আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল:
প্রতিদিন সকাল হলেই ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল কিংবা গুলিস্তানের ফুটপাতগুলোতে চেনা এক ব্যস্ততার ছবি চোখে পড়ে। একপাশে পথচারীদের ভিড়, অন্যপাশে হকারদের হাঁকডাক। এই হট্টগোলের ভেতরেই প্রতিদিন জীবনের কঠিন যুদ্ধ লড়তেন ৪২ বছর বয়সী হকার রফিকুল ইসলাম। গত ১০ বছর ধরে তিনি ফুটপাতে জামাকাপড় বিক্রি করছেন। কিন্তু রফিকুলের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদার ভয়ে প্রতিনিয়ত তটস্থ থাকতে হতো তাকে।
আজ রফিকুলের মুখে স্বস্তির হাসি। সম্প্রতি জারি হওয়া 'ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬' এর আওতায় তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে কিউআর কোড সম্বলিত একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র পেয়েছেন। নীতিমালার সুবাদে মতিঝিল এ জি বি কলোনির মাঠে নির্ধারিত স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে মাথা উঁচু করে ব্যবসা করছেন তিনি। রফিকুলের মতো ঢাকার হাজারো হকারের জীবনে এই নতুন নীতিমালা নিয়ে এসেছে এক নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ভবিষ্যৎ।
ঢাকায় ঠিক কতজন হকার আছেন, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই। তবে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হকার রয়েছেন। ঈদের সময় এই সংখ্যা ৩ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাতকেন্দ্রিক অনিয়ম ও চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে উপেক্ষা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও হকাররা ফিরে এসেছেন। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ কখনও স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
ঢাকা একটি দ্রুত বর্ধনশীল মেগাশহর, যেখানে জনসাধারণের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-২০৩৫) এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের অবজেক্টিভ-২ এর অধীনে পলিসি ইসিও-২.১ এ হকার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সে আলোকে ঢাকা মহানগরীর সকল অঞ্চলে একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত হকার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করা, অন্যদিকে হকারদের জীবিকার নিরাপত্তা দেওয়া। ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের প্রাথমিক বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। গুলিস্তান এলাকার ১০০ জন হকারকে ডিজিটাল আইডি কার্ড দিয়ে রমনা ভবনের পাশের লিংক রোডে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ হকারকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকার ফুটপাতগুলোতে ইচ্ছেমতো যেকোনো সময় পণ্য নিয়ে বসা যাবে না। ব্যস্ত এবং জনবহুল এলাকায় দিনের বেলা হকারদের বসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে হকারদের রুটিরুজি যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য বিশেষ কিছু জোন ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পথচারীদের অধিকার রক্ষা: যেখানেই হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া হবে, সেখানে পথচারীদের যাতায়াতের জন্য ফুটপাতের অন্তত ৫ থেকে ৮ ফুট জায়গা সম্পূর্ণ খালি রাখতে হবে। কোনোভাবেই ফুটপাত পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। নিষেধাজ্ঞা: স্কুল-কলেজের মাঠ, খেলার মাঠ, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং কবরস্থানের সামনে কোনোভাবেই হকাররা বসতে পারবে না। পাশাপাশি ফুটপাতে কোনো ধরনের পাকা বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও নিবন্ধন: নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। একটি পরিবার থেকে একাধিক লাইসেন্স দেয়া হবে না। নিবন্ধিত ব্যক্তিকেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং বরাদ্দকৃত জায়গা অন্য কাউকে ভাড়া দেয়া বা ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। প্রতিটি বৈধ হকারকে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এর ফলে ট্রাফিক পুলিশ বা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ অনায়াসে হকারের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে।
সময় ও স্থান নির্ধারণ: জনবহুল এলাকায় দিনের বেলা হকারদের বসা বন্ধ থাকবে। তবে বিকেল বা সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট স্থানে 'নৈশকালীন মার্কেট' চালু করা যাবে। যেসব এলাকায় দিনের বেলায় তীব্র যানজট থাকে কিন্তু রাতে জনচাপ কমে যায়, সেসব এলাকায় এই নাইট মার্কেট চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। অফিস শেষে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব মার্কেট পরিচালনা করা যাবে। এছাড়া অভিনব একটি ‘হলিডে মার্কেট’ চালু করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন, শুক্র ও শনিবার নির্দিষ্ট এলাকায় এই হলিডে মার্কেট চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এসব মার্কেট পরিচালনা করা যাবে। সরকারি অফিসের সামনের সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত বিশেষ এলাকায় এসব বাজার বসতে পারবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, হলিডে মার্কেট মূলত পারিবারিক কেনাকাটাকেন্দ্রিক হবে, যেখানে হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যের প্রাধান্য থাকবে।
ব্যবস্থাপনা কমিটি: নীতিমালা অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের হকার ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির মাধ্যমে হকারদের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য স্মার্টকার্ড বা পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। একই সাথে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে ৭ সদস্যের একটি হকার ব্যবস্থাপনা আঞ্চলিক কমিটি গঠন করা হবে যেটি প্রতিটি নির্ধারিত এলাকার জরিপ করে হকারের সংখ্যা নির্ধারণ করবে এবং জায়গা খালি থাকা সাপেক্ষে নিবন্ধন সম্পন্ন করবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিবন্ধন হওয়ায় স্বচ্ছতা ও নজরদারি সহজ হবে। তদারকি জোরদার করতে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি হকারদের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে মাসিক পরিচ্ছন্নতা ফি ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নগরবাসীর সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ‘সিটিজেন চার্টার’ প্রকাশ এবং গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবায়নের পথে কিছু স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জায়গার সীমাবদ্ধতা একটি বড়ো বিষয়। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী হকারদের সংখ্যা ও অবস্থান নির্ধারণে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ফুটপাতকেন্দ্রিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হওয়ায় কিছু অনিয়মও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তবে নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এই খাতকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তাই শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না। বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং কঠোর মনিটরিং জরুরি। একই সঙ্গে হকারদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নিয়ম মানার সংস্কৃতি ছাড়া কোনো নীতিই সফল হবে না। বর্তমান সরকার নগর ব্যবস্থাপনা ও জনবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কারে যে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিচ্ছে, এই নীতিমালা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার এই প্রচেষ্টা সফল হলে ঢাকার নগরজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে বলে আশা করা যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, 'ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬' শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়। এটি নগরশৃঙ্খলা ও মানবিক বাস্তবতার সমন্বয়ে করা সরকারের একটি আন্তরিক উদ্যোগ। এর সঠিক বাস্তবায়ন হলে পথচারীরা ফিরে পাবে ফুটপাত, হকাররা পাবে নিরাপদ কর্মসংস্থান। রফিকুলের মতো হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ পাবে নিশ্চয়তা ও সম্মানের সাথে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ। শৃঙ্খলা এবং মানবিকতার এই অনন্য মেলবন্ধন মেগাসিটি ঢাকাকে আগামীতে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলবে, এটাই আজ সকলের প্রত্যাশা।
#
-লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর (জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়)
পিআইডি ফিচার
মো. নূর আলম:বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখটি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা, অনিশ্চয়তা আর জীবন-জীবিকার কঠিন সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে দেশের ক্রীড়াবিদ ...
মানিক লাল ঘোষ:বাঙালি জাতি চির দুর্বার, চির দুর্দম। যুগে যুগে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। শক্তিবলে অসম হলেও তারা ব্রিটিশদের সামনেও কভু মাথা নত করেনি। পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর দুঃশাসন, অত্যাচা ...
কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল:প্রতি বছর ৫ জুন জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ...
মো. আতিকুর রহমান মুফতিএইতো ক’দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়। যদিও ইরানের কাছে বৈশ্বিক মোট তেলমজুদের কেবল ১২ শতাংশ রয়েছে এবং দেশট ...
সব মন্তব্য
No Comments