দ্রোহ আর প্রেমের ফাল্গুন!

প্রকাশ : 13 Feb 2025
দ্রোহ আর প্রেমের ফাল্গুন!


সামসুল আলম সজ্জন:

পয়লা ফাল্গুনের হাত ধরে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা ধ্বনিত হয় এই ফেব্রুয়ারিতেই। শীতের শুষ্কতা শেষে বসন্তের আগমনে বিবর্ণ প্রকৃতি নিজেকে নতুন রূপে রাঙিয়ে তোলে, ফিরে পায় প্রাণ। বুকের ভেতর ছড়ায় ভালোবাসার আবেগ। আবার এই ফাগুনেই তারুণ্যের বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল।


বাঙালি জাতির ইতিহাসে ফিরে তাকালেই দেখা যায়, এই ফেব্রুয়ারি, ফাগুন আর বসন্ত মিলে একাকার হয়ে যায় বাঙালির প্রেম, দ্রোহ, আর বিপ্লবে!


স্মরণ করছি, ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার এরশাদের কুখ্যাত মজিদ খান কমিশনের গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, ছাত্রবন্দিদের মুক্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে শহীদ জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, মোজাম্মেল, আইয়ূব, কাঞ্চনসহ নাম না জানা, গুম হয়ে যাওয়া সকলকে। ১৯৮৫–এর এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতেই (১৩ ফেব্রুয়ারি) শহীদ হয়েছেন রউফুন বসুনিয়া। গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সকল শহীদের সংগ্রামী স্মৃতির প্রতি।



ফেব্রুয়ারি একাধারে বাঙালির বুকে ভালোবাসা আর দ্রোহের মাস। তাই এই ফেব্রুয়ারির কোনো দিবসকে তথাকথিত ভালোবাসার কথা বলে আলাদা করার প্রয়োজন পড়ে না। অবাধ পুঁজিবাদের পথ পরিক্রমায় অনেকেই বাঙালির দ্রোহটুকু এড়িয়ে, ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের রক্তাক্ত লড়াইয়ের ইতিহাস আড়াল করে দিনটিকে নিছক ভালোবাসার বেচা-কেনার সওদা হিসেবে দেখাতে চায়। তাতে লাভ হয় শাসকের, বিস্তৃত হয়—শোষণের যাঁতাকল। 


৮৩’র আগুনঝরা মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের অগণতান্ত্রিক নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে ছাত্রসমাজ বুকের তাজা খুন ঢেলে দিয়েছিল। এরশাদের শিক্ষা উপদেষ্টা মজিদ খান ঘোষিত সাম্প্রদায়িকীকরণ আর বাণিজ্যিকীকরণের বাধ্যতামূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।


কিন্তু বিধি বাম! মধ্য ফেব্রুয়ারির সেই আন্দোলনের চার দশক আর নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সাড়ে তিন দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই মজিদ খানও পরবর্তী সময়ে দেশে-বিদেশে শিক্ষা নিয়ে তার তৎপরতা বন্ধ করেননি। ৯০-এর দশকের শুরুতে এই বাংলাদেশে ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ সেই নীতিতে বেসরকারি (প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুও তার হাত ধরে। উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মূল লক্ষ্য যেখানে হবে এযাবৎকালের বিশ্ববিদ্যা, তথা অর্জিত জ্ঞানের বিস্তার এবং নতুন জ্ঞান সৃজন—সেখানে বিগত দেড়-দশকে পরীক্ষা পাসের হিড়িকে রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়; বিস্তৃত হয়েছে রমরমা শিক্ষা-বাণিজ্য।


হাল আমলে এই ২০২৪-এর রক্তাক্ত জুলাই পেরিয়ে আগস্টে সংঘটিত হয়েছে ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার তাজা খুনের উপর দিয়ে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গোটা দশেক কমিশন গঠিত হলেও হয়নি শিক্ষা সংস্কার কমিশন! রাষ্ট্রের শিক্ষা-ভাবনার ক্ষেত্রে সাধিত হয়নি মৌলিক কোনো পরিবর্তন। সাধারণ, ইংরেজি আর মাদ্রাসা শিক্ষার গোলকধাঁধায় বিভাজিত শোষক আর শোষণের শিক্ষাক্রম বরং বহাল তবিয়তেই রয়েছে। 



৮৩–এর মধ্য ফেব্রুয়ারির সেই চেতনা ম্রিয়মাণ বলেই হয়তো কল-কারখানা থেকে শুরু করে খেতে-খামারে কর্মরত শ্রমিকের আর শ্রমিকের দাবিতে শিক্ষার্থীর মেলবন্ধনে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতার সর্বব্যাপী সংগ্রামে রচিত সুড়ঙ্গের শেষে দেখা আশা জাগানিয়া আলোও জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে ফিকে হয়ে যায়। ২৪’র গণঅভ্যুত্থানে এত এত প্রাণ নাস আর আহতের ভিড়ে আজও চোখে পড়ে না—বিচারহীনতার অদ্ভুত সংস্কৃতি আর দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের পাতা ফাঁদ থেকে মুক্ত হওয়ার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। ফ্যাসিষ্ট বিতাড়িত হলেও বদলায়না ফ্যাসিজম। “নতুন বন্দোবস্তের” মুখরোচক বাণী হরহামেশাই শুনতে পেলেও বাস্তবে সেই আশায় গুড়েবালি!


প্রতিনিয়তই নিঃস্ব হচ্ছি আমরা। ভেঙে পড়া একের পর এক প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত হয়ে কবে আমাদের জীবনের ক্ষত সারাবে! আমরা এখনও পথ হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছি—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) সম্বলিত একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ আর নতুন করে ভৌগোলিক-আঞ্চলিক-অর্থনৈতিক দখল-বেদখলের যুদ্ধ-বিগ্রহের এই বৈশ্বিক সংকটের সময়ে কীভাবে ঘোচাব আমাদের ঘোর অমনিশা কাল।


বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, ততদিন থাকবে পহেলা ফাগুন আর বসন্তের আগমনী গান। বাসন্তী রঙের শাড়ির পাশাপাশি নানা রং-বেরঙের পোশাকে নিজেদের রাঙিয়ে তুলবেন তরুণ-তরুণীরা। প্রকৃতির রং আর পোশাকের রং মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তার সাথে ভালোবাসার কম-বেশি সম্পর্ক নিশ্চয়ই থাকবে। তার মানে এই নয় যে, বাঙালি তারুণ্য এই ফেব্রুয়ারিতে সংগ্রাম বিবর্জিত ভালোবাসার বর্ণিল রঙেই কেবল মাতোয়ারা হবে। বরং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আত্মোপলব্ধিতে জাগ্রত আজকের তরুণেরাই নিজেদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দ্রোহ আর ভালোবাসার ফল্গুধারায় একদিন রাঙিয়ে তুলবে সমগ্র জাতিকেই।


-লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক ছাত্রনেতা।


সম্পর্কিত খবর

;