জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি ॥ পরামর্শ সভায় বিশেষজ্ঞবৃন্দ

প্রকাশ : 11 Apr 2026
জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি ॥ পরামর্শ সভায় বিশেষজ্ঞবৃন্দ


স্টাফ রিপোর্টার: জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞবৃন্দ। তারা বলেছেন, বর্তমান কার্বন মার্কেট ও কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাগুলো উন্নত দেশসমূহকে দূষণ চালিয়ে যাওয়ার পরোক্ষ বৈধতা দেয়। তাই ফজিল ফুয়েল থেকে বেরিয়ে আসার রোডম্যাপ তৈরির পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তর : প্রেক্ষিত ন্যায্যতা ও অর্থায়ন’ শীর্ষক পরামর্শ সভায় এ সব কথা বলেন তারা। টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং ফসিল ফুয়েল ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত পরামর্শ সভায় সভাপতিত্ব করেন ধরা’র সহ-আহবায়ক এম. এস. সিদ্দিকী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের গবেষণা প্রধান মো. ইকবাল ফারুক।

সভায় সূচনা বক্তব্যে ধরা’র সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, শুধুমাত্র ফসিল ফুয়েল থেকে বের হওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করলেই যথেষ্ট নয়। এর সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক অভিঘাতে কৃষক, জেলে, নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠি অভাবনিয় দূর্দশার বিষয় জড়িত। তাই স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, জ্বালানি ট্রানজিশন কেবল জলবায়ু নয়, আমাদের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু নীতিনির্ধারণের জায়গায় সেই দূরদর্শী চিন্তার ঘাটতি স্পষ্ট। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল আমদানি নির্ভরতা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ট্রানজিশনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। সোলার খাতে ঘোষিত কম শুল্ক বাস্তবে অতিমূল্যায়নের কারণে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে বাধাগ্রস্থ করছে। শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ন্যায্য নীতি এবং সহজ অর্থায়ন ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই রূপান্তর অর্জন সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের ফলে বাংলাদেশ ক্রমেই এলএনজি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করছে। এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় ও ভর্তুকির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে তা আরো সাশ্রয়ী ও টেকসই হতে পারত। বিদেশি প্রভাবের কারণে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় জাতীয় সক্ষমতা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে বাংলাদেশ ‘লক-ইন’ পরিস্থিতিতে পড়েছে। সোলার রূফটপ ব্যবস্থায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবজনিত আস্থার সংকট দূর করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি)-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, জাস্ট ট্রানজিশন শুধু ফসিল ফুয়েল থেকে বের হওয়া নয়, বরং অ্যাডাপ্টেশন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতার প্রশ্নের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু গ্লোবাল আলোচনাকে আমরা এখনো কার্যকরভাবে জাতীয় নীতিতে রূপ দিতে পারিনি। আমাদের এনডিসি, ন্যাপ ও এলটি-লেডস-এ স্পষ্ট রোডম্যাপ দরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি না হলে জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়ন অসম্ভব।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) আবুল কালাম আজাদ বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সমর্থন এবং বাস্তবতা ইতোমধ্যেই আমাদের পক্ষেই আছে; কেবল মঞ্চটি এখনো ফসিল ফুয়েল লবির দখলে। এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো, সক্রিয় উদ্যোগ, নীতিগত চ্যালেঞ্জ এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই মঞ্চ দখল করা। ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী বাংলাদেশে ট্রানজিশনের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

সভায় আরো বক্তৃতা করেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. কাজী জাহেদ ইকবাল, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোহাম্মদ আলী, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, রিভার বাংলা’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, ব্রাইটার্স-এর ফারিহা অমি, ইউথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস-এর সোহানুর রহমান, ইউক্যান-এর যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস, কসমস-এর মেহনাজ মালা, ওএবি ফাউন্ডেশনের আসাদুজ্জামান তুহিন, রিভারাইন পিপল-এর এফ এম আনোয়ার হোসেন প্রমূখ।


সম্পর্কিত খবর

;