আবু জাফর সূর্য:
বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে—এ দেশে সাংবাদিকতা এখনও এক অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও পরস্পরবিরোধী পেশা। বিশেষ করে এখন টিভির বার্তা বিভাগের চারজন সাংবাদিককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে পরে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং তা বাংলাদেশের পুরো গণমাধ্যম কাঠামো, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং মালিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের গভীর সংকটকেই সামনে এনেছে।
এখন টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন—ডিইউজে, জামাত ও বিএনপি সমর্থক—মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি এবং ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, টিভি অফিস তালাবদ্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা আসলে কতটুকু?
একপক্ষের বক্তব্য, কোনো প্রতিষ্ঠানের যেমন নিয়োগের অধিকার রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন হলে চাকরিচ্যুত করার প্রশাসনিক এখতিয়ারও আছে। তবে সেক্ষেত্রে শ্রম আইন, চুক্তি, প্রাপ্য সুবিধা ও যথাযথ প্রক্রিয়া মানতেই হবে। এই যুক্তি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু অপর পক্ষের উদ্বেগও ভিত্তিহীন নয়। কারণ সংবাদমাধ্যমে “যেকোনো অজুহাতে” বার্তা বিভাগের কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ইদানীং ‘মব’ সংস্কৃতি দানবের মতো আচরণ করছে। এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বড় সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম—তাদের জন্য কার্যকর চাকরি বিধি, বেতন কাঠামো ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের ঘাটতি। আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যেসব সংবাদপত্র ও মিডিয়া সোচ্চার, সেসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও সাংবাদিকদের শ্রম অধিকার প্রশ্নে বধির নীরবতা দেখা যায়।
দেশের ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ায় এখনও কোনো কার্যকর জাতীয় বেতন কাঠামো নেই। ফলে কোথাও একজন শীর্ষ নির্বাহীর বেতন লাখ টাকায় পৌঁছায়, আবার একই পেশায় সাংবাদিকতায় স্নাতক একজন তরুণকে ১৫ হাজার টাকায় কাজ করতে হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসংখ্য সংবাদকর্মী আছেন, যারা কোনো বেতন বা সম্মানি ছাড়াই “প্রতিনিধি” পরিচয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন।
এই বাস্তবতায় দেশের সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ পেশাগত সততা নয়, বরং ভাত-কাপড়ের তাগিদে টিকে থাকার লড়াইয়ে বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষ বা রাষ্ট্রক্ষমতার অনুগত হয়ে পড়েন। কারণ তারা জানেন—একবার চাকরি গেলে বিকল্প কর্মসংস্থান প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকারীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও তীব্র। এর ফলে অনেকেই মালিক ও সরকারের “স্বার্থরক্ষাকারী ব্যবস্থাপক” হয়ে ওঠেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের গণমাধ্যম বাস্তবতা এই নির্মম সত্যকে আরও খুলে দিয়েছে। মালিকপক্ষের তুলনায় শতগুণ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা। হত্যা মামলার আসামি হয়ে অনেকে কারাগারে গেছেন, বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটক থেকেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ নিরাপদ থেকেছে, বরং নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে।
একই রাজনৈতিক বাস্তবতায় কারও বিরুদ্ধে “ফ্যাসিস্ট দোসর” তকমা জোটে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা হয় না—এমন দ্বৈত মানদণ্ডও গণমাধ্যমের সংকটকে স্পষ্ট করে। কোনো কোনো সম্পাদক বা সংবাদ ব্যবস্থাপক জেলে গেছেন, কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বহাল তবিয়তে থেকেছেন। আবার এমনও দেখা গেছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে সাংবাদিকদের বহিষ্কার বা মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, অথচ একই ধরনের অবস্থান নেওয়া অন্যরা প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। এই বৈষম্য দেখায় যে, দেশে সাংবাদিকতার বিচার প্রায়ই নীতির ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের এই অস্থিরতা দূর করতে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের সমাধান জরুরি। প্রথমত, গণমাধ্যমের অনুমোদন ও মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ, পদায়ন ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও কার্যকর চাকরি বিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বিভাজন ও রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএফপির মতো প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও জরুরি।
গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণমাধ্যম যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকে না। সাংবাদিকরা কোনো প্রতিষ্ঠানে তালা দিতে চান না; তারা চান কাজের মর্যাদা, ন্যায্য বেতন এবং পেশাগত নিরাপত্তা। তারা মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের পাহারাদার বা সরকারের পিআর মেশিন হতে চান না। আবার মালিক ও সরকারকেও বুঝতে হবে—সাংবাদিকদের অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম গড়ে ওঠে না।
আজ বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের সবচেয়ে বড় দাবি হওয়া উচিত—একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার গণমাধ্যম কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সাংবাদিকরা ভয়ের মধ্যে নয়, দায়িত্ববোধ ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
-লেখক: সাবেক সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।
মানিক লাল ঘোষ:বাংলাদেশে বর্তমানের ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি কোনো দৈব দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ‘মানবসৃষ্ট’ বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক রিপোর্ট স্পষ্টভাবে আঙুল তুলেছে বিগত অন্তর্বর্তীক ...
মোহাম্মদ বিন কাশেম জুয়েল:ঢাকা শহর যেন আবারও নিজের পুরোনো অসহায় চেহারায় ফিরে গেছে। কয়েক ঘণ্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুক ...
এ এম ইমদাদুল ইসলাম:বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো গ্রামীণ অর্থনীতি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে এবং ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস ...
লুতুব আলি:ভাষা যখন মায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখে, তখন তার নাম বাংলা। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ভাষাকেই বারবার ‘সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, ইউনেস্কোর এক পর্যবেক্ষণে উচ্চারণের ...
সব মন্তব্য
No Comments