সরদার মোঃ শাহীন:
ভালবাসা এবং পানির মধ্যে একটি জায়গায় দারুণ মিল। স্বভাবগত ভাবে এই দু’টোই কেবল নীচের দিকে নামে; এরা কখনোই উর্ধ্বমুখী হয় না। পানিকে যেখান থেকেই ছাড়ুন না কেন ভুলেও উপরের দিকে যাবে না। ঘুরে ফিরে ঢালু বা নীচের দিকে নামবে। পানি সব সময় নিম্নগামী হয় পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণেই। একই কারণে না হলেও ভালবাসাও ঠিক তেমনি।
বাবা-মা সন্তানকে যতটুকু ভালবাসে, সন্তান কি ঠিক ততটুকু বাবামাকে ভালবাসতে পারে? পারে না। সব সন্তান বাবামায়ের কাছ থেকে যেটুকু ভালবাসা পায় তার পুরোটাই ফিরিয়ে দেয় তার নিজের সন্তানকে; বাবামাকে নিশ্চয়ই নয়। সেই সন্তান দেয় তার পরবর্তী সন্তানকে। কেউ ভুলেও পেছনে তাকায় না; পেছনের কথা ততটা ভাবে না। ভালবাসাবাসির এই প্রবণতা গতানুগতিক ধারায় কেবল নীচের দিকেই নামে। বিজ্ঞানী নিউটন বেঁচে থাকলে এই ব্যাপারে সুন্দর করে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারতেন।
আমার কাছে ব্যাখ্যা নেই, তবে অনুভূতি আছে। গেল এক বছর হলো দূরদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে বলে আমার শোনিমের কাছে আর তেমন করে থাকা হয় না আমার। অফিসিয়াল কাজে ঘন ঘন বাইরের দেশে যাওয়া হয় কিন্তু শোনিমকে পাশে পাওয়া হয় না। সমস্যাটা হয় এখানেই। সফরে শোনিমের অনুপস্থিতি বাবাকে যন্ত্রণা দেয়। দেখার মত নতুন কিছু চোখে পড়লে চোখ ভিজে আসে। শোনিমকে না দেখাতে পারার কষ্টে চোখের এই সমস্যা।
রাতে হোটেলে ফিরলে সমস্যা আরও বাড়ে। বিছানা বালিশে ওর গন্ধ পাই না বলে চোখ ভরে আসে জলে! নিজেকে সামাল দেয়াই জটিল হয়ে পড়ে। সারা হোটেল রুমে চোখ খুঁজে বেড়ায় শোনিমের মুখটি। অথচ আমার জন্মদাতা বাবার মুখটি দেখিনা আজ প্রায় ২৯ বছর! আর কোনদিন দেখবোও না! তারপরেও পাষন্ড আমি তাঁর মুখ খুঁজি না। খুঁজিনা তাঁর গায়ের গন্ধ! হেসে খেলেই বেঁচে আছি আজও!
জাপানীজরা আরও ভাল করে বেঁচে থাকে। এদেশের সন্তানেরা আরও বেশি নিষ্ঠুর হয় বাবামায়ের প্রতি। কোন মতে বয়স ষোল পেরোলেই আলাদা থাকা শুরু; আলাদা জীবন, আলাদা মরণ। একই শহরে থেকেও তাদের মাঝে কালেভদ্রে কদাচিৎ দেখা হয়। বিশেষ কোন প্রয়োজন ছাড়া কখনো ফোনেও কথা হয় না। এটাই যেন এখানকার নিয়ম। সবাই ব্যস্ত; কেউ ব্যস্ত কাজ নিয়ে, কেউ বা জীবনসঙ্গী। রক্তের সম্পর্ক এদের টানে না। পারিবারিক সম্পর্ক এদেরকে বেঁধে রাখতে পারে না। এদেরকে নিয়ে লেখার মত অনেক ভাল দিক আছে। আমি লিখেও চলেছি অবিরাম। কিন্তু তাদের পারিবারিক বন্ধন নিয়ে লেখার মত ভাল কোন দিক নেই। পরিবার প্রথা উঠে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
আবার এদের জীবন এতটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক যে ভালবাসা শেয়ার করলেও দুঃখ কষ্ট কিংবা বেদনা এরা পারতপক্ষে কারো সাথেই শেয়ার করে না। সব কিছুই লুকিয়ে রাখার প্রবণতা এদের মাঝে প্রকট। তবে শুধু মা বাবা নয়, সন্তানও নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। যতক্ষণ সম্ভব বাবা-মাকেও সন্তান জানায় না নিজের বেদনার কথা। নিজের কারণে অন্যকে বিব্রত করা জাপানীজদের স¦ভাব বিরুদ্ধ। বাংলাদেশে সত্যি সত্যি অসুখ হলে তো কথাই নেই; অসুখ না হলেও মিথ্যে অসুখের কথা বলে অফিস কামাই করে। কথায় কথায় শরীর খারাপের দোহাই দেয়। অথচ একবারও বিবেচনা করে না যে এটা তার দুর্বলতা, শারীরিক অযোগ্যতা। জাপানে অসুখ হলেও অফিসকে জানায় না। সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি না হলে শারীরিক অযোগ্যতাকে জানান দিয়ে বাড়তি কোন সুবিধে নেবার আশায় থাকে না; বরং চাকরি হারাবার ভয়তে থাকে।
শারীরিক যোগ্যতার জন্যে ব্যায়াম করা খুবই জরুরি। এদেশে আমরা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন। ব্যায়াম তো করিই না; উল্টো তৈলাক্ত খাবার নিত্য বেলায় খাই। পারতপক্ষে সামান্যতম হাঁটার চেষ্টাও করি না। শরীরটাকে ঠিক রাখার জন্যে হাঁটা যে কতটা জরুরী তা আমরা একটুও অনুভব করি না। আবার হাঁটবো কি? ঘর থেকে বেরোলেই তো রিক্সা পেয়ে যাই; তাই হাঁটতে হয় না। জাপানে রিক্সা নেই; তাই ওরা ঘর থেকে বের হয় সাইকেল নিয়ে। যার ৩টে গাড়ি থাকে, সেও সাইকেল চালায়। ছুটির দিন ছাড়া সাধারণত গাড়ি চালানো হয় না। সাইকেল চালানো একটি বিরাট ব্যায়াম। এ দেশে শুধু সাইকেল আর সাইকেল। আমি প্রতিদিন অন্তত ১০ কিমি সাইকেল চালাই। শুধু আমি নই, সবাই চালায়।
জাপানে ফুটপাত হলো সাইকেল আর মানুষ হাঁটার রাস্তা। কিন্তু আমাদের মত সাইকেলের বেল বাজাবার রীতি ওদের নেই। ভুলেও কেউ সেটা বাজায় না। সামনে মানুষ হাঁটছে অথচ পেছনের সাইকেল চালক বেল না বাজিয়ে আস্তে আস্তে এগুচ্ছে আর অপেক্ষায় থাকছে কখন তাকে সামনের মানুষটি দেখে। কারণ ফুটপাতে প্রথম অধিকার হেঁটেচলা মানুষের, এরপর সাইকেলের। আর রাস্তায় প্রথম প্রাইভেট কার, তারপরই বাস এবং ট্রাক। একটি অদ্ভুত ব্যাপার আছে এ দেশে। এ দেশের বাড়িতে তালা লাগে না, গাড়িতে তালা দিতে হয় না; কিন্তু সাইকেলে দিতে হয়। গাড়ির মত করেই সাইকেলের নাম্বারপ্লেট থাকে; এটা বাধ্যতামূলক। এখানকার পুলিশ বড় কড়া। আইন না মানলে বিপদ হয়।
একবারের কথা। জাপানে ভার্সিটি ছেড়ে কর্মজীবনে কেবল প্রবেশ করেছি। একদিন কথার ফাঁকে আমার অফিসের বস জানতে পারলেন, আমার সাইকেল এখনো কেনা হয়নি। তিনি হন্তদন্ত হয়ে সাইকেলের ব্যবস্থায় নামলেন। এবং সন্ধ্যের আগে আগে মাইক্রোতে করে কিছুদিন আগে কেনা নিজের ব্যবহার্য সাইকেলটি আমার বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেলেন। একদিকে বসের ভালবাসা মাখা আদর আর অন্যদিকে ফ্রি একটা সাইকেলের ব্যবস্থা হয়ে যাওয়াতে আমি তো দারুণ আপ্লুত। খুশিতে টগবগ আমি বাসার সামনে নেমেই সাইকেল পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়লাম।
তখন সন্ধ্যা হয় হয়। পাশ দিয়ে সাদা সাইকেলে চড়ে টহল পুলিশ যাচ্ছে। আমাকে সাইকেল মোছামুছি করতে দেখে দাঁড়িয়ে গেল সন্দেহপ্রবণ মানুষটি। কাগজপত্র দেখতে চাইলো; আমি দিতে পারলাম না। পরে নাম্বারপ্লেট দেখে কোথায় যেন ফোন করে কনফার্ম হলো এটা আমার সাইকেল নয়। আর যাই কোথায়? খুব সম্মান করেই অনুরোধ করলো পাশের পুলিশ ফাঁড়িতে যেতে। আমি নাছোড় বান্দা, যাবো না।
ফাঁড়িতে ফোন দিয়ে পুলিশ বেটা কারো সাহায্য চাইলো। তিন মিনিটের মাঝে মোটাসোটা আরো একজন পুলিশ এসে হাজির। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। অগত্যা আমাকে হার মানতেই হলো। পুলিশ এসকর্টে আমি হাঁটছি সামনে। আর পেছনে পেছনে হেঁটে আসছে সদ্য বিবাহিতা আমার নববধূ। পূরোপুরি কিছু না বুঝে উঠতে পারলেও এইটুকু বুঝতে পারছে, স্বামীবেটা তার সাইকেল চোর!
তবে ফাঁড়িতে পৌঁছার পর পুলিশের সমাদরের মাত্রা বেড়ে গেল। কয়েকবার ওরা আমার কাছে মাফ চাইলো বিব্রত করার জন্যে। চা দিল, বিস্কিট দিল; কেবল দিল না আমার বউকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি।
এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু একটু পর পাশের ঘরে নিয়ে গেল। আধা অন্ধকার ঘরে কোন জানালা নেই, তবে এয়ারকন্ডিশন আছে। আর আছে মোটা সাইজের বেশ কয়েকখানা লাঠি; দেখলেই কলিজা কচৎ করে উঠে। এক পর্যায়ে মোটাসোটা একজন পুলিশ অফিসার টেবিলের একপাশে আমাকে বসিয়ে অন্যপাশে নিজে দাঁড়িয়ে মুখে ভেংচি দিয়ে বললো, এই লাইনে কতদিন?
আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ব্যাটা বলে কী? ঠান্ডা এসির মাঝে বসেও গায়ের ঘাম ঝড়া শুরু হলো। উত্তর দেবার আগেই জিজ্ঞাসা, সাইকেল ছাড়া আর কী কী চুরি করি? দোকানে ঢুকে চুরির অভ্যাস আছে কি না? না জেনে অন্যের সাইকেল গ্রহণ করে আজ মহা বিপদে পড়ে গেলাম। জিহ্বা আমার শুকিয়ে একাকার। পুলিশ ব্যাটা আর একটি তীর্যক প্রশ্ন করলে বাথরুমে যাওয়া লাগবে না আমার। চেয়ারে বসেই কাপড় মাখিয়ে ফেলবো।
তবুও চারপাশে বাথরুম খুঁজছি। বাথরুম কেন, কিছুই দেখি না; দেখি শুধু পুলিশ। পুলিশ দেখি, আর দেখি লাঠিগুলো! অগত্যা আল্লাহকে ডাকছি; তিনিই রহমানুর রাহিম। যত সূরা জানা আছে সব পড়ে শেষ করছি। বার বার লা ইলাহা ইল্লা আনতা সোবাহানাকা পড়ছি, আর ভাবছি আমার বসের কথা। তিনি আসা ছাড়া আজকে এখান থেকে আমার বেরোবার আর কোন পথ নেই!
-লেখক: সম্পাদক, সিমেকনিউজ২৪ ডটকম।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments