মোঃ নূর আলমঃ প্রতিবারের মতো এবারও সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় রিমালের ছোবল থেকে মায়ের মতো বুক পেতে আমাদের রক্ষা করেছে। যদিও ৭ জেলায় ১৬ জনের মৃত্যুর খবর প্ওায়া গেছে। সুন্দরবন না থাকলে এই মৃত্যুর হার হয়তো আরো বেশি হতো। বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি ১২৭টি হরিণ ও ৪টি বন্য শুকরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ১৮টি হরিণ এবং ১টি সাপ জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরো ব্যাপক যার হিসাব কারোর কাছে নেই। এমতাবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করছে, সুন্দরবনকে রক্ষা করবে কে? ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রেক্ষিতে ৫ জুন ২০২৪ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে উপকূলীয় জনগোষ্ঠির কাছে এই প্রশ্ন খুবই প্রাসংগিক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন অন্যান্য বনের চেয়ে বেশি কার্বন ধরে রেখে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমিত করে ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক সেবা প্রদান করে। বন বিভাগের তথ্যমতে সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। ৫০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ৩৫টি প্রজাতি রয়েছে সুন্দরবনে। এছাড়া সুন্দরবনে ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এদের মধ্যে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রানী আছে। সুন্দরবনে ৩০০ প্রজাতির স্থানীয় পাখি আছে। ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি মাছ, ১৩ প্রজাতির কাকড়া ও ৪২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক আছে। সুন্দরবনের দুবলার চরে শুটকী পল্লীতে ২০ হাজার জেলে শুটকী মাছ তৈরির সাথে যুক্ত আছেন। ৩৫ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের জলাভূমির গুরুত্ব স্বীকার করে ১৯৯২ সালে ৫৬০তম রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ৭৯৮তম প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে বাঘের একমাত্র আবাসস্থল হলো সুন্দরবন।
ঘূর্ণিঝড় রিমালের গতিবিধি থেকে বোঝা যায়; যে অঞ্চলে সুন্দরবন নেই সেখানে বাতাসের গতিবেগ ছিলো সর্বোচ্চ। প্রাণীর জীবন ধারক অক্সিজেন ও কার্বনডাই অক্সাইডের আদান-প্রদানের মাধ্যমে সুন্দরবন স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ফুঁসফুঁস বিশ^ ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ মানুষের অত্যাচারের ক্ষতবিক্ষত। ঘূর্ণিঝড়ের রিমালের ক্ষত হয়তো অভিযোজনের মাধ্যমে সুন্দরবন কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু সুন্দরবনের উপর মানুষের অত্যাচার চলতে থাকলে সেই ক্ষতি সুন্দরবন কাটিয়ে উঠতে পারবেনা। সুন্দরবনে বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণী হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। বাঘ শিকারে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র সুন্দরবনের সক্রিয় আছে এমন খবর গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবন হতে সকল ধরণের বনজদ্রব্য সংগ্রহ-আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও এসমেয় অবৈধ ভাবে কাকড়া, চিংড়িসহ মাছ আহরণের খবর গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হয়। সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ নিধনের খবর অহরহ শোনা যায়। এরফলে জলজপ্রাণীসহ মৎস সম্পদ একদিন নি:শেষ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। সুন্দরবনের বাফারজোনের মধ্যে অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে ঝুঁকিতে আছে সুন্দরবন । মানবসৃষ্ট অগ্নিকান্ডের ফলে সুন্দরবনের শতাধিক একর বনভূমির গাছপালা ইতিমধ্যে পুড়ে গেছে। বন বিভাগ দাবি করছে ঘূর্ণিঝড় রিমালে সুন্দরবনের মধ্যে শতাধিক সুপেয় পানির পুকুর নোনা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে বন্য প্রাণীদের সূপেয় পানির সংকট তীব্র হবে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে পুকুর খনন, পুকুরের পাড় উচু করা, টিলা/কিল্লা নির্মান কাজে ইতিমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে দুদকে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী মৃতের খবর ও সুন্দরবনের ক্ষতচিহ্ন বেরিয়ে আসায় এসব উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন উপকূলীয় জনগোষ্ঠি ও পরিবেশকর্মীরা। অভিযোগের এসেছে আদৌ এসব উন্নয়ন প্রকল্প যথাযথ ভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কী না তা নিয়ে। সুন্দরবন দখল-দূষণে আক্রান্ত। বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে সুন্দরবন সংলগ্ন নদী খালে। সম্প্রতি দেশি-বিদেশি কয়েকটি খ্যাতিমান বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণার রিপোর্ট থেকে জানা গেছে সুন্দরবনের প্রাণ পশুর নদী, মোংলা নদী এবং রুপসা নদীতে প্লাস্টিক দূষণ মারাত্মক আকারে বেড়েছ্।ে এই তিন নদীর ১৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের দেহে মাইক্রো প্লাস্টিকের কণা পাওয়া গেছে। এসব মাছ খেলে মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। যে সুন্দরবন সিডর-আইলা-ফণি-আম্পান-বুলবুল-মহাসেন-ইয়াস এবং সর্বশেষ রিমালকে মায়ের মতো বুক পেতে মোকাবেলার মাধ্যমে আমাদের রক্ষা করেছে; সেই সুন্দরবন দখল-দূষণ এবং মানুষের অত্যাচারে আক্রান্ত। বিস্ময়ের বিষয় হলো সুন্দরবন আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে আজো গুরুত্বহীন। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আজ উপকূলীয় জনগোষ্ঠিসহ পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করছে, সুন্দরবনকে রক্ষা করবে কে? ঘূর্ণিঝড় রিমালের ছোবল ও তান্ডবতা মোকাবেলার পরে সুন্দরবনের গুরুত্ব সরকার ও দেশবাসীর সামনে ব্যাখা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। তাই আসুন সুন্দরবন বাঁচাই, উপকূল বাঁচাই, দেশ বাঁচাই।
-লেখক: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক।
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments