এ এম ইমদাদুল ইসলাম:
রাত তখন অনেকটা গভীর। ঢাকার রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে, কিন্তু গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে এখনো মানুষের কোলাহল রয়ে গেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই ছোট্ট রাকিব দৌড়ে বেড়াচ্ছে কখনো যাত্রীকে ডাকে, কখনো বাসে উঠে ভাড়া তোলে, আবার কখনো ক্লান্ত শরীরটা টেনে এনে এক কোণে বসে পড়ে। রাকিবের বয়স মাত্র বারো-তের। এই বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল বই খাতা, স্কুলব্যাগ। কিন্তু তার হাতে এখন যাত্রীদের কাছ থেকে উঠানো ভাড়া টাকা আর কয়েনের শব্দ। বাবাকে হারিয়েছে অনেক আগে, আর মায়ের অসুস্থ শরীর নিয়ে সংসারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধেই।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে বাসের হর্নের শব্দে। ঠিকমতো নাস্তা করার সুযোগও হয় না। সারাদিন বাসের পেছনে দৌড়ানো, যাত্রীদের সাথে ধাক্কাধাক্কি, ড্রাইভারের বকুনি, এসবই তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কখনো কখনো যাত্রীদের কেউ কেউ তাকে ধমক দেয় কেউ আবার সহানুভূতির চোখে তাকায়। কিন্তু সেই দৃষ্টি তার জীবনে কোনো পরিবর্তন আনে না। একদিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে রাকিব বাসের সিঁড়িতে বসে ছিল। ঘামে ভেজা মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ঠিক তখনই সে দেখতে পেল তারই বয়সি কয়কজন ছেলে পাশের স্কুল থেকে বের হচ্ছে হাসছে, গল্প করছে, হাতে বই। সেই দৃশ্য দেখে রাকিবের চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। সে হয়তো কল্পনা করছিল যদি সেও তাদের মতো হতে পারত!
“কী দেখিস? ”ড্রাইভারের রুক্ষ গলা তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। “কিছু না, ভাই…”মাথা নিচু করে বলল রাকিব। সেদিন রাতে বাসস্ট্যান্ডের এক কোণে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। তার মনে অনেক প্রশ্ন কেন তার জীবনটা এমন? কেন সে স্কুলে যেতে পারে না? কিন্তু কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ একদিন, এক যাত্রী তার সঙ্গে কথা বলল। লোকটি একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি রাকিবের কথা শুনলেন মন দিয়ে। পরদিন আবার এলেন, সঙ্গে নিয়ে এলেন কিছু বই আর একটি নতুন সুযোগ এনজিওদের স্কুলে পড়ার ব্যবস্থা। প্রথমদিন বই হাতে নিয়ে রাকিবের হাত কাঁপছিল। অক্ষরগুলো তার কাছে নতুন, কিন্তু স্বপ্নগুলো পুরনো। ধীরে ধীরে সে শিখতে লাগল অ, আ, ক, খ… তার চোখে আবার আলো ফিরতে শুরু করল।
রাকিব এখনো বাসে কাজ করে এবং স্কুলেও পড়ে। কিন্তু তার ভেতরে একটা নতুন শক্তি জন্মেছে স্বপ্ন দেখার শক্তি। সে জানে এবং বিশ্বাস করে, একদিন সে এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসবে। হয়তো খুব সহজ হবে না, কিন্তু অসম্ভবও নয়। বাসস্ট্যান্ডের সেই কোলাহলের মাঝেই, ধোঁয়া আর ধুলোর ভেতর, ছোট্ট একটা স্বপ্ন নীরবে বড়ো হয়ে উঠছে একটি শিশুর, যে হার মানতে শেখেনি।এ রকম হাজারো রকিব আমাদের চারপাশে আছে।সব রকিরদের গল্প প্রায় একই ধরনের।
আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক, এখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি এখনও নানা সামাজিক সমস্যা বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুতর সমস্যা হলো শিশুশ্রম। শিশুশ্রম বলতে এমন কাজকে বোঝায় যা শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কিংবা শিক্ষাগত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে শিশুশ্রম একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য অন্যতম। অনেক পরিবার দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খায়। ফলে তারা বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজ করতে পাঠায়। এছাড়াও অশিক্ষা, পরিবারে সচেতনতার অভাব, জনসংখ্যার চাপ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও শিশুশ্রম বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে শিশুরা বিভিন্ন খাতে কাজ করে থাকে। যেমন-গার্মেন্টস শিল্প, ইটভাটা, চা-বাগান, কৃষিকাজ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন খাত এবং গৃহকর্মী হিসেবে। এসব কাজের বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ এবং শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা দীর্ঘ সময় কাজ করে, সামান্য মজুরি পায় এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ কমে যায়। অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না বা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও বাধা সৃষ্টি করে। শিশুশ্রম একটি দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে, যেখানে দরিদ্র পরিবারগুলো শিক্ষার অভাবে আবারও দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে পড়ে।
বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ আইন, বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি প্রদান এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুশ্রমিকদের পুনর্বাসনে কাজ করছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিশুশ্রম সমস্যার সমাধানে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে শিশুশ্রম কমানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা দরকার , যাতে তারা তাদের শৈশব উপভোগ করতে পারে। শুধু সরকারি চেষ্টা এখানে যথেষ্ট না,পরিবারকেই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে। শিশুশ্রম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এটি একটি জাতির উন্নয়নের পথে বড়ো বাধা। তাই এই সমস্যা দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। শিশুদের সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পারলেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম কমানো এবং দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন কল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত দুই দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও চ্যালেঞ্জ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সরকার প্রথমত, আইনগত ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। Bangladesh Labour Act 2006 অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শ্রমে সম্পৃক্ততা আইনত অপরাধ। পাশাপাশি National Child Labour Elimination Policy 2010 প্রণয়ন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ধাপে ধাপে শিশুশ্রম নির্মূল করা। সরকার বিভিন্ন সময়ে এ নীতিমালার বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। প্রথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে করা হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে উপবৃত্তি (stipend) চালু রয়েছে, যাতে তারা কাজের পরিবর্তে পড়াশোনায় উৎসাহিত হয়। এছাড়া বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ একটি বড়ো উদ্যোগ, যা প্রতিবছর কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে সহায়তা করে। বর্তমান সরকার ছাত্র ছাত্রীদের উৎসাহিত করার জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও স্কুল ব্যাগ দেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছে।
তৃতীয়ত, ঝরে পড়া ও কর্মজীবী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। Reaching Out-of-School Children Program (ROSC) এর মাধ্যমে যারা কখনো স্কুলে যায়নি বা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও এনজিওদের সহযোগিতায় নন-ফরমাল শিক্ষা কেন্দ্র চালু রয়েছে, যেখানে কাজের পাশাপাশি শিশুরা পড়ার সুযোগ পায়। চতুর্থত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ভিজিডি (VGD), ভিজিএফ (VGF) সহ বিভিন্ন খাদ্য ও নগদ সহায়তা কর্মসূচি পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, ফলে শিশুকে কাজে পাঠানোর প্রবণতা কমে।
পঞ্চমত, ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে শিশুদের সরিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যাতে শিশুরা বিকল্প জীবিকা অর্জন করতে পারে। এতে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ষষ্ঠত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ তথ্য অধিদফতর,গণযোগাযোগ অধিদপ্তর,চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর ,বাংলাদেশ বেতার,বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম, স্কুল, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুশ্রমের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। তবে এসব উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। দারিদ্র্য, নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত খাত এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাই আরও কার্যকর নজরদারি, দারিদ্র্যমোচন এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি।
সরকার শিশুশ্রম বন্ধ ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে এবং সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে একটি শিশুশ্রমমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। সর্বোপরি, শিশুশ্রম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এটি একটি জাতির উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তাই এই সমস্যা দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। শিশুদের সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পারলেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
#
-লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার
মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন:বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পট ...
মো. বেলায়েত হোসেন:বোরো ধানে পাক ধরেছে। ঘরে তুলতে সমূহ আয়োজন চারদিকে। ব্যস্ত হাওড়ের প্রতিটি গ্রাম। এবছরের ১৮ এপ্রিল শনিবার, ধান কাটায় মগ্ন কৃষক। আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকানোর সময় নেই। ঠিক সেসময় শুধুমা ...
মানিক লাল ঘোষ:১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে 'আট ঘণ্টা কর্মদিবস' স্বীকৃত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি নিয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রমিক দ ...
মোঃ নাঈমুর রহমান সবুজ:একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। যখন কোনো আদর্শ বা সংগঠন নিজের পরিচয় গোপন করে ছদ্মবেশকে কৌশলী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেই সমাজ এক গভীর মনস্ ...
সব মন্তব্য
No Comments