রাবিতে পোষ্য কোঠায় শর্তসাপেক্ষে ভর্তির সিদ্ধান্ত

প্রকাশ : 18 Sep 2025
রাবিতে পোষ্য কোঠায় শর্তসাপেক্ষে ভর্তির সিদ্ধান্ত

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ১ম বর্ষে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা প্রদানের বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশক্রমে শর্তসাপেক্ষে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের পুত্র-কন্যা ভর্তির সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ভর্তি কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। উপাচার্যের দায়িত্বে নিযুক্ত উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এই সভায় সভাপতিত্ব করেন। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় ভর্তির শর্তসমূহ হচ্ছে,

১. কেবলমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের ঔরসজাত/গর্ভজাত সন্তান এই ভর্তির সুযোগ পাবে; ২. ভর্তির প্রাথমিক আবেদনের জন্য বিজ্ঞাপিত যোগ্যতা এবং শর্ত এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে; ৩. মেধার ভিত্তিতে ভর্তির জন্য নির্ধারিত আসনসংখ্যার অতিরিক্ত হিসেবে এ প্রক্রিয়ায় ভর্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে;     ৪. ভর্তির ক্ষেত্রে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করে মেধা অনুসরণ করা হবে; ৫. ভর্তির আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্ধারিত শর্তাবলীসহ অবশ্যই ন্যূনতম পাস নম্বর থাকতে হবে; ৬. কোন বিভাগে ২ জনের অধিক ভর্তির সুযোগ থাকবে না; ৭. কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারির সন্তানকে তার কর্মরত বিভাগে ভর্তি করানো যাবে না; ৮. এ সুবিধার আওতায় নিজেদের মধ্যে ‘অটো মাইগ্রেশন’ ছাড়া শিক্ষার্থীর বিভাগ পরিবর্তনের অন্য কোনো সুযোগ থাকবে না; ৯. ভর্তির ক্ষেত্রে এবং পরবর্তীতে কোনো অভিভাবকের অনিয়মের আশ্রয় নেয়ার বিষয় প্রমাণিত হলে ছাত্রত্ব বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট অভিভাবকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে অঙ্গিকারনামায় উল্লেখ করতে হবে; ১০. এ সুবিধার আওতায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী কোনোভাবেই আবাসিক হলে সিটের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেনা।


প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিন যাবত প্রচলিত কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারির পুত্র-কন্যাদের ভর্তির প্রক্রিয়াকে শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বৈষম্যমূলক ও জুলাই-আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী চেতনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানায়। তারা এও জানায় যে, অতীতে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর না পাওয়া সত্ত্বেও ভর্তির নজির আছে, যা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির ধারাকে ক্ষুণ্ন করে। এছাড়া কিছুক্ষেত্রে অভিভাবকের বিভাগে ভর্তি হয়ে পুত্র-কন্যারা বিশেষ সুবিধা ভোগ করে বলেও তারা অভিযোগ করে।


বিপরীতে, পুত্র-কন্যাদের ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ হিসেবে ভর্তির সুযোগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা ক্রমাগত দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁরা আরও বলে যে, দীর্ঘদিনের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত এই সুবিধা আকষ্মিকভাবে বন্ধ করা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অসমিচীন। শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের কর্মসূচি সম্পর্কে তারা বলেন, ২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড-চলাকালে তালাবদ্ধ করে। এসময় তারা কোনো খাবারও প্রবেশ করতে দেয়নি। উপ-উপাচার্যদ্বয়, কোষাধ্যক্ষ, শিক্ষক, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারি ও সেবা গ্রহণে আগত ব্যক্তিবর্গ প্রায় ১৩ ঘণ্টা প্রশাসন ভবন-১ এ অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষকে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা এবং তাদের দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনার সুযোগ না দিয়েই সে দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে। একই সময়ে জাহাঙ্গীনগর এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের সুবিধা বাতিল/স্থগিত করলেও পরবর্তীতে যথাসময়ে তারা এটিকে পরিমার্জিত রূপে পুনর্বহাল করে। পূর্ব থেকে যেসকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের সুবিধা প্রচলিত ছিল তার কোনটিই বন্ধ করা হয়নি। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারিবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন যে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সুবিধা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শুধুমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তা বন্ধ করাও এক ধরণের বৈষম্য। তাছাড়া, সম্প্রতি ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ভর্তিতে সরকারি স্কুল-কলেজ ও শিক্ষা অফিসে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের সন্তানদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় সুবিধা হিসেবে সরকার ইকিউ কোটা (এডুকেশন কোটা) চালু করেছে। এ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।


শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিবৃন্দ এ সুবিধাকে চালু রাখার জন্য ক্রমাগত দাবি জানাতে থাকেন। এর অংশ হিসেবে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি পালন করে আসছেন। বর্তমানে তারা দাবী পূরণ না হলে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ হতে কমপ্লিট শাট-ডাউনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন-পাঠনসহ যাবতীয় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পূর্বের আদলে পোষ্য কোটা ফিরিয়ে আনার দাবীতে একাধিক আবেদন এই মূহুর্তে আদালতে প্রক্রিয়াধীন। বিষয়টির আশু অবসান প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এধরনের সুবিধা প্রদানের বিরোধিতা করে বক্তৃতা-বিবৃতি ও সমাবেশ করছে। ফলে, এক অনাকাক্সিক্ষত অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি ও শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত করে।


শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারী প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং বোঝাপড়ার মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যায়। বর্তমানে এই জায়গাটিতে এক ধরনের ফাটল ধরেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পূর্বের ন্যায় পোষ্য কোটা পুনঃবহালের বিপক্ষে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই।


এই প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃথকভাবে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে বারবার আলোচনা করে বিরাজমান পরিস্থিতি নিরসনে মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে। এছাড়া উপর্যুক্ত বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানের নিমিত্তে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন)-এর সভাপতিত্বে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের পুত্র-কন্যা ভর্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা প্রদানের বিষয়ে গঠিত কমিটি’ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত প্রাসঙ্গিক প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করেছে।


আলোচনায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের দাবির পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের দাবি বিবেচনা করে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার অন্যতম হলো দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ হিসেবে কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিবৃন্দ যেহেতু অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে নিবেদিতভাবে দায়িত্ব পালন করেন সেহেতু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গঠিত কমিটি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার আওতায়, শুধুমাত্র এই বছরের জন্য, বিশেষ আবেদনের ভিত্তিতে, শুধুমাত্র পাশকৃত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের মেধারর ভিত্তিতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে দশটি শর্ত আরোপ করে ২০২৪-২০২৫ সেশনে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার বিবেচনার জন্য সুপারিশ করে।


সম্পর্কিত খবর

;