॥ মুক্তার হোসেন
নাহিদ ॥
ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত
বিজয় অর্জন। নবযাত্রায় অন্তরবর্তীকালীন সরকারের শপথ। লক্ষ্য রাষ্ট্র সংস্কার। বৈষম্যহীন
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ। নিঃসন্দেহে দেশ ও জনতার কল্যাণে শুভ উদ্যোগ। কিন্তু সেই স্বপ্নের
বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ। কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি,
বৈদেশিক রেমিটেন্স, প্রশাসন-রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে সংস্কার ও উন্নয়নে সবার আগে দরকার
মেধাসম্পন্ন নাগরিক। প্রয়োজন মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। এর জন্য ‘শিক্ষা’র
বিকল্প নেই। অথচ আমাদের দেশে পরিকল্পনাহীন-অবহেলা নামক ‘মহারোগে’ ধুকছে বহুকাল ধরে।
একটা সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষা কমিশন এ জাতি আজো পায় নি। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের
এই মহৎ উদ্যোগে সবার আগে শিক্ষা সংস্কারে নজর দিতে হবে। পাল্টাতে হবে বহুল সমালোচিত
প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষা ক্যারিকুলাম।
বিদায়ী সরকার চতুর্থ
শিল্পবিপ্লবের সাথে খাপ খাইয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় টিকতে বিশ^মানের
নাগরিক গড়ে তুলতে শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। পাল্টে দেয় শিক্ষা ক্যারিকুলাম। লক্ষ্য
ছিল আগামী প্রজন্মকে প্রজননস্বাস্থ্য, বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, হিজড়া
ও ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, জেন্ডার সমতার ধারণা দেওয়া ও পরিবারের
কাজ যে সবার কাজ, এটা বুঝানো। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী মানুষ, দেশের
আর্ট, কালচার, ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়াও ছিল নতুন ক্যারিকুলামের মূল উদ্যেশ্য।
বাংলাদেশ, পরিবেশ পরিচিতি, সমাজবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ধারণাগুলোকেও পরিষ্কারভাবে
তুলে ধরা। শিক্ষার্থীরা যাতে প্রেক্ষাপটনির্ভর অভিজ্ঞতা, প্রতিফলনমূলক পর্যবেক্ষণ,
বিমূর্ত ধারণায়ন ও সক্রিয় পরীক্ষণ-শ্রেণি কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে
পারে-তারও চেষ্টা ছিল। নতুন শিক্ষাক্রমে দক্ষতা, জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে
শিক্ষার্থীরা যেন আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে-তারও একটা প্রচেষ্টা ছিল। সবই তো
ভালো উদ্যোগ, তাহলে কেন এত সমালোচনা?
বিপত্তিটা সেখানেই।
উদ্যোগ ভালো হলেও, প্রয়োগ পদ্ধতিতে ছিল বড় রকমের জটলা। ঢাল, তলোয়ার ও কৌশল প্রশিক্ষণবিহীন
কোনো সৈনিককে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠালে সে যুদ্ধে সফলতা কামনা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। নতুন
ক্যারিকুলামে সেটাই ঘটেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করে, শিক্ষকের
অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত না করে, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই এমন একটি
শিক্ষা ক্যারিকুলাম জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ফলে নতুন এই ক্যারিকুলাম
যেমন অভিভাবকরা গ্রহণ করতে পারে নাই, তেমনি গ্রহণ করতে পারে নাই শিক্ষকরাও। চাপে পড়ে
কেবল গিলেছেন মাত্র। তাছাড়া সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন শিক্ষার কর্তাবাবুরাও। তারাও সঠিক
সময়ে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্দেশনা দিতে পারে নাই। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পাঠদান ও
মূল্যায়ন পদ্ধতিতে। গ্রামের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকবৃন্দ তো দুরের কথা, শহুরে শিক্ষকরাও ছিলেন
ধোঁয়াশার মধ্যে। সবার মধ্যে একটাই ধারণা হয়েছিল এমন ক্যারিকুলাম শিক্ষায় মঙ্গল বয়ে
আনতে পারবে না।
পারবেই বা কেমন করে।
খেলায় খেলোয়াড়রা যদি জানে তাদের খেলতে হবে তবে গোল না করলেও চলবে, তখন সেই খেলোয়াড়
মোটেও পরিশ্রম করে খেলবে না। কেবল তাল মেলাবে মাত্র। নতুন ক্যারিকুলামের শিক্ষার্থীদের অবস্থাও তেমন। তারা জানে শ্রেণি পাঠদান
শেষে যে মূল্যায়ন হবে তাতে কেবল হাজিরা দিলেই তরী পার হওয়া ঠেকায় কে! ফলে এই ক্যারিকুলামে
শিক্ষার্থীরা শ্রেণিতে উপস্থিতি থেকেছে ৯৫ ভাগ। কিন্তু বই ও পড়ার টেবিলের সাথে তাদের
কোনো সম্পর্ক নেই।
সেকারণেই অভিভাবকদের
অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাচ্ছে আর আসছে। তেমন কিছুই পড়ছে না। এমনকি বাড়ির কাজও
করতে হচ্ছে না। প্রাইভেট-টিউশনি লাগছে না। এটি আসলে কোনো পড়াশোনাই না। পরীক্ষাবিহীন
এই পড়াশোনায় তাদের আস্থা নেই। তারা মনে করছেন-বাচ্চারা প্রচুর পড়বে, হোমওয়ার্ক থাকবে,
টিউটর থাকবে। পরীক্ষা দেবে, উত্তরপত্রে লিখবে, শিক্ষকরা মূল্যায়ন করবেন।
সত্যিই তাই, এ পদ্ধতিতে
শিক্ষার্থী মূল্যায়নটা খুবই জটিল। সঠিক মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাটা মহা ভাবনার বিষয়।
শিক্ষার্থীর একক কাজ, দলীয় কাজ, জোড়ায় কাজ দেখে মূল্যায়ন করতে গেলে সঠিক মূল্যায়ন করা
যায় না। তাছাড়া এসব কাজের সময় তারা সততার পরিচয়ও ঠিকমতো দেয় না। বাসায় ইউটিউব দেখে
শ্রেণি মূল্যায়নে লিখে। একজন লিখলে সবাই তার দেখে লিখে। লেখার যতেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষকের কিছু বলাও নেই। শ্রেণি কাজ কিংবা বাড়ির কাজ দিলে, অ্যাসাইনমেন্ট দিলে শিক্ষার্থীরা
কোনো রকম না বুঝেই বই, গুগল, ইউটিউব দেখে লিখে নিয়ে আসে। ৭০/৮০ জন শিক্ষার্থীকে যথার্থভাবে
মূল্যায়ন করা একজন শিক্ষকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন ক্যারিকুলামে শিক্ষার্থীকে
বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানোর কথা বলা হয়েছে। এমন কার্যক্রম আমরা আমাদের সময়ে সহ-শিক্ষা
কার্যক্রম হিসেবে শিখেছি। কাগজ, মাটি, বা অন্যকিছু দিয়ে হাতের কাজ তৈরি করে শিক্ষককে
দিয়েছি। সপ্তাহে একদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। খেলাধুলা হয়েছে। ভাত বা স্যুপ রান্না,
ফার্স্ট এইড, স্যালাইন বানানো, সোলার সিস্টেম বানিয়ে দেখানো, বাগান করা, বৃক্ষরোপণ
ও গাছ বাঁচানো, রং করা, ডিজাইন করা, ঈদ কার্ড বানানো, বিষয়ভিত্তিক দেয়াল পত্রিকা তৈরি
করা ইত্যাদি কাজও করেছি। সবই তো ছিল। এখন বিষয় ভিত্তিক করা হয়েছে।
তাতেও সমস্যা ছিল না,
যদি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হতো। ত্রিভুজ, বিত্ত ও চতুর্ভজের সিস্টেম এবং মেধাক্রম
না থাকায় নতুন ক্যারিকুলাম কারো মনেই আস্থা সৃষ্টি করতে পারে নাই। সকলে বলছেন, এই কারিকুলাম
শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন কিছু দিতে তো পারেইনি, বরং
যেটুকু লেখাপড়া ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে।
অনেকের দাবি ছিল, মূল্যায়ন
পদ্ধতিতে যোগ্যতা ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি লিখিত (পরীক্ষা) মূল্যায়ন
রাখা হোক। অন্তত ৫০ শতাংশ লিখিত ও ৫০ শতাংশ কার্যক্রমভিত্তিক পরীক্ষা নেয়া হোক। সেটা
প্রথমে না শুনে পরে ৬৫ শতাংশ লিখিত ও ৩৫ শতাংশ কার্যক্রমভিত্তিক হওয়ার কথা বলা হলো।
কিন্তু সেটাও কার্যকর হলো না। কর্তাবাবুদের ধারণা-লিখিত পরীক্ষা মানে মুখস্থ, লিখিত
পরীক্ষা মানে প্রাইভেট পড়া, লিখিত পরীক্ষা মানে নোট-গাইডের ব্যবসা। কিছুই থামাতে পারেননি,
কেবল থেমে গেছে শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ, বইপড়ার আগ্রহ। পরীক্ষা না থাকলে সে আগ্রহ সৃষ্টি হবে কেন?
অন্যদিকে, একজন শিক্ষককে
বিশেষ করে বড় ক্লাসে ডিসিপ্লিন মেনটেইন করতেই সময় চলে যায়, তিনি আলোচনা, দলীয় কাজ,
জোড়ায় কাজ, উপস্থাপনা, প্রতিবেদন লেখানো, অ্যাসাইনমেন্ট দেখা-এতসব কাজ করার সময় পাবেন
কোথায়? শিক্ষার্থীরা এটাও বুঝে গেছে। ফলে তারা আছে বেশ মাস্তিতে। জাতি চলে যাচ্ছে অন্ধকারের
অতল গহ্ববরে!
তাই জাতিকে সঠিক পথে
নিতে, আজকের প্রজন্মকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক করে গড়ে তুলতে এবং দেশকে পুনর্গঠন
করতে সবার আগে ‘শিক্ষা’র সংস্কার করতে হবে। শিক্ষা সংস্কার হলে অন্যান্য খাত অনেকটা
সংস্কার হয়ে যাবে। জাতিকে অন্ধকারে রেখে রাষ্ট্র সংস্কার মোটেও সম্ভব নয়। তাই নতুন
সরকারের কাছে জোর দাবি-নতুন ক্যারিকুলাম পাল্টান, শিক্ষা বাঁচান, শিক্ষার্থী বাঁচান,
দেশ বাঁচান।
অন্যদিকে শিক্ষা ক্যারিকুলাম
পাল্টানোর সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাপনাও পাল্টাতে হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি গঠনেও নীতিমালা পাল্টাতে হবে। অশিক্ষিতরা শিক্ষিত মানুষের
উপরে ছড়ি ঘুরালে তা কখনই শিক্ষায় মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। তাই এসব কমিটিতে সভাপতি কিংবা
সদস্য হতে হলে নূন্যতম যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রীধারী হওয়া জরুরি। আশা করি নতুন সরকার রাষ্ট্র
সংস্কারের উদ্যোগে শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধ্যান্য দিবে। আবারো বলছি, শিক্ষা হলো
রাষ্ট্র সংস্কারের মূল অস্ত্র।
লেখকঃ শিক্ষক
মো. মামুন হাসান:
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয়, বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ি ...
ইমদাদ ইসলাম:
বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেশের মানুষ। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রতিদিনই দেশের বায়ু মান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়।গত ৪ মার্চ বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢা ...
মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদি ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:
বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বোঝার জন্য কেবল রাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী সময় নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর শ্রেণি সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ...
সব মন্তব্য
No Comments