু হলেও তারা দেখে এসেছে। এর ফলে তারা জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সক্ষম হবে।


সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাইরের জগতের সংগ্রামের সাক্ষীও হতে পেরেছে। সেসব উপভোগের নয়, বেদনার। ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির আতঙ্ক উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বিপন্ন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার বন্যার্তদের সহায়তা দিতে প্লাবিত অঞ্চলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এভাবে তারা দিন দিন ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা’র পরিচয় লাভ করেছে। তারা জানল, শিক্ষা শুধু পাঠ্যসূচিতে নয়, শ্রেণিকক্ষে নয়, শিক্ষা প্রবহমান জীবনে, যত্রতত্র।


মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লার শিক্ষা-প্রীতি ডেমরা-যাত্রাবাড়ীর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতার সৃষ্টি করেছে। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের সবাই স্থানীয় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার ছেলেমেয়েরা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাই অনেক লোকে এখানে আসে, ছেলেমেয়ের প্রয়োজনে অবস্থান করে। লোক সমাগমের ফলে মাতুয়াইলের কোনাপাড়ার চিত্র পাল্টে গেছে। কোনাপাড়া এখন একটি ব্যস্তবহুল ব্যবসা কেন্দ্র। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ চারপাশের এলাকায় যথেষ্ট ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। তার ফলে এলাকাটি সচ্ছল ও জমজমাট হয়েছে। বহুতল ভবনে ভরে গেছে কোনাপাড়া। পড়াশোনার বিষয়ে এলাকার লোকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।


ঢাকার পাশে হলেও এই পরিবর্তনের মুখ ডেমরাবাসী এর আগে দেখেনি। কয়েক বছর আগে একজন রাজনীতিবিদ ডেমরা অঞ্চলকে ‘শিক্ষা জোন’ বলে অভিহিত করেছেন। আরেকজন রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব প্রিন্সিপাল মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ বলেছেন।


১৯৮৯-২০১০ সাল পর্যন্ত সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরও শিক্ষা বিস্তারের কাজে মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে ক্লান্তি স্পর্শ করতে পারেনি। ২০১০ সালে ঢাকা-সিলেট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা কাজলায় নিজ নামে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নান্দনিক ভবনের কলেজটি স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এখান থেকেও শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর কাঙ্ক্ষিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এই ভবনের পাশাপাশি আরও দুটি শিক্ষাঙ্গন গড়ে ওঠে— ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং টার্নিং পয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। সব মিলিয়ে বলা যায়, এটি এখন ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা এডুকেশন ভিলেজ।


অন্তত এই সময়ে প্রিন্সিপাল মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লার মতো ক্লান্তিহীন উৎসাহ নিয়ে শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত মহৎপ্রাণ মানুষ খুব বেশি নেই। তিনি দেশের মূল্যবান সম্পদ। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা নিজেই বলেন, “অনেকে শিল্প-কারখানা তৈরি করলেও আমি কোটি কোটি টাকা খরচ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছি। আমি দেশের জন্য আদর্শ ও সুনাগরিক তৈরি করতে চাই।”


সম্পর্কিত খবর

;