​জননেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রস্থান: ‘জয় বাংলা’র স্রোতে ভীতিহীন এক জনসমুদ্র

প্রকাশ : 15 May 2026
​জননেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রস্থান: ‘জয় বাংলা’র স্রোতে ভীতিহীন এক জনসমুদ্র

মানিক লাল ঘোষ:

​মৃত্যু অমোঘ, কিন্তু কিছু মৃত্যু পুরো একটি জনপদকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ সাক্ষী হলো তেমনই এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্তের। লাখো মানুষের গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় বিদায় নিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভয় আর প্রতিবন্ধকতাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে চট্টলার মানুষ যেভাবে তাদের প্রিয় ‘মোশাররফ ভাই’কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিল, তা কেবল একটি জানাজা ছিল না; বরং তা ছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতি একটি অঞ্চলের মানুষের ঋণ স্বীকারের মহোৎসব।

​ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল যেন বাংলাদেশের ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা এস  রহমান ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক, যিনি ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য (MLA) নির্বাচিত হয়েছিলেন।  পারিবারিক এই রাজনৈতিক আবহেই গড়ে ওঠে তাঁর প্রারম্ভিক জীবন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং চট্টগ্রাম  আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি পাস করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে যান। ১৯৬৬ সালে लाहोर ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। লাহোরে পড়ার সময় থেকেই তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসৈনিক হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদ’-এর সভাপতি হিসেবে প্রবাসে ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফেরার পর চট্টলার বীর শার্দূল এম. এ. আজিজের হাত ধরে তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন। এম. এ. আজিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও স্নেহে গড়ে ওঠা এই তরুণ নেতা পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাঁরই নির্দেশ ও অনুপ্রেরণায় মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (MPA) নির্বাচিত হন, যা ছিল একজন তরুণ নেতার জন্য এক বিরল গৌরব।

​একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বগাথা চিরস্মরণীয়। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ধুম ও শুভাপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রসদ ও সৈন্য চলাচলের প্রধান পথ বন্ধ করার জন্য ডিনামাইট ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ‘শুভাপুর সেতু’ ধ্বংস করার যে দুঃসাহসিক অপারেশন তিনি পরিচালনা করেছিলেন, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত টার্নিং পয়েন্ট। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষද সদস্য (MCA) হিসেবে তাঁর ছিল সক্রিয় ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনি মিরসরাই আসন থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ মোট ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর (প্রেসিডিয়াম) অন্যতম সিনিয়র সদস্য। তাঁর প্রস্থান তাই কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, একটি গৌরবময় যুগের অবসান বইকি!

​রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন ‘ভদ্র রাজনীতিক’ এবং চট্টগ্রামের আধুনিক রূপকার। গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রামের অবকাঠামো, আবাসন, ফ্লাইওভার, মেগা প্রজেক্ট এবং পর্যটন খাতে যে দূরदर्शी অবদান রেখে গেছেন, তা দলমত নির্বিশেষে সবাই আজ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছে। জানাজায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা ও বর্তমান协同 সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কিংবা সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কণ্ঠ থেকেও যখন তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ প্রশংসা জুটেছে, তখন প্রমাণিত হয়—ব্যক্তি মোশাররফ হোসেন রাজনীতিকে কোন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

​তবে জীবনের শেষ দিনগুলো এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য সুখকর ছিল না। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বার্ধক্য ও নানাবিধ শারীরিক জটিলতা সত্ত্বেও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—কারাগারে এই প্রবীণ নেতাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, যা তাঁর শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পেলেও স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউ থেকে তিনি আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারেননি। ৮৩ বছর বয়সে এই ক্ষণজন্মা রাজনীতিকের চিরবিদায় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করায়।

​ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রূপ নিয়েছিল এক বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশে। কফিন যখন ধুম গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিল, তখন চারদিক থেকে ধ্বনিত হচ্ছিল “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” এবং শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্লোগান। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের এই বিশাল জনসমাগম এবং সাহসিক স্লোগান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে, আদেশকে সাময়িকভাবে কোণঠাসা করা গেলেও মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। নিপীড়ন আর ভয়ের পরিবেশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জানান দেয় যে, তৃণমূল স্তরে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভিত কতটা গভীরে প্রোথিত।

​মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামের মাটি আজ হয়তো তাঁর সন্তানকে চিরতরে বুকে টেনে নিয়েছে, কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রতিটি ফ্লাইওভার, রাস্তা আর ধুলিকণায় মিশে থাকবে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম। পদ-পদবির মোহ ছেড়ে, সমস্ত রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য কাজ করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা সমসাময়িক রাজনীতির জন্য এক পরম শিক্ষা। বীর চট্টলার প্রিয় মোশাররফ ভাই, আপনি ঘুমান শান্তিতে; আপনার প্রিয় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর ভালোবাসার প্লাবনে মুখরিত চট্টলা আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না।

-লেখক: মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।

সম্পর্কিত খবর

;