লালমনিরহাটে ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ’ থেকে শহীদের নাম মুছে ফেলার অভিযোগ, ক্ষোভ মুক্তিযোদ্ধাদের

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম মুছে লেখা হলো 'শহীদ তোরণ'

প্রকাশ : 29 Aug 2026
শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম মুছে লেখা হলো  'শহীদ তোরণ'

রংপুর অফিস: লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশদ্বারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ’-এর নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে শুধু ‘শহীদ তোরণ’ লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তোরণের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।


এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদের স্মৃতি মুছে ফেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহল। তাঁদের দাবি, কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার বা পরিবর্তন করা হলেও যাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতিতে স্থাপনাটি নির্মিত, তাঁর নাম মুছে ফেলা উচিত নয়। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে সেই শহীদের পরিচয় ও আত্মত্যাগ তুলে ধরা প্রয়োজন।


কে ছিলেন শহীদ মোফাজ্জল হোসেন? স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত ইতিহাস ও বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহীদ মোফাজ্জল হোসেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের সন্তান। ১৯১২ সালের ২০ জানুয়ারি বারী উদ্দিন সরকারের পরিবারে তাঁর জন্ম। পরবর্তীতে তিনি রেলওয়েতে চাকরি করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় লালমনিরহাট রেলওয়ে এলাকায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল লালমনিরহাটে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে তিনি শহীদ হন বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়।


স্থানীয় ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওইদিন পাকিস্তানি সেনারা লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে পাঁচ শতাধিক মানুষকে জড়ো করে তাঁদের ওপর ব্রাশফায়ার চালায়। এতে মোফাজ্জল হোসেনসহ বহু মানুষ নিহত হন। ওই হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি বাহিনীকে স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা সহযোগিতা করেছিল বলেও বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।


শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে স্বাধীনতার পর তাঁর নিজ এলাকা কাউনিয়াসহ বিভিন্ন স্থাপনার নাম তাঁর নামে রাখা হয়। লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম পাশে নির্মাণ করা হয় ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ’। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগমন্ত্রী এবং জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশন ও কাউনিয়া রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে থাকা ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ’ উদ্বোধন করেন।


শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের স্মৃতির সঙ্গে রেলওয়ের পাশাপাশি তাঁর পরিবারেরও গভীর সম্পর্ক ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে মোসাব্বের জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ছিলেন।


শুধু লালমনিরহাট নয়, কাউনিয়াতেও শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কাউনিয়া রেলস্টেশনের পুরোনো তোরণটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর স্টেশনের ওভারব্রিজটির নাম ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন ওভারব্রিজ’ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওভারব্রিজ সংস্কারের সময় সেখান থেকে তাঁর নাম মুছে ‘কাউনিয়া জংশন’ লেখা হয়। এ নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


কাউনিয়ায় তাঁর স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ‘কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’। ফলে একইভাবে লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের তোরণ থেকেও তাঁর নাম মুছে ফেলে শুধু ‘শহীদ তোরণ’ করায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণেও উঠে এসেছে শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়াত পিতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছালাম এবং প্রয়াত ফুপা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তৎকালীন টেপা মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দার রহমানের মুখে তিনি বহুবার শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের কথা শুনেছেন।


স্থানীয় একাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিকের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তাঁদের নাম ও পরিচয়ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি।


স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের তোরণে ‘শহীদ মোফাজ্জল হোসেন’ নামটি পুনঃস্থাপন করা হোক এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয় সংরক্ষণ করা হোক।


সম্পর্কিত খবর

;