অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: দেশের অন্যতম পাট উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে পাটের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, ভালো ফলনের প্রত্যাশা এবং বাজারে তুলনামূলক সন্তোষজনক দামের আশায় কৃষকেরা পরিকল্পনার চেয়েও বেশি জমিতে পাট চাষ করেছেন।
তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট এবং পাট সংগ্রহের বাড়তি খরচে সেই আশার আলো অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। ফলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার অধিকাংশ পাটচাষি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহে শেষ পর্যন্ত ৮৭ হাজার ৪০২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭৪ হেক্টর বেশি।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও পাট আড়তে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এ দাম মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে কৃষকদের ভাষ্য, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বাজারদরেও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে লাভের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বোয়ালমারী উপজেলার কৃষক কবির শেখ বলেন, “পাটের দাম কিছুটা ভালো হলেও উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এক বিঘা জমিতে চাষাবাদ করতে যে ব্যয় হয়, বর্তমান বাজারদরে সেই তুলনায় লাভ খুবই কম। প্রতি মণ পাটের দাম অন্তত ৫ হাজার টাকার বেশি হলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পেত।”
নগরকান্দা উপজেলার কৃষক রাজিব ইসলাম বলেন, “এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা শ্রমিক সংকট। সময়মতো পাট কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে পাট অতিরিক্ত পরিপক্ব হয়ে আঁশের গুণগত মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ভাঙ্গা উপজেলার কৃষক সুবোধ সেন বলেন, “পাট কাটা থেকে শুরু করে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই ব্যাপক শ্রমের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এত ব্যয় বহন করে কাঙ্ক্ষিত লাভ করা কঠিন।”
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পাট কাটা চলছে, কোথাও জাগ দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও আঁশ ছাড়ানোর কাজ পুরোদমে চলছে। তবে অধিকাংশ কৃষকের অভিযোগ, শ্রমিকের অভাবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের মতে, কয়েক বছর ধরে অনেক কৃষি শ্রমিক বিকল্প পেশায় চলে যাওয়ায় মৌসুমি শ্রমিকের ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।
ফরিদপুরের পাট আড়ৎদার সুজন মাতুব্বর জানান, চলতি মৌসুমে বাজারে ভালো মানের পাট আসছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাটের দাম ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা এবং দেশের পাটকলগুলোর ক্রয় পরিস্থিতির ওপর ভবিষ্যতের বাজারদর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, কৃষকেরা যদি পাট ভালোভাবে শুকিয়ে বাজারে আনেন, তাহলে উন্নতমানের পাটের জন্য আরও বেশি মূল্য পাওয়া সম্ভব।
জেলার কয়েকজন পাটকল মালিকের মতে, পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ায় প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে পাটের চাহিদাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কাঁচাপাটের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং রপ্তানি আদেশের ওপর বাজারদরের ওঠানামা নির্ভরশীল। তারা মনে করেন, পাটের ব্যবহার ও রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পাবেন।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় পাট আবাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর। কৃষকদের উৎসাহ ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ৮৭ হাজার ৪০২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংকট বর্তমানে একটি বড় বাস্তবতা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকেরা যাতে সময়মতো পাট সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ‘সোনালি আঁশ’ পাট আবারও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের ফলে পাটের চাহিদা বাড়ছে। তবে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক সংকট নিরসন, উন্নত জাতের পাটের সম্প্রসারণ এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
জেলার কৃষকদের প্রত্যাশা, বাজারে প্রতি মণ পাটের দাম ৫ হাজার টাকার ওপরে উঠলে এবং উৎপাদন ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি কৃষক পাট চাষে আগ্রহী হবেন। আপাতত ভালো ফলনের আশা থাকলেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তাদের সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম): ধানক্ষেতে ঘাস দমনে প্যারাকোয়াট ছিটান রাজারহাট উপজেলার কৃষক আবদুল করিম (৪৮)। কিন্তু কাজের সময় তাঁর হাতে থাকে না গ্লাভস, মুখে থাকে না মাস্ক, চোখেও কোনো সুরক্ষা ...
অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: দেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভে উৎপাদিত পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকরা। উৎপাদন ব্যয়ের তুল ...
হাসান মামুন, পিরোজপুর: দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরে একসময় লিচু চাষের কথা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। সেই ধারণাকে বদলে দিয়ে নাজিরপুর উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হংসপতি মিস্ত্রী গড়ে তুলেছে ...
রাজু ভূঁইয়া,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের বন্যাক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। শনিবার, ৬ জুন সকাল ১১টায় ...
সব মন্তব্য
No Comments