জীবাশ্ম জ্বালানির উল্লেখ বাদ দিল জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ

প্রকাশ : 10 Jul 2025
জীবাশ্ম জ্বালানির উল্লেখ বাদ দিল জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ

ডেস্ক রিপোর্ট: 


জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে রূপান্তরের প্রস্তাব বাদ দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ (ইউএনএইচআরসি)। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ও কলম্বিয়ার দেওয়া একটি সংশোধনী প্রস্তাব, যা ন্যায়সংগত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানায়, তা গোপন আলোচনার পর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।


৪৭ সদস্যের মানবাধিকার পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে এই ঘোষণা গৃহীত হয়, যেখানে মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়-সংঘাত, নারী অধিকার, শিক্ষা এবং এবার বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।


ঘোষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত ও গভীরভাবে কমাতে হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব দেশকে পদক্ষেপ নিতে হবে।


প্রস্তাব উঠেও বাদ


মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ও কলম্বিয়া যৌথভাবে একটি সংশোধনী আনে, যাতে বলা হয়-দেশগুলোকে যেন "ন্যায়সংগত, সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তরের মাধ্যমে" নির্গমন কমাতে আহ্বান জানানো হয়। এটি ২০২৩ সালের দুবাই সম্মেলনে গৃহীত ভাষার পুনরাবৃত্তি ছিল।


তবে পর্দার আড়ালে হওয়া আলোচনার পর উভয় দেশই এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়, ফলে ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। জাতিসংঘে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের রাষ্ট্রদূত ডোরিন ডিব্রাম বলেন, “আমরা সহযোগিতা ও সংলাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই, তাই ঐক্যমতের স্বার্থে আমরা প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেছি।”


তিনি আরও বলেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভবিষ্যতেও আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাব।”


বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া: হতাশা ও ক্ষোভ


পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ সেবাস্তিয়ান ডুইক জানান, ঘোষণার কিছু অংশ যেমন জলবায়ু ক্ষতির জন্য অর্থায়নের আহ্বান প্রশংসনীয় হলেও, জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কোনো বক্তব্য না থাকায় এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, “কিছু জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক দেশ এখনো রাজনৈতিক বার্তা বন্ধ করে দিতে মরিয়া। এই মনোভাব বাস্তব নীতির সঙ্গে ঘোষণার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।”


জাতিসংঘের জলবায়ু ও মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত এলিসা মরগেরা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন থেকে মানবাধিকার রক্ষা করতে চাইলে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগের বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”


তিনি সম্প্রতি মানবাধিকার পরিষদে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয়, ডিকার্বনাইজেশন বা কার্বন নির্ভরতামুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলা হচ্ছে উন্নয়নের অধিকার এবং একটি পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশের অধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত।


পিছিয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক অগ্রগতি


২০২৩ সালের দুবাই সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার ব্যাপারে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সেই ভাষা পুনরায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হয়েছে। গত বছরের বাকু সম্মেলনে সৌদি আরব ঘোষণা পত্রে জীবাশ্ম জ্বালনি সংক্রান্ত কোনো শব্দ অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল।


তবুও সেবাস্তিয়ান ডুইকের মতে, “এই বিতর্কই প্রমাণ করে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনায় কেন্দ্রে চলে এসেছে। অনেক দেশ এখন আর চোখ বন্ধ করে থাকতে রাজি নয়।”


জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার মতো একটি অত্যন্ত জরুরি ইস্যু ঘোষণার বাইরে থাকা জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্নে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমবর্ধমান চাপ প্রমাণ করছে-এই নীরবতা বেশিদিন থাকবে না।


সম্পর্কিত খবর

;