বোচাগঞ্জে হারিয়ে যেতে বসেছে হাতপাখা তৈরির পেশা, বাঁশ সংকটে বিপাকে কারিগররা

প্রকাশ : 20 Sep 2026
বোচাগঞ্জে হারিয়ে যেতে বসেছে হাতপাখা তৈরির পেশা, বাঁশ সংকটে বিপাকে কারিগররা

আহাছানুল মতিন নান্নু (দিনাজপুর) বোচাগঞ্জ: দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা তৈরির পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে। বৈদ্যুতিক ফ্যান, চার্জার ফ্যান ও প্লাস্টিকের পাখার দাপটে কমেছে বাঁশের হাতপাখার চাহিদা। তার ওপর বাঁশের সংকট ও বাড়তি দামের কারণে বিপাকে পড়েছেন কারিগররা। একসময় গরমের দিনে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে হাতপাখার কদর থাকলেও এখন এ পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কয়েকটি পরিবার।


উপজেলার সেতাবগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া এলাকায় বাবা-দাদার আমল থেকে হাতপাখা তৈরি করে আসছেন রমেন (৩০) ও তার স্ত্রী কল্পনা (২৮)। এ এলাকায় পাঁচ-ছয়টি পরিবার এখনো এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাতপাখার ব্যবহার কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহ নেই। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের চারজন এ কাজে যুক্ত আছেন।


কারিগররা জানান, হাতপাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল বাঁশ। বাজার থেকে বাঁশ কিনে আনতে হয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় বাঁশ সহজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। একটি হাতপাখা তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। দিনে গড়ে ৮ থেকে ১০টি হাতপাখা তৈরি করেন তারা। প্রতিটি হাতপাখায় কাঁচামালের খরচ পড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা। পাইকারের কাছে প্রতিটি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটিতে লাভ থাকে ১৫ থেকে ২৫ টাকা। সব মিলিয়ে দিনে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় হয়।


রমেনের স্ত্রী কল্পনা বলেন, সংসারের কাজের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সঙ্গে হাতপাখা তৈরির কাজ করছেন। গরম বাড়লে কাজের চাপ ও বিক্রি কিছুটা বাড়ে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখার চাহিদা বাড়ে। তবে আগের মতো সারা বছর চাহিদা নেই। আধুনিক ফ্যানের কারণে ব্যবহার অনেক কমেছে, তারপরও সংসারের আয়ে সহায়তা করতে তারা এ কাজ ধরে রেখেছেন।


কারিগরদের ভাষ্য, অগ্রহায়ণ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত হাতপাখা তৈরির মৌসুম ভালো থাকে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ে, তবে আগের তুলনায় বাজার অনেক ছোট হয়ে গেছে। রমেন বলেন, আগে চাহিদা বেশি ছিল, এখন বৈদ্যুতিক ও চার্জার ফ্যানের কারণে বিক্রি কমেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা বাঁশ। সরকারি কোনো সহায়তাও পাননি। বাঁশ বা আর্থিক সহযোগিতা এবং বাঁশ কাটার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেলে এ কাজ ধরে রাখা সম্ভব।


এ বিষয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান জানান, হাতপাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয়দের মতে, কাঁচামালের সংকট, বাড়তি দাম, সীমিত বাজার ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে গ্রামীণ বাংলার এই পুরোনো ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


সম্পর্কিত খবর

;